kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

তেলের বাজারে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব

অনলাইন থেকে

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এ সপ্তাহেই বৈঠকে বসছে শীর্ষ তেল উৎপাদক দেশগুলো। উৎপাদনে কাটছাঁট করা যায় কি না, বৈঠকে সেটাই বিবেচনা করবে তারা। কিন্তু চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধের বিরূপ প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে তারা অশোধিত তেলের দর চাঙ্গা করতে পারবে কি না, এ নিয়ে বিশ্লেষকদের মনে সন্দেহ রয়েছে।

ওপেক ও ওপেকবহির্ভূত সদস্যরা তেলের দরের নিম্নগতি ঠেকাতে চায়, উৎপাদন হ্রাস এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান ও ভেনিজুয়েলা থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পরও দরপতন অব্যাহত রয়েছে।

‘ওপেক প্লাস’-এর জয়েন্ট মিনিস্টারিয়াল মনিটরিং কমিটি আগামী বৃহস্পতিবার আবুধাবিতে বৈঠকে বসবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কমিটির উৎপাদন কাটছাঁট করার সুযোগ সীমিত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহেইল আল-মাজরুয়েই গত রবিবার বলেছেন, অশোধিত তেলের বাজারে আবার ভারসাম্য আনতে যা যা করণীয় সবই করা হবে। তিনি এ কথাও স্বীকার করেন, বিষয়টির পুরোটাই শীর্ষ উৎপাদকদের হাতে নেই।

ওয়ার্ল্ড এনার্জি কংগ্রেসের প্রাক্কালে আবুধাবিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তেলের বাজার এখন আর চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে না বরং বেশি প্রভাবিত হচ্ছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধ ও ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন ফ্যাক্টরের কারণে।

আল-মাজরুয়েই বলেন, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে আরেক দফা উৎপাদন হ্রাসের কথা ভাবা হবে বটে, তবে ওই ব্যবস্থা দর চাঙ্গা করার সর্বোত্তম উপায় নাও হতে পারে। তিনি বলেন, বাজারে ভারসাম্য আনার জন্য গ্রুপ যে বিষয়ে ভাবতে চায়, সে বিষয়েই তাঁরা আলোচনা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং যা কিছু করণীয়, তা করবেন বলে আশা করেন। তবে বাণিজ্য বিরোধ আছে বলেই তিনি উৎপাদন হ্রাসের পরামর্শ সব সময় দেবেন না।

বিশ্লেষকরা বলেন, উৎপাদন হ্রাস দর পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারে। তবে এর আরেক অর্থ হলো উৎপাদকরা মার্কেট-শেয়ার হারাতে পারে। কুয়েত ফিন্যানশিয়াল সেন্টারের (মারকাজ) গবেষণা-প্রধান এম আর রঘু বলেন, বাজারদর চাঙ্গা করার জন্য ওপেক বরাবরই উৎপাদন হ্রাসের ব্যবস্থা নিয়েছে। এটাই তার ঐতিহ্য। যা-ই হোক, এর একটা প্রতিফল আছে—ওপেকের গ্লোবাল ক্রুড মার্কেট শেয়ার ২০১২ সালে ছিল ৩৫ শতাংশ, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সেটা ৩০ শতাংশে নেমেছে।

চব্বিশ জাতির ওপেক প্লাস গ্রুপটি ওপেক কার্টেলের নেতা সৌদি আরব এবং ওপেকবহির্ভূত উৎপাদক রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন। গ্রুপটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে উৎপাদন হ্রাসে সম্মত হয়েছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতির অবনতিশীল দশা এবং মার্কিন শেল অয়েলের বিপুল উৎপাদনের কারণে সৃষ্ট অতি সরবরাহজনিত হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে তখন ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

সরবরাহ হ্রাসের পূর্ববর্তী পদক্ষেপগুলোর বেশির ভাগই দর চাঙ্গা করায় সফল হয়েছে। কিন্তু এবার বাজার পতন অব্যাহত রয়েছে, এমনকি গত জুনে ওপেক প্লাস দিনে ১২ লাখ ব্যারেল উৎপাদন কমানোবিষয়ক আগের সিদ্ধান্ত আরো ৯ মাস বহাল রাখতে সম্মত হওয়ার পরও। এ অবস্থার জন্য দায়ী নতুন কারণটি হচ্ছে—বিশ্বের বৃহৎ দুই অর্থনীতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিরোধ। তাদের পাল্টাপাল্টি শুলড় আরোপের ফলে বৈশ্বিক মন্দার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে তেলের চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সৌদি অর্থনীতিবিদ ফাহদ আল-বৌনাইন বলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধে তেলের বাজার খুবই সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে। তেলের দরে যা ঘটছে, তা ওপেকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যা-ই হোক, তাঁর ধারণা ওপেক প্লাস নতুন উৎপাদন হ্রাসে যাবে না। কারণ এর ফলে গ্রুপের এরই মধ্যে সংকুচিত শেয়ারে আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দরই তেলের বাজারে বেঞ্চমার্ক বিবেচিত হয়। শুক্রবার ব্রেন্ট বিক্রি হয়েছে প্রতি ব্যারেল ৬১.৫৪ ডলারে। গত বছরের একই সময়ে এর দর ছিল প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলার। অবশ্য গত ডিসেম্বরে দর পড়ে গিয়েছিল ৫০ ডলারে, সে তুলনায় এখন দর একটু বেশি আছে। দরে এটুকু অগ্রগতির কারণ ইরান ও ভেনিজুয়েলা থেকে হ্রাসকৃত হারে তেলের সরবরাহ এবং মার্কিন তেলের উৎপাদনে ধীরগতি। মোট কথা, তেলের সরবরাহ খুব বেশি পরিমাণে হচ্ছে না।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গত মাসে জানিয়েছে, মার্কিন শেল অয়েলের উৎপাদন বৃদ্ধি পূর্ববর্তী সাইকেলে যে মাত্রায় হচ্ছিল সে মাত্রায় হচ্ছে না। ওপেকের উৎপাদন গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন মাত্রায় রয়েছে। ৯ মাস ধরে দৈনিক ২৭ লাখ ব্যারেল কম উৎপাদিত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এ সময় বড় তেল উৎপাদকদের নীতি-বিকল্প বেশ সীমিত।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে না। তবে আগামী ডিসেম্বরে ভিয়েনায় ওপেক প্লাসের মিনিস্টারিয়াল মিটিংয়ের জন্য পরামর্শ প্রণয়ন করা উচিত। রাপিদান এনার্জি গ্রুপ বলেছে, বাজার স্থিতিশীল করার জন্য এ জোটকে দৈনিক উৎপাদন আরো ১০ লাখ ব্যারেল কমাতে হবে। কিন্তু কোন কোন সদস্য দেশ উৎপাদন হ্রাসের চাপ কাঁধে নেবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সমস্যা হয়ে দেখা দেবে।

কার্যত ওপেক কার্টেলের নেতা সৌদি আরব। ওপেক যত তেল উৎপাদন করে এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে সৌদি আরব। শেষবার উৎপাদন হ্রাসের চাপ আনুপাতিক হারের চেয়েও বেশি নিয়েছিল দেশটি। তেল খাতের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনও ঘটেছে। প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমানকে জ্বালানিমন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।

বৌনাইন বলেছেন, রাজস্ব আয়বিষয়ক বিবেচনা থেকে এবার রিয়াদ আরেক দফা উৎপাদন হ্রাসের প্রস্তাবে বাদ সাধবে। এম আর রঘু মনে করেন, দায়ভার নেওয়ার ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি না হলে উৎপাদন কমিয়েও তেলের দর চাঙ্গা করা যাবে না।

 

সূত্র : দি এশিয়া টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা