kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

অনলাইন থেকে

নেতানিয়াহুর দিন ফুরিয়ে আসছে

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভক্তকুলের কাছে তিনি রাজা বিবি। কিন্তু তাঁর রাজত্বের মেয়াদ যেন ফুরিয়ে আসছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বছর দুই দফা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের আশায় জনগণের দ্বারস্থ হন। ব্যর্থ হন দুইবারই। ১৭ সেপ্টেম্বরের ভোটগণনা প্রায় শেষ হওয়ার পর দেখা গেছে, সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গানেজর নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী জোট ব্লু অ্যান্ড হোয়াইটের চেয়ে দুই আসনে পিছিয়ে আছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। নেতানিয়াহুর ডানপন্থী এবং ধর্মীয় দলের জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ছয় আসনে পিছিয়ে রয়েছে। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তাদের ফল এর চেয়ে ভালো ছিল।   

নেতানিয়াহু এখনো ক্ষমতায় যাওয়ার আশা ছাড়েননি। গানত্জও জোট সরকার গঠনের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দিতে পারছেন না। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, রাজা বিবির রাজত্বের সূর্য ডুবতে বসেছে প্রায়। অন্তত তিনটি দুর্নীতির অভিযোগ ছিল নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ওই সব অভিযোগের বিচার থেকে দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ হারাবেন নেতানিয়াহু। চার মেয়াদে গত ১৩ বছর ক্ষমতায় থেকে যে সুযোগ তিনি ভোগ করছিলেন, তা-ও আর থাকবে না। 

ইসরায়েল বা বিশ্বজুড়ে উদারপন্থীরা হয়তো বিশ্বাসই করতে পারছে না যে নেতানিয়াহুর জাতীয়তাবাদী রাজনীতি পরাজিত হতে পারে। ইসরায়েল হয়তো এখন আরো গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পাবে। তবে সেটা সুযোগই। এর অনেকটাই নির্ভর করছে এমপিদের সমর্থন পাওয়ার ওপর। গানেজর সামনে মন্ত্রিসভা গঠনের সুযোগ বেশি। তবে আরেকটি সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে দপ্তরে থাকলেও ক্ষমতা কমবে তাঁর। গানত্জ অথবা অতীতের বন্ধু বর্তমানে শত্রু আভিগদর লিবারম্যানের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে তাঁর। নেতানিয়াহুর জন্য এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি হতে পারে গানেজর সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠন। সে ক্ষেত্রে পালাক্রমে তাঁরা দুজন দায়িত্ব পালন করবেন। তার পরও তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি সহযোগীরাও তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন।

গত মার্চে দি ইকোনমিস্টই নেতানিয়াহুর শাসনামলকে আধুনিক জনপ্রিয়তার দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছিল। তাঁর প্রণীত জাতীয়তাবাদই বিশ্বে পরবর্তী সময় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ক্ষমতাসীন অভিজাতদের বিরুদ্ধে নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী পুলিশ, আইনজীবী ও বামপন্থীরা; যদিও তিনিই তাঁদের নিয়োগ দিয়েছেন। সাংবাদিকরা ভুয়া খবর ছাপাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি; যদিও নেতানিয়াহুপন্থী সাংবাদিকেরও কোনো অভাব ইসরায়েলে নেই। তাঁরা ইসরায়েলে বিবিটন (হিব্রুতে ইটন অর্থ পত্রিকা) হিসেবে পরিচিত।

আরব নাগরিকদের বিশ্বাস করেন না নেতানিয়াহু। তাঁর দৃষ্টিতে আরব দলগুলো প্রতারক। ফেসবুকের একটি চ্যাটবট মেসেজ ফাঁস হলে দেখা যায় নেতানিয়াহু লিখেছেন, ‘ওরা (আরবরা) আমাদের সবাইকে ধ্বংস করতে চায়।’ একই সঙ্গে তিনি ইরানের হুমকি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের বিষয়টিও জোর গলায় প্রচার করেন। ট্রাম্প এরই মধ্যে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। নেতানিয়াহু তাঁর ডানপন্থী সমর্থকদের খুশি করতে এরই মধ্যে পুনর্নির্বাচিত হলে পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। তাঁর এই কৌশল কাজে লাগেনি বলাই বাহুল্য। আরো কিছু কৌশলও বুমেরাং হয়েছে। আরব ভোটারদের জালিয়াত সাজানোর উদ্দেশ্য থেকে ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা বসানোর কৌশলটি এর মধ্যে অন্যতম। এবার বিপুলসংখ্যক আরব ভোটার ভোট দিয়েছেন।

তাঁর স্থলে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি গানেজর। তিনি নিজেকে শান্তিকামী হিসেবে প্রতিষ্ঠায়ই বেশি আগ্রহী। তিনি এসেই ফিলিস্তিনের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে ফেলবেন—এতটা আশা করা ঠিক নয়। ফিলিস্তিনের সঙ্গে একটি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান চায় পুরো বিশ্ব। তবে এতে মোটে অর্ধেক ইসরায়েলির সায় আছে। অনেকেই মনে করে, এখন আর দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান সম্ভব নয়। উদারপন্থী ফিলিস্তিনিরা দুর্বল আর কট্টরপন্থীরা এতটাই শক্তিশালী যে তারা যেকোনো উদ্যোগ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বেশির ভাগ ইসরায়েলি মনে করে, এই সংঘর্ষ দমিয়ে রাখা সম্ভব, সমাধান নয়। গানত্জ ক্ষমতায় এলে আর কিছু হোক না হোক, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনা অন্তত শুরু হবে। এককভাবে বসতি সম্প্রসারণের হুমকিও হয়তো বাস্তবায়িত হবে না। হয়তো আংশিক চুক্তিও সই হতে পারে। 

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, নেতানিয়াহুর পরাজয় শান্তির পক্ষে জনতার রায়—এমন ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে বিভাজনের কারণে এমনটা ঘটেছে। নেতানিয়াহুর সাবেক চিফ অব স্টাফ ইসরায়েলের ক্ষমতার নির্ধারক হয়ে উঠেছেন। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি থেকে বের হয়ে গিয়ে তিনি ইসরায়েল বেইতেইনু (আমাদের আবাস ইসরায়েল) গঠন করেছেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর দলের সাফল্য সর্বাধিক। তিনি বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতায় সংস্কার না আনা পর্যন্ত কোনো সরকারে যোগ দেবেন না তিনি। কিন্তু এমন সংস্কার আনতে গেলে প্রথমেই ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে লিকুদ পার্টির জোট ভাঙতে হবে; যদিও ইসরায়েল বেইতেইনু যে ধর্মনিরপেক্ষ, তা নয়। তারা লিকুদের চেয়েও জাতীয়তাবাদী। পাশাপাশি নেতানিয়াহুর মতো তাঁর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

 

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা