kalerkantho

৯/১১-এর প্রেক্ষাপট, পরিণতি ও জঙ্গিবাদের নতুন আশঙ্কা

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



৯/১১-এর প্রেক্ষাপট, পরিণতি ও  জঙ্গিবাদের নতুন আশঙ্কা

স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রে এবং অধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের শেষদিকে সেনা অভিযান চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে নেয়। কাবুলে প্রতিষ্ঠিত করে নিজেদের পছন্দমতো কমিউনিস্ট সরকার। যুক্তরাষ্ট্র নিজেরা যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধের ফাঁদে পড়ে লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করেছিল, সে রকম একটা পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ফেলা এবং স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানকে কমিউনিস্টদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তানে প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করে। অস্ত্র ও অর্থ দেয় আমেরিকা ও সৌদি আরব, আর মুজাহিদ রিক্রুটমেন্ট, প্রশিক্ষণ এবং কাবুলের কমিউনিস্ট সরকারকে উত্খাতসহ শোভিয়েত বাহিনীকে ফিরে যেতে বাধ্য করার জন্য আফগানিস্তানের ভেতরে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, যার প্রধান সমন্বয়ের কাজ করে গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। সৌদি আরব সংগত কারণেই, তাদের মতে নাস্তিক কমিউনিস্টদের ঠেকাতে ওই প্রক্সি যুদ্ধে যোগ দেয়। পাকিস্তানে তখন জুলফিকার আলী ভুট্টোকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উত্খাত করে সদ্য ক্ষমতায় এসেছেন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক। পশ্চিমা বিশ্বে নিজের বৈধতা অর্জনের কৌশল এবং কট্টর ইসলামিস্ট শরিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আফগান যুদ্ধকে তখন জিয়াউল হক বিশেষ রহমত হিসেবে মনে করেন। যাকে বলা হয়ে থাকে গড সেন্ট অপরচুনিটি। কট্টর ইসলামিস্ট ওয়াবিতন্ত্রের জঙ্গিবাদী আধুনিক সশস্ত্র সংস্করণের রূপকার হচ্ছেন জেনারেল জিয়াউল হক।

গত শতকের আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের উগ্রবাদী ইসলামিস্ট ও জিহাদিতন্ত্রে উদ্বুদ্ধ যুবকদের পাকিস্তানে আগমন এবং তাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণের সব ব্যবস্থা করে জিয়াউল হকের পাকিস্তান সরকার। আফগান যুদ্ধ শেষে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাজার হাজার জিহাদি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার মধ্য দিয়েই সশস্ত্র জঙ্গিবাদের বিশ্বায়ন ঘটে। এদের একটি বড় অংশ থেকেই সৃষ্টি হয় ‘আইএস’ নামের জঙ্গিগোষ্ঠীর, যারা ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ার কিছু ভূখণ্ড দখল করে ইসলামিক খেলাফতের ঘোষণা দেয়। উল্লেখ্য, আশির দশকের মাঝামাঝিতে পাকিস্তানের ভূমিতে ওসামা বিন লাদেন আল-কায়েদা নামের সশস্ত্র সংগঠনের জন্ম দেন। ১৯৮৮ সালে স্বাক্ষরিত প্যারিস শান্তিচুক্তির পথ ধরে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনাবাহিনী ফেরত যায়। শুরু হয় কাবুলে ক্ষমতা দখলের গৃহযুদ্ধ। একপর্যায়ে পাকিস্তান স্ট্র্যাটেজিক কৌশলের অংশ হিসেবে তালেবান জঙ্গিবাহিনী তৈরি করে তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয় এবং ছদ্মবেশে পাকিস্তানি সৈন্যরাও তালেবান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেয়। ফলে ১৯৯৬ সালে কাবুলে ক্ষমতা দখল করে তালেবান বাহিনী।

তালেবান শাসনের ভয়াবহ রূপ সারা বিশ্ব দেখেছে। আধুনিকতা ও মানবসভ্যতার সব কিছু ধ্বংস করে আফগানিস্তানকে তারা প্রাচীন যুগের অন্ধকারে নিয়ে যায়। তালেবানের মিত্র হিসেবে ওসামা বিন লাদেন আল-কায়েদা বাহিনীসহ আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়। তখন তালেবান, আল-কায়েদাসহ উগ্রবাদী ইসলামিস্টরা মনে করে, নাস্তিক কমিউনিস্টদের পরাজয়ের পর এখন নাসারাদের (পশ্চিমা বিশ্ব) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হবে, যাতে পশ্চিমারা মুসলিম দেশগুলো থেকে হাত গুটিয়ে নেয় এবং মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে শরিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এ চিন্তা থেকে ১৯৯৮ সালে ওসামা বিন লাদেন ফতোয়া জারি করের, ইহুদি ও আমেরিকানদের হত্যা করা মুসলমানদের জন্য ফরজ। তারই সূত্র ধরে লাদেনের সরাসরি পরিকল্পনা ও হুকুমে সোমালিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাব বাহিনী ১৯৯৮ সালের আগস্ট মাসে একই দিনে একযোগে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় আমেরিকান দূতাবাসের ওপর জঙ্গি হামলা চালায়। তাতে ২৪৪ জন নিহত হয়, যার বেশির ভাগই ছিল আমেরিকার নাগরিক। পাল্টা হিসেবে আমেরিকা লাদেনকে হত্যা করার জন্য আফগানিস্তানে মিসাইল আক্রমণ চালায়। পাল্টাপাল্টির একপর্যায়ে লাদেন তাঁর আল-কায়েদা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর একসঙ্গে কয়েকটি বিমান ছিনতাই এবং সেগুলো নিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে আমেরিকার অহংকার নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। একই দিনে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসেও তারা আত্মঘাতী আক্রমণ চালায়। সব মিলিয়ে সেদিন তিন হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষ নিহত হয়। টুইন টাওয়ার ধ্বংসসহ সেদিনের সেই ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে আরেকটি ভাষ্য বাজারে একসময় উঠলেও তার পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সেখানে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছে, টুইন টাওয়ার ধ্বংসসহ ওই দিনের সব আক্রমণ আমেরিকার নিজের তৈরি। সেটি করেছে অজুহাত সৃষ্টির জন্য, যে অজুহাতকে ব্যবহার করে সেনা অভিযান চালিয়ে তারা যেন মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আধিপত্য পাকাপোক্ত করতে পারে। এই ভাষ্যটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আজকে করব না।

৯/১১-এর পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বিশ্বব্যাপী ইসলামিস্ট জঙ্গি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আমেরিকা প্রথমেই ২০০১ সালের অক্টোবরে সেনা অভিযান চালায় আফগানিস্তানে। আফগানিস্তান দখল করে নেয়। সেখানে নিজেদের পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে। আমেরিকাসহ ন্যাটো বাহিনীর এক লাখেরও অধিক সেনা সদস্য আফগানিস্তানজুড়ে অবস্থান নেয়। তালেবান সরকারের প্রধান মোল্লা ওমরসহ লাদেন পালিয়ে এসে পাকিস্তানে আশ্রয় নেন। পাকিস্তানে তখন ক্ষমতায় সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ। উপায়ন্তর না দেখে পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে যোগ দেয়। কিন্তু এই যুদ্ধে পাকিস্তান সব সময় দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করেছে। এদিকে আমেরিকার সঙ্গে আছে, অন্যদিকে আবার তালেবান বাহিনীকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। বহু চেষ্টা করেও আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। ফলে আফগানিস্তানে সশস্ত্র জঙ্গিদের গেরিলা যুদ্ধ আজ পর্যন্ত থামেনি; বরং তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের সহায়তায় এখন আরো বেশি শক্তিশালী। এর আরো কারণ আছে। ২০০১ সালে আফগান দখল সম্পন্ন করার পরপরই সেখানকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার আগেই ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্য হিসেবে মিথ্যা অজুহাতে আমেরিকা ২০০৩ সালে ইরাক দখল করে নেয়। পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ইরাকের এত দিনের প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ও সশস্ত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ কাঠামো আমেরিকা ভেঙে ফেলে। তার মাধ্যমে সৃষ্ট শূন্যতার সুযোগ নিয়ে আল-কায়েদা থেকে দলছুট আল নুসরা সশস্ত্র সংগঠন, যারা পরবর্তী সময়ে আইএস (ইসলামিক স্টেট) নাম ধারণ করে ২০১৪ সালে ঝটিকা অভিযানে ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল ভূখণ্ড দখল করে ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কথিত ইসলামিক স্টেটের আকস্মিক বিশাল উত্থানে বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদী ইলামিস্ট জঙ্গি সংগঠনগুলো চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ফল হয় উল্টো। জঙ্গি-সন্ত্রাস আরো শক্তিশালী হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া থেকে আইএস আকর্ষণে কয়েক হাজার যুবক-যুবতী ইরাক-সিরিয়ায় এসে আইএস বাহিনীতে যোগ দেয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের ভেতরে বেশ কিছু বড় আকারের জঙ্গি আক্রমণ হয়, যার দায় স্বীকার করে আইএস।

আফগানিস্তানে যুদ্ধ তো চলছে, তার সঙ্গে আমেরিকা-সৌদি আরবের নেতৃত্বে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হয় আইএসের বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে দ্বৈত লক্ষ্য, অর্থাত্ সিরিয়ায় আসাদের গদি রক্ষা ও আইএস উত্খাতে যুদ্ধে নামলে দৃশ্যপট বদলে যায়। ২০১৮ সালে এসে আইএস পরাজিত এবং ইরাক-সিরিয়া থেকে উত্খাত হয়েছে। ৯/১১-এর পর থেকে গত ১৮ বছরের হিসাব-নিকাশ করলে যা দেখা যায় তা হলো—এক. কয়েক লাখ নিরীহ মানুষের জীবন গেছে। প্রায় এক কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে শরণার্থী হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। দুই. ইরাক, সিরিয়ার মতো দুটি আধুনিকমনা সমৃদ্ধ দেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে আজ প্রতিনিয়তই হাহাকার ও রক্তক্ষরণ চলছে। তিন. ধ্বংস হয়ে যাওয়া আফগানিস্তানে আবার সেই বর্বর তালেবান বাহিনী ক্ষমতায় বসার অপেক্ষায় আছে। আমেরিকাই তার জন্য দেনদরবার করছে। চার. আন্তধর্মের সহাবস্থানের জায়গাগুলো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। ভারত থেকে ইউরোপ, আমেরিকা পর্যন্ত মধ্য থেকে চরম ডানপন্থীদের উত্থান ঘটছে। হেইট ক্যাম্পেইন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। পাঁচ. আফগানিস্তান ও ইরাকে কয়েক হাজার সেনা সদস্য নিহত হয়। কিন্তু তার বিনিময়ে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার কামাই করে নিয়েছে আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায়ী কম্পানিগুলো। একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশগুলোর পুনর্গঠন, পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনের নামে আন্তর্জাতিক করপোরেট হাউসগুলো ঠিকাদারির মাধ্যমে আরো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ওই সব দেশ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। তবে এখন যা দেখছি তাকে কী বলা যায়, ভাগ্যের পরিহাস, নাকি কূটকৌশলের পরিণতি।

যে আফগানিস্তানে ১৮ বছর যুদ্ধ এবং প্রায় আড়াই হাজার নিজ বাহিনীর সৈন্যের প্রাণের বিনিময়ে তালেবান বাহিনীকে হটিয়ে নিজেদের পছন্দমতো সরকার প্রতিষ্ঠিত করেছিল, সেই তালেবান বাহিনীকে আবার ক্ষমতায় আসার পথ বের করার জন্য তালেবানের সঙ্গে একটা আপসরফার চেষ্টা করছে আমেরিকা। যদিও কয়েক দিন আগে কাবুলে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও তার দায় স্বীকার করার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত কাতারে অনুষ্ঠিত গত দেড় বছরের চলমান সংলাপকে স্থগিত করেছেন। আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে অবশিষ্ট সেনাবাহিনীকে সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাহার করে নিতে চাইছে। এই লক্ষ্যে তালেবানের সঙ্গে আমেরিকার পক্ষে সংলাপ চালাচ্ছেন আফগান বংশোদ্ভূত আমেরিকার নাগরিক জাল মে খলিলজাদ। সংলাপ সফল হলে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে সঙ্গে সঙ্গে নব্বইয়ের দশকের মতো আফগানিস্তানে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সমর্থনে সে গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে কাবুলে ক্ষমতায় আসবে তালেবান বাহিনী। অর্থাত্ ব্যাক টু স্কয়ার ওয়ান। ১৮ বছর আগে যেখানে ছিলাম সেখানেই ফিরে এলাম। তালেবান বাহিনী আবার আফগানিস্তানে ক্ষমতায় এলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ কোন দিকে ধাবিত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বের কোথায় কী ঘটবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে ভারত, বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এটা যে আগাম বিপদবার্তা, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায়।

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

 

মন্তব্য