kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঢাকা অচল যানজটে

আবু তাহের খান

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঢাকা অচল যানজটে

যানজটের ধকল সইতে সইতে এর কারণ, ধরন ইত্যাদি সম্পর্কে দেশের সব মানুষেরই কমবেশি ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। আর এসব নিয়ে এ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা, সভা, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক ইত্যাদিও কম হয়নি। ফলে এ নিয়ে নতুন যেকোনো আলোচনাই সাধারণ মানুষের কাছে এখন অত্যন্ত বিরক্তিকর। মানুষ আর আলোচনা শুনতে চায় না, চায় প্রতিকার। তাই আলোচনা না বাড়িয়ে এ বিষয়ে সরাসরি আশু বাস্তবায়নোপযোগী কিছু প্রস্তাব নিম্নে তুলে ধরা হলো।

এক. ঢাকার বাইরে অবস্থিত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কার্যালয়গুলোর (উন্নয়ন প্রকল্পসহ) যে কয়েক হাজার যানবাহন প্রায় নিয়মিত রাজধানীতে যাতায়াত করে, অবিলম্বে তা বন্ধ করা প্রয়োজন। কাগজে-কলমে এসব যাতায়াতকে দাপ্তরিক বলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো আসলে ব্যক্তিগত যাতায়াত। ফলে এ ধরনের যাতায়াত সড়কের যানজট হ্রাসের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবৈধ ও অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্যও। আর তা করার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের যানবাহনের নাম্বার প্লেটের রং ভিন্ন করা যেতে পারে, যাতে ওই সব অনিয়মতান্ত্রিক যাতায়াত সহজে চিহ্নিত করা যায়।

দুই. মাননীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কাছে নানা বিষয়ে তদবির ও সুপারিশের জন্য প্রতিদিন যে হাজার হাজার মানুষ রাজধানীতে যাতায়াত করছে, তা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সংসদ সদস্যদের (বেশির ভাগ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য) নিয়মিত নির্ধারিত দিনে নিজ নিজ এলাকার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত থেকে সাধারণ মানুষের কথা শুনতে হবে, যাতে এসব কথা বলার জন্য ওই সব মানুষকে আর ঢাকায় আসতে না হয়।

তিন. শুধু চিকিৎসক নন, মাঠপর্যায়ে কর্মরত সব পেশার সব সরকারি কর্মচারীরই সব কার্যদিবসে পূর্ণকালীন নিজ নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা ও কার্যালয় এলাকায় বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চাকরির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনে অফিস সময়ের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালনে বাধ্য এবং সে কারণেই আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগ করাটা শৃঙ্খলা পরিপন্থী আচরণ। অথচ তাঁদের একটি বড় অংশই কর্মস্থলে অবস্থান না করে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকে রাজধানীতে এবং ঢাকা থেকে কর্মস্থলে নিয়মিত যাতায়াতের আওতায় বাড়িয়ে তোলে যানজট।

চার. পুলিশের অন্যান্য শাখা থেকে বদলি করে ট্রাফিক শাখায় জনবল বাড়াতে হবে (পদের অতিরিক্ত হলেও তা করতে হবে)। অন্যদিকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য আনুতোষিক বাড়িয়ে হলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের আরো নিষ্ঠাবান করে তুলতে হবে। চৌরাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যক্তিগত আগ্রহে উপস্থিত থেকে এই লেখক একাধিক দিন লক্ষ করেছেন যে নিছক উদাসীনতা ও দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের গাফিলতির কারণে চৌরাস্তার চারদিকের সব মুখই একসঙ্গে আটকে আছে।

পাঁচ. বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও কিংবা সুযোগ থাকার পরও যেসব যানবাহন উড়াল সড়ক ব্যবহার করছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ রয়েছে যে উড়াল সড়ক সংশ্লিষ্ট এলাকার বেশির ভাগ যানবাহন এসব উড়াল সড়ক ব্যবহার করছে না। গণপরিবহনগুলো এটি করছে না কখনো বা উড়াল সড়কের নিচ থেকে যাত্রী সংগ্রহের লক্ষ্যে। আবার কখনো টোল প্রদান থেকে বাঁচার জন্য। কারণ যা-ই থাকুক না কেন, এর কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে যত দ্রুত সম্ভব উড়াল সড়কের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এর নিচ দিয়ে অবাঞ্ছিত যানবাহনের চলাচল বন্ধ করতে হবে।

ছয়. রাস্তা ও ফুটপাত থেকে হকার ও অন্যান্য ছোট-বড় স্থাপনা উচ্ছেদের কাজটি কখনোই স্থায়িত্ব পায়নি। এ ক্ষেত্রে বরাবরই কাজের চেয়ে কথা বেশি হয়েছে এবং ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাতের কথাও উঠেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এ কাজে রাজধানীর ওয়ার্ড কাউন্সিলররা কখনোই কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন বলে জানা যায় না। প্রতিটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর যদি উদ্যোগী হয়ে নিজ নিজ এলাকার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, রাস্তা ও ফুটপাতে চলাচল বাধামুক্তকরণ এবং যানজট নিরসনে এগিয়ে আসতেন, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায় যে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি এতটা নাজুক ও করুণ হয়ে পড়ত না। এ অবস্থায় রাজধানীর যানজট নিরসনে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কার্যকর অংশগ্রহণ করতে হবে।

সাত. সরকারি যানবাহনের নাম্বার প্লেটের রং ভিন্ন করা যেতে পারে, যাতে সরকারি নাম্বার প্লেটের গাড়ি ভরদুপুরে কাঁচাবাজার কিংবা স্কুল-কলেজের সামনে দেখলে মানুষ অন্তত বুঝতে পারে যে এটি ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে জনগণের করের পয়সায় কেনা। অবশ্য জনগণ বুঝতে পারায় এসব কর্মচারীর কিছুই যায়-আসে না। তবে এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবে অপব্যবহারকারী যানবাহনের যাতায়াত কিছুটা হলেও হ্রাস পেতে পারে, যা যানজট নিরসনে সহায়ক হতে পারে। তবে এ বিষয়ে যাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কথা, তাঁরা নিজেরাই যেহেতু এসব যানবাহনের ব্যবহারকারী, ফলে এ ব্যাপারে তাঁরা কতটা উৎসাহিত হবেন—সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়।

আট. যেসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ প্রত্যক্ষ উপকারভোগী গ্রামীণ মানুষ, অবিলম্বে সেসব প্রতিষ্ঠানের দপ্তর ও ক্ষমতার অধিকতর বিকেন্দ্রীকরণ আবশ্যক, যাতে ওই উপকারভোগীদের ঘন ঘন রাজধানীতে যাতায়াত করতে না হয়। এতে রাজধানীর যানজটই শুধু কমবে না, সংশ্লিষ্ট মানুষজন আর্থিকভাবেও উপকৃত হবে।

নয়. সর্বোপরি দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোরদার ও স্বনির্ভর করতে হবে। এটি করতে পারলে বর্তমানে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন নানা কারণ ও প্রয়োজনে রাজধানীতে এসে যানজট পরিস্থিতিকে আরো প্রকট করে তোলে, তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়। তা ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে দেশের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যেও এটি জরুরি। ফলে যানজট নিরসন ও দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করে তোলা—এ উভয় প্রয়োজনেই দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে জোরদার করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

ঢাকা শহরের যানজট নিরসনকল্পে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোর বাইরে আরো অনেক বিশেষজ্ঞ প্রস্তাব রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে বহুবার নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। ফলে সেসব আলোচনায় না গিয়ে সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলব যে খুব কাছ থেকে দেখা অভিজ্ঞতার আলোকে এখানে যে প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করা হলো, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এসব বাস্তবায়নে এগিয়ে এলে রাজধানীর যানজট হ্রাসে তা অনেকখানি উপকার বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে যাঁদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে, তাঁরা বা তাঁদের শ্রেণি-সুহূদরাই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ। ফলে নিজেদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে শেষ পর্যন্ত তাঁরা এগুলো বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি অন্তত তা বলে না। তবু যদি শেষ পর্যন্ত দু-চারটি সিদ্ধান্ত আংশিকভাবে হলেও বাস্তব রূপ পায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের যানজটজনিত কষ্ট ও ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও হ্রাস পেতে পারে।

লেখক : পরিচালক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এসইউবি)

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা