kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন করে ভাবতে হবে

রেজানুর রহমান

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন করে ভাবতে হবে

প্রচলিত একটা কথা আছে—বিড়াল প্রথম রাতেই মারতে হয়। কেন মারতে হয় তা নিয়েও একটি গল্প আছে। এক রাজার দুই মেয়ে ছিল। তারা দুজনই বিড়াল পছন্দ করত। খাওয়া, ঘুমানো, বেড়ানো—সব কাজেই তাদের সঙ্গে নিজেদের প্রিয় বিড়াল থাকত। রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন দুই মেয়ের একসঙ্গে বিয়ে  দেবেন। তবে পাত্র দুই ভাই অথবা দুই বন্ধু হলে ভালো হয়। রাজ্যময় খবর ছড়িয়ে গেল। দুই বন্ধু দরবারে এসে হাজির। দুজনকেই খুব পছন্দ হলো রাজার। দুই মেয়ের সঙ্গে দুই বন্ধুর বিয়ে দিয়ে রাজ্যের দেখভাল করার জন্য একজনকে পাঠালেন উত্তরে, অন্যজনকে দক্ষিণে। দুই বোন সংসার করার জন্য নিজ নিজ স্বামীর সঙ্গে চলে গেল রাজবাড়ি ছেড়ে। কয়েক মাস পর রাজবাড়ির এক অনুষ্ঠানে তাদের ডাক পড়ল। বিয়ের পর এই প্রথম দুই বন্ধুর দেখা। এক বন্ধুর স্ত্রী তার কথায় ওঠে আর বসে এমন অবস্থা। অন্য বন্ধু একেবারেই বিপরীত। সে তার স্ত্রীর কথায় ওঠে আর বসে। দ্বিতীয় বন্ধু প্রথম বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, ভাই, তুই তো দেখি অনেক সুখে আছিস। কী করে এটা সম্ভব হলো? প্রথম বন্ধু জিজ্ঞেস করল, তুই কি বাসর রাতে বিড়াল মেরেছিস? দ্বিতীয় বন্ধু বলল, না। প্রথম বন্ধু বলল, তাহলেই মরেছিস। শোন, বিয়ের পর বাসর রাতেই বিড়াল মারতে হয়। আমি সেটাই করেছি। বিয়ের প্রথম রাতেই আমার স্ত্রীর প্রিয় বিড়ালকে তলোয়ার দিয়ে দুই ভাগ করেছি। তাই দেখে আমার স্ত্রী বুঝে নিয়েছে আমি খুব সাহসী পুরুষ। আমার সঙ্গে ‘নয়ছয়’ করা চলবে না। আর তাই আমি যা বলি তা-ই সে করে। এবার বুঝলি তো বিড়াল কেন প্রথম রাতে মারতে হয়?

বিড়াল মারার এই গল্প মেয়েদের অনেকেরই হয়তো পছন্দ হবে না। গল্পটা রূপক অর্থে বললাম। কেন বললাম এবার তার একটি ব্যাখ্যা দিই। আজ থেকে দুই বছর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নারকীয় হামলা চালায়, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য করে, তখনকার চিত্র ভাবুন তো একবার। কঙ্কালসার দেহ, দুই চোখ কোঠরাগত, পরনে ছিন্ন বস্ত্র...এ রকম অসহায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে। তখন মহান একাত্তর সালের সেই দুঃসহ জীবনের কথা মনে পড়েছিল আমাদের। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমরাও এভাবে পাশের দেশ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেই স্মৃতি মনে করে মানবিক বিবেচনায় লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেয়। শুধু আশ্রয় দেয় না, শুরুর দিকে রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে গোটা দেশের মানুষ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। খাবারসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষও ছুটে গিয়েছিল আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কাছে। স্থানীয় অনেকেই তাদের ভিটেবাড়ির খালি অংশও ছেড়ে দিয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য। দুই বছরের ব্যবধানে কতই না পরিবর্তন। রোহিঙ্গাদের চেহারা, স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। তারা দামি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। স্থানীয় লোকজনকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। আগে তাদের নেতা ছিল না। এখন তাদের নেতা গজিয়েছে। নেতারা বড়ই আয়েশি জীবনযাপন করছে। দুই বছর আগে তারা যখন এ দেশে আসে তখন তাদের একটাই আকুতি ছিল, বিপদে পড়েছি একটু আশ্রয় দিন। মানবিক বিবেচনায় তারা আশ্রয় পেয়েছিল। দুই বছরের ব্যবধানে তাদের সুর যেন পাল্টে গেছে। আগে ছিল বিনীত। এখন যেন উদ্ধত, ড্যামকেয়ার ভঙ্গি...‘বাংলাদেশ বললেই তো আমরা যাব না।’ কঠিন কথাও বিনয়ের সঙ্গে বলা যায়। সেটা এখন আর রোহিঙ্গাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে না। এর একটাই কারণ—বিড়াল প্রথম রাতে না মারা। কিন্তু বাংলাদেশ যে অতি মানবিক একটি রাষ্ট্র। শুরুতেই অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো কঠিন শর্ত আরোপ করতে চায়নি। ‘মানুষ মানুষের জন্য’—এই ভাবনাটাই প্রধান হয়ে উঠেছিল মানবিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে। কিন্তু এই ভাবনাটাই শেষ পর্যন্ত একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেবে না তো?

মনের  ভেতর কত প্রশ্নই না ঘুরপাক খাচ্ছে। এই তো সেদিন রোহিঙ্গাদের বিরাট সমাবেশে একজন নেতাকে জনসমক্ষে বক্তৃতা করতে দেখলাম। যিনি কিছুদিন আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে হলে পাসপোর্ট লাগে। ওই নেতার পাসপোর্ট কোন দেশের? মিয়ানমারের নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কি বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে তিনি আমেরিকায় গিয়েছিলেন? যদি তা-ই হয়, বাংলাদেশের পাসপোর্ট তিনি পেলেন কিভাবে? অথবা তিনি যদি অন্য কোনো দেশের অধিবাসী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কি যথাযোগ্য অধিকার নিয়ে বাংলাদেশে বিচরণ করছেন?

পত্রিকায় পড়লাম রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে নাকি ঘরে ঘরে মোবাইল ফোনের ব্যবহার চলে। অনেকের হাতেই দামি মোবাইল ফোন। এত টাকা তারা পায় কোথায়? সবচেয়ে বড় কথা, মোবাইল ফোনের নম্বর পাওয়ার জন্য দেশের একজন সাধারণ মানুষকে এখন কতই না কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ভোটার আইডি নম্বর লাগে। আঙুলের ছাপ দিতে হয়। রোহিঙ্গারা তো এই দেশের ভোটার না। তারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে কিভাবে? যদিও এখন রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এই কাজটা আগে করা হলো না কেন? চোর পালানোর পর বুদ্ধি বাড়লে তো কাজের কাজ কিছুই হবে না। চোর তো যা চুরি করার করে গেছে। এখন চুরির মাল উদ্ধার হবে কিভাবে? অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের এই যে এত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলো। তারা রাজার হালে খায়, রাজার হালে ঘুমায়, মোবাইল ফোনে যখন খুশি যার-তার সঙ্গে কথা বলে, কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের জালও বানাতে শুরু করেছিল। ষড়যন্ত্র যতটা না মিয়ানমারের বিরুদ্ধে, তার চেয়ে বেশি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত। মাদক কারবার নিয়েই ষড়যন্ত্রটা বেশি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। মোবাইল ফোন এই কাজে বেশ সহায়ক হয়ে উঠেছে বলে অনেকের ধারণা।

প্রিয় পাঠক, আমার আজকের এই লেখা পড়ে অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন আমি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি। মোটেই তা নয়। আমি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক সংগ্রামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তবে আমার ধারণা, রোহিঙ্গারা এখন একটু বিভ্রান্ত। তারা নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। তাদের উচিত নিজ দেশে কিভাবে ফেরত যাওয়া যায় সে চেষ্টাই করা। কিন্তু তারা কি আদৌ সেটা করছে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের অনেকে নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার চেয়ে আশ্রিত দেশে নতুন নতুন সংকট সৃষ্টিতে বেশি তৎপর। যারা তাদের আশ্রয় দিয়েছে তাদের প্রতি সামান্যতম কৃতজ্ঞতাবোধ দেখানোর ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত অনেকে। এ জন্য বিভিন্ন এনজিও সংস্থার ভূমিকার ব্যাপারেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রথম রাতে বিড়াল মারার গল্পটি এ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার

সম্পাদক, আনন্দ আলো

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা