kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিবেক, তুই কোথায় আছিস?

রেজানুর রহমান

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিবেক, তুই কোথায় আছিস?

একজনের কথা অন্যজনের পছন্দ না-ও হতে পারে। তাই বলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে? তা-ও আবার দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুয়েটে? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা আদর করে ‘বুয়েট’ বলে ডাকি। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাঁরা ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান, ধরেই নেওয়া হয় তাঁরা দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। আর কোথাও না থাকুক, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই তো আমরা পরমতসহিষ্ণুতার পরিবেশ দেখতে চাই; বিশেষ করে বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো বটেই। অথচ একি দেখলাম বুয়েটে? মতের মিল হলো না বলেই একজন মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। আহা রে! আর কিছুদিন বাদেই নাকি ওই মেধাবী শিক্ষার্থী একজন প্রকৌশলী হওয়ার স্বীকৃতি লাভ করতেন। একবার ভাবুন তো তাঁর পরিবারের কী দশা! ছেলেকে নিয়ে তারা কতই না আশায় বুক বেঁধেছিল। সব আশাই বালির বাঁধের মতো হঠাৎই ঝুরঝুর করে মাটিতে মিশে গেল। এই যে আমরা একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মেরে ফেললাম, তার পেছনে যুক্তি কী? ‘ওর চলন বাঁকা বলেই ওকে আমি দেখতে পারি না। তাই মেরে ফেলেছি!’—এটা তো যুক্তির কথা নয়। চরম অপরাধীকেও আপনি নিজে শাস্তি দিতে পারেন না। এ জন্য দেশের আইন আছে। দেশের আইনকে তো শ্রদ্ধা করতে হবে।

আমাদের অনেক সৌভাগ্য যে তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি। মতের মিল না হওয়ায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরারকে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা হলের গোপন কক্ষে ধরে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। হলের করিডরে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরায় এই ঘটনার কিছু অংশ ধরা পড়েছে বলেই না ছাত্রলীগ এর দায় অনেকটা স্বীকার করে নিয়েই তাত্ক্ষণিকভাবে দোষী নেতাকর্মীদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এই ঘটনার আলামত পাওয়া না গেলে অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত শনাক্ত হতো কি না বলা মুশকিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিহত আবরারের একটি ছবি দেখে বারবার শিউরে উঠছি। তাঁর সারা শরীরে নির্দয়-নিষ্ঠুর কায়দায় মারধরের আলামত স্পষ্ট হয়ে আছে। বুকে, পিঠে, হাতে জমাটবাঁধা রক্ত এতটাই বীভৎস হয়ে আছে যে চোখ তুলে তাকানো যাচ্ছে না। নিহত আবরারের শরীরে মারধরের দাগ দেখে সহজেই ধরে নেওয়া যায়, তাঁকে হকিস্টিক অথবা এজাতীয় কোনো লাঠি দিয়ে নির্দয়-নিষ্ঠুর কায়দায় অত্যাচার করা হয়েছে। কী নিষ্ঠুর পরিবেশে আমরা বসবাস করছি! দেশের একটি শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলে একজন নিরীহ ছাত্রকে ধরে নিয়ে এতটাই নির্মম-নিষ্ঠুর কায়দায় মারধর করা হলো যে হতভাগা ছাত্র মরেই গেলেন! মারধরের সময় তিনি নিশ্চয়ই বাঁচার জন্য চিৎকার করেছিলেন। সেই চিৎকারও কি কারো কানে আসেনি? আবারও দেশের তথ্য-প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রশংসা করি। হলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ঘটনার আলামত ধরা না পড়লে আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা হয়তো আড়ালেই থেকে যেত! কিন্তু প্রশ্ন হলো, আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদের কী শিক্ষা দিল? দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলগুলোতে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী বসবাস করে। সবাই যে একই মতাদর্শের হবে এমন তো কথা নেই। একই পরিবারের পাঁচ ছেলে-মেয়ের মধ্যেও মতের মিল থাকে না। তাই বলে কি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সদস্যরা অন্যদের পাত্তাই দেবে না? তাহলে তো পরিবারই থাকবে না। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মতের অমিল থাকবেই। সে জন্য প্রতিপক্ষকে হত্যা করার সংস্কৃতি কখনোই কাম্য হতে পারে না। এ জন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর পজিটিভ ভূমিকাই সাধারণ মানুষ আশা করে। বিশেষ করে সরকারি ছাত্রসংগঠনের ওপর এ ব্যাপারে প্রত্যাশা একটু বেশিই থাকে। অথচ কার্যক্ষেত্রে সরকারি ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ যারপরনাই হতাশার জন্ম দিচ্ছে। গত ১১ বছরে ছাত্রলীগ মূলত আলোচনায় এসেছে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও টেন্ডারবাজির কারণে। অথচ মহান স্বাধীনতা আন্দোলনসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগই পালন করেছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। সারা দেশে হাজার হাজার ত্যাগী, মেধাবী নেতাকর্মী থাকা সত্ত্বেও শুধু নেতৃত্ব পর্যায়ে কিছু বিপথগামী নেতার অপরাধ কর্মকাণ্ডের ভাগীদার হতে হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় এই ছাত্রসংগঠনটিকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীর মধ্যে আদর্শগত ভাবনা খুব একটা কাজ করে না। বরং দখলদারির ভাবনাটাই তাদের কাছে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মূল রাজনৈতিক দলের নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করার ক্ষেত্রেই বেশির ভাগ ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত থাকেন। ফলে ছাত্রসংগঠনগুলো সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে দিন দিন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিও তার ঐতিহ্যগত চরিত্র হারিয়ে ফেলছে।’

অভিজ্ঞমহলের মতে, এত কিছুর পরও ছাত্রলীগের পক্ষেই সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। এ জন্য প্রয়োজন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আদর্শগত ভাবনায় উজ্জীবিত একদল ত্যাগী মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর নেতৃত্ব, যারা নিজেদের শিক্ষার্থী হিসেবেই গুরুত্ব দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাজীবনের সব সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করবে।

লেখাটি শেষ করব ভাবছি। আবারও চোখ পড়ল দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হতভাগ্য মেধাবী ছাত্র আবরারের ছবির ওপর। তাঁর মৃতদেহ পড়ে আছে হাসপাতালের একটি ট্রলিতে। আবারও কষ্টে চোখ ভিজে এলো!

আবরারের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। সোহান খান নামের একজন তাঁর টাইমলাইনে লিখেছেন, ‘তোরা একটা স্ট্যাটাসের জন্য লাশ ফেললি! আজ দেখ কোটি কোটি স্ট্যাটাস। কত মারবি? ক্যামনে মারবি? আশার বিষয় হচ্ছে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রীও জেল খাটছে। ধর্মব্যবসায়ীদের ফাঁসি হইছে। ভবিষ্যতের কথা কিন্তু কেউ জানে না...’

আবরারের মা-বাবার কান্না দেখে অনেকেই তাঁদের ফেসবুকের টাইমলাইনে একটি কান্নাভেজা কথা শেয়ার করেছেন। কথাটি হলো, ‘বিবেক, তুই কোথায় আছিস? পারলে তুই এই কান্নার ওজন মাপিস!’ কান্নার কি ওজন মাপা যায়?

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার

সম্পাদক আনন্দ আলো

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা