kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

বুয়েটে হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড : প্রতিকার কী

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



বুয়েটে হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড : প্রতিকার কী

আচরণগুলো বিস্মিত বা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ার মতো, তবে চমকে যাওয়ার মতো নতুন নয়। কারণ এমন পৈশাচিকতা আগেও নানা জায়গায় আমাদের দেখতে হয়েছে। তবু মানতেই হবে—এ বড় মর্মান্তিক। মেনে নেওয়া কঠিন। সামান্য ঘটনার জেরে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে ছয় ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে খুন করে ফেলল তারই সতীর্থরা। এই সতীর্থরা সাধারণ নয়—ছাত্রলীগের হল শাখার বিভিন্ন পদাধিকারী ছাত্র নেতা। এরাও সবাই বুয়েটের ‘মেধাবী’ ছাত্র। কী দোষ ছিল আবরার ফাহাদের? টিভি প্রতিবেদনে দেখলাম—দুর্ভাগা ফাহাদের গ্রামের বাড়ির প্রতিবেশী জানাল, এত ভালো ছেলে লাখে একজন মেলে না। বুয়েটের বন্ধুরা জানাল নির্বিবাদী, ধর্মভীরু আর পড়ুয়া ছাত্র ছিল সে। অপরাধ একটি করেছে ফাহাদ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের অর্জন নিয়ে সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিল। যারা দেখেছে বলেছে, ওটা অন্যদের আহত হওয়ার মতো তেমন কিছুই না। আর কিছু হলেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা তো মানুষের থাকেই। বেশি কিছু হলে আইসিটি আইন তো বলবৎ আছেই। আইনের লম্বা হাত প্রসারিত হতো। তার বদলে ছাত্রলীগের এই খুনে সন্ত্রাসীদের হাতে বিচার করার দায়িত্ব কে দিল? ভাবা যায়, একজন তরতাজা শিক্ষার্থীকে সহপাঠী আর সিনিয়র কয়েকজন ছাত্র হলের কক্ষে ডেকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিটিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে চূড়ান্তভাবে খুন করে ফেলল! এদের ভেতর মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটাও কাজ করল না! ক্যামেরা ফুটেজে স্পষ্টই দেখা গেল, ফাহাদের নিথর দেহ বহন করে নেওয়া খুনি বা খুনের সহযোগীদের চেহারা। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত পুলিশ হল শাখা ছাত্রলীগের মোট ১০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে।

আমি অবাক হয়ে ভাবি, রাজনৈতিক ক্ষমতার শক্তিতে তরুণরা কতটা হিংস্র ও অমানবিক হয়ে পড়তে পারে। ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগে এদের প্রথম পরিচয় ছিল একটি ভদ্র পরিবারের সন্তান। এদেরও মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। তারা গর্ব করে তাদের সন্তান বা স্বজন নিজ মেধার গুণে বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে। কত বড় বড় সুখ-স্বপ্ন দেখেছে সবাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এরা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলকে বুঝতে শিখবে। প্রত্যেকেই নিজেদের আরো আলোকিত করবে। নিজের ও পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করবে। কিন্তু উল্টো নিজের ও সবার স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে হয়ে উঠল খুনে আর সন্ত্রাসী। পরিবারকে মর্মজ্বালা আর লোকলজ্জার মধ্যে ফেলে দিল। ঝাঁপ দিল অন্ধকার গহ্বরে। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এরা বখে যায়নি। এদের প্রশ্রয়দাতা এবং মেন্টর নিশ্চয়ই আছে। মনোজগতে তারা আরো বড় খুনি।

আমার জানতে ইচ্ছা হয়, ফাহাদকে এই জন্তুদের হাত থেকে কি বাঁচানো যেত না? ছাত্ররা সাংবাদিকদের জানিয়েছে, ওরা যথাসময়ে হল প্রশাসনকে খবর দিয়েছিল। তাহলে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে হল প্রশাসনের শিক্ষক-কর্মকর্তারা কি খুনিদের সহযোগিতা করলেন না? আমি একটি হলে প্রায় সাত বছর প্রভোস্ট ছিলাম। তাই জানি এ ধরনের অঘটন ঘটলে ছাত্রদের জানানোর আগেই প্রভোস্টের সোর্সরা (গার্ড, সিক বয় ইত্যাদি) প্রশাসনকে অবহিত করে। এখন তো শুনি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে ছাত্র হলে হল প্রশাসনের তেমন কাজ থাকে না। ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতারাই সব কাজ করে। ওরাই সিট বণ্টন করে। সিট বাণিজ্য বা সিট রাজনীতি করে। হলে বিচার-আচার আর শাসন করার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে ওরা। তাই হয়তো ছাত্রলীগের ষণ্ডাদের ঘাঁটানোর চিন্তা করেননি প্রশাসনের কর্মকর্তারা। অকুস্থলে আসেননি কেউ। আমি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই শাসন পর্বেই প্রভোস্ট ছিলাম। আমল বুঝে ছাত্রদল আর ছাত্রলীগ হিংস্র-ক্ষমতাবান হয়ে যেত। কিন্তু তার পরও আমরা শক্ত হাতে সিট বণ্টন করতাম। যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনায় হাউস টিউটরদের নিয়ে ছুটে যেতাম। অর্থাৎ হলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রেখেছিলাম। এখন নাকি হল প্রশাসন এসব বীরত্ব আর দেখায় না। সরকারি ছাত্রনেতা-কর্মীদের হাতে এতটাই বন্দি যে হল প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পর্যন্ত সবাই ওদের অঙ্গুলি নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য হয়। এ কারণেই সম্ভবত বুয়েট কর্তৃপক্ষ ফাহাদ হত্যায় থানায় জিডি করেছে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বলে। হত্যা শব্দটি উচ্চারণ করেনি। হয়তো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে হত্যা বলাটা সমীচীন মনে করেনি; যদিও অকুস্থলে পুলিশ কর্মকর্তা এবং ফরেনসিক রিপোর্ট দেওয়া ডাক্তার হত্যাই বলেছেন।

নিকট অতীতকেও যদি ধরি, মর্মন্তুদ বিশ্বজিৎ হত্যা থেকে ফাহাদ হত্যা পর্যন্ত খুনে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মানবতার বক্ষ তো কম বিদীর্ণ করেনি। সর্বজনবিদিত ও উচ্চারিত প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে (বিশেষ করে ছাত্র হলে) গেস্টরুম বা বিশেষ রুমকে টর্চার সেল বানিয়েছে। সেখানে ভিন্ন মতের ছাত্র বা কোনো নেতার আদেশ না মানা ছাত্রের ওপর জুলুম-নির্যাতন করা হয়ে থাকে প্রায় প্রতি রাতে। হল প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল এসবের প্রতিবিধান করা। কিন্তু প্রায়ই তারা নির্লিপ্ত থাকে—এমন অভিযোগ অহরহই করে সাধারণ ছাত্ররা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা ভদ্র পরিবারের স্বপ্নবোনা ছাত্রদের একটি অংশ নষ্ট রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে এতটা মনুষ্যত্বহীন অমানবিক খুনে সন্ত্রাসী হয়ে যায় কেমন করে! এর দায় অবশ্যই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে নিতে হবে। প্রথমে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পকাজে পার্সেন্টেজ আদায় দিয়ে শুরু হয়। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলবেন, আমাদের দল চালাতে টাকার দরকার। কর্মীদের অনুগত রাখতে টাকা লাগবে। কমিটিতে পদ পেতে হলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের বড় অঙ্কের টাকা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারা বলবে, ওপরের নেতাদের খাই মিটিয়ে নিজেদের পকেট ভরতে হবে। সুতরাং আরো টাকা দরকার। এসব তো বিশ্ববিদ্যালয়পাড়ায় এখন ওপেন সিক্রেট। খুব বিপদে না পড়লে তো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এ নষ্ট ধারা থেকে বেরিয়ে আসার পদক্ষেপ নেননি কখনো। ফলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা একেকজন আজদাহা-হিংস্র হয়েছে। এভাবেই নির্যাতন-হত্যার অলিখিত অধিকার যেন তারা পেয়ে গেছে।

কেন এই তরুণরা নিজেদের ক্ষমতাশালী মনে করবে না? কেন্দ্রীয় নেতারাই তো ওদের সন্ত্রাসী বানিয়েছেন। যখনই সরকার রাজনৈতিক-প্রশাসনিক বিপদে পড়েছে তখনই সরকারি দল নড়েচড়ে বসেছে। নিজ মেধায় যখন সংকট মোচন করতে পারেনি তখনই ছাত্রলীগের পেটোয়া বাহিনী মাঠে নামিয়েছে। আমরা তো ভুলে যাইনি গণজাগরণ মঞ্চের কথা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার কথা। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার কথা। এসবের পরিচালক-প্রযোজক তো ছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতারা সাপের পাঁচ পা দেখবে না কেন! তারা যখন বিশ্বাস করে তাদের ছাড়া দলের হাঁটাচলা কঠিন তখন বেপরোয়া হতেই পারে। ধরাকে সরাজ্ঞান করতে গিয়ে অবলীলায় খুনি-সন্ত্রাসী হয়ে যায়।

বিএনপি, জাতীয় পার্টি আর আওয়ামী লীগ সব আমলেই ছাত্ররাজনীতির ক্ষমতাবানদের চেহারা একই ছিল। নিয়ন্ত্রকদের আচরণও ভিন্ন কিছু ছিল না। নিজ ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের সুস্থ পথে চলার দিকনির্দেশনা কি তারা কখনো দিয়েছেন? এই যে সরকারের শুদ্ধি অভিযান চলছে, বড় বড় যুবলীগ নেতা ধরা পড়ছেন, এতে তো কিছুমাত্র বিচলিত নয় ছাত্রলীগ নেতারা। ওরা হাসতে হাসতে সতীর্থদের খুন করে ফেলছে। জানে বরাবরের মতোই তারা আশ্রয়দাতা পেয়ে যাবে। কেউ কি দাবি করতে পারবে, লোক-দেখানো দু-একটি উদাহরণ ছাড়া ছাত্রলীগ ছাত্রকল্যাণমূলক কোনো কর্মসূচি নিয়ে থাকে ক্যাম্পাসে? ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ওদের কখনো সংযুক্তি থাকে? বরং মতের মিল না হলে কখনো কখনো সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেয়। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে দ্বিধা করে না। আমরা তো এসব সন্ত্রাসীকাণ্ডের জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের কখনো শাসন করতে দেখিনি!

অনেকেই মনে করে, বর্তমান সরকারের শুদ্ধি অভিযানের পেছনে শুভ ইচ্ছার পাশাপাশি নিজ ঘরের ফাটল সারাতেও সক্রিয় হতে হয়েছে। সাপুড়ের সাপও মালিকের দিকে ফোঁস করে ওঠে। ছাত্রলীগও সাপের মতো বাড়ছে। এখনই লাগাম না টানলে নিজ ঘরেই অঘটন ঘটতে পারে। অনেক বছর আগে আওয়ামী লীগপ্রধান ছাত্রলীগের আচরণে বিরক্ত হয়ে ওদের সঙ্গে কোনোরূপ সংস্রব না রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাস্তবতা দেখে বোঝা যাচ্ছে, এতকালেও ছাত্রলীগ ষণ্ডাতন্ত্র থেকে বেরোতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেধাবী ছাত্ররা রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বিবেকহীন অমানুষ হয়ে যায় বোধ হয় বয়সের উন্মাদনায়। কিন্তু এই তারুণ্যই তো যুগ যুগ ধরে জাতির সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতা আর সামাজিক অধিকার রক্ষায় দ্রোহ করেছে। দুটিই তো তারুণ্য। নষ্ট রাজনীতির ঘেরাটোপে পড়ে অন্ধকারের গহ্বরেই এখন ঝাঁপ দিচ্ছে। একবারও ভাবছে না, এর পরিণতি সুখের নয়। এই যে ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদচ্যুত ও বহিষ্কৃত হলো—কম তো দাপট ছিল না তাদের। শুনি, ক্যাম্পাসে ঢুকলে তাদের প্রটোকল দিতে হতো। কোনো অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এসে বসে থাকলেও ওরা না আসা পর্যন্ত অনুষ্ঠান শুরু করা যেত না। আর কমিশন বাণিজ্যের তো অন্তই ছিল না। দুই দিনেই ফুটো হয়ে গেল বেলুন। কে তাদের খবর রাখে এখন? উল্কার মতো কক্ষপথ থেকে ছুটে নিষ্প্রভ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। এখন উপরি পাওনা হিসেবে পাবে মানুষের ঘৃণা। অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে পরিবার। সমাজ বাঁকা চোখে তাকাবে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজেদের সুস্থতার জন্য—দলকে ঐতিহ্যিক মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার জন্য সত্যিকার অর্থে নিজ অঙ্গগুলোকে ক্যান্সারমুক্ত করবে কি না। হাত-পায়ে ক্ষত বড় হয়ে গেলে গ্যাংগ্রিনের আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন অঙ্গচ্ছেদ ছাড়া উপায় থাকে না। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এ দেশের সব শ্রেণির সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এর জন্য কারো রাজনৈতিক দীক্ষার প্রয়োজন ছিল না। এ দেশের শিক্ষিত আর দেশপ্রেমিক তরুণ দেশের প্রয়োজনে হাল ধরতেই পারবে। এ জন্য নষ্ট রাজনীতির দীক্ষার প্রয়োজন নেই। সুতরাং দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, গ্যাংগ্রিন ধরা পা কেটে ফেলবেন কি না।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা