kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পুলিশের ওপর বোমা হামলা রহস্য উদ্‌ঘাটন করা দরকার

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পুলিশের ওপর বোমা হামলা রহস্য উদ্‌ঘাটন করা দরকার

রাজধানী ঢাকায় পর পর তিনটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। তিনটি হামলারই লক্ষ্যবস্তু ছিল রাস্তায় কর্মরত পুলিশ। এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসন তাদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এই হামলাকে জঙ্গিদের ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনটি হামলাকেই জঙ্গিদের বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ অবশ্য বলেনি যে তারা হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পেরেছে কিংবা তাদের ধরে জানতে পেরেছে তারা কারা। সাধারণভাবে এখন পুলিশকে টার্গেট করে যারা হাতবোমা বা ককটেল নিক্ষেপ করছে, তাদের জঙ্গি হিসেবেই দাবি করা হচ্ছে। কেননা সাধারণ সন্ত্রাসী বা রাজনৈতিক উগ্র মতাবলম্বী কোনো দলের কর্মী পুলিশের ওপর এ ধরনের হামলা করবে বলে পুলিশ বা অন্য কেউ মনে করছে না। কারণ গত তিন থেকে চার বছর বাংলাদেশে জঙ্গিরা ব্যতীত অন্য কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে এভাবে বোমা হামলা করছে না। যারা ধরা পড়ছে, তারা সবাই কোনো না কোনো জঙ্গি সংগঠনের ‘নিবেদিত’প্রাণ কর্মী বলে তদন্তে বের হয়ে এসেছে। সেই হিসেবেই ধরা হচ্ছে যে গুলিস্তান, মালিবাগ এবং সব শেষ সায়েন্স ল্যাবরেটরির সম্মুখে পুলিশকে লক্ষ্য করে যে বোমা হামলা ঘটানো হয়েছে, তা জঙ্গিদের অপকর্ম বলে সাধারণভাবে প্রচার করা হয়েছে। আবার ঘটনাগুলোর পরপরই আইএস নামের একটি আন্তর্জাতিক উগ্র জঙ্গিবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের কর্মকাণ্ড হিসেবে দাবি করে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। আইএস এখন আন্তর্জাতিকভাবে সিরিয়ায় তাদের অবস্থান হারানোর পর কতটা অন্যান্য দেশে হামলা করার সক্ষমতা রাখে, সেটি একটি গভীর তথ্য-উপাত্তের বিষয়। কিন্তু যেসব বিবৃতি প্রদান করা হয়ে থাকে, সেসব যদি তাদেরই বিবৃতি হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে যে আইএস বিবৃতির মাধ্যমে তাদের শক্তি ও সমর্থনের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করতে চায়। আবার ওই বিবৃতিটি যদি তাদের না হয়ে এ দেশে কিংবা বিদেশে অবস্থানরত কেউ দিয়ে থাকে, তাহলে খুঁজে দেখতে হবে ওরা আসলে কারা। তারা তো দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী কেউ হতে পারে অথবা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধশক্তি বলেও কেউ হতে পারে অথবা সত্যি সত্যি কোনো ধর্মান্ধগোষ্ঠী হতে পারে, যারা কৌশলগত কারণে আইএসের নাম ব্যবহার করছে—বিষয়গুলো আসলে খুব গভীর অনুসন্ধান করে দেখা দরকার। তাহলে প্রকৃত সত্যাসত্য উন্মোচিত হতে পারে। এমনিতে এ ধরনের ঘটনা নিয়ে নানা অপশক্তির নানা ধরনের অপতৎপরতাও হতে পারে। কোনোটাকেই উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সুতরাং জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত আইএস নাকি দেশীয় কোনো উগ্রবাদীগোষ্ঠী জড়িত, নাকি অন্য কেউ জড়িত, সেটি প্রতিটি ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং সংগঠকদের আটক করার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে দেখা দরকার। আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা অবশ্যই বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। আমরা জানি না, তাঁদের হাতে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ এরই মধ্যে এসেছে কি না। যদি এসে থাকে, তাহলে তাঁরাই বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সচেষ্ট হবেন।

ধরে নিলাম, পুলিশকে লক্ষ্য করে ছোড়া বোমাগুলো জঙ্গিদেরই অপতৎপরতা। যেহেতু এই বোমাগুলো রাস্তায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ওপর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তাই ধারণা করা ভুল না-ও হতে পারে যে বোমা হামলাকারীরা তাদের অপতৎপরতা ইচ্ছামতো বৃদ্ধি করতে না পারার অন্যতম বাধা তাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের পুলিশ তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেননা কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, জঙ্গি দমনে ক্ষমতাসীন সরকার যখন দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে, তখন পুলিশ সাধ্যমতো জঙ্গি দমনে সচেষ্ট থাকে। আবার যে সরকার জঙ্গিদের প্রতি দুর্বল ছিল, তাদের আমলে জঙ্গিরা বেশ নিরাপদেই তাদের বোমাবাজি, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার কাজ করতে পেরেছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের ২০০৯-পরবর্তী সময় থেকে জঙ্গি দমনে কঠোর অবস্থান এবং নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গি দমনে অনেক বেশি সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারছে। সে কারণে জঙ্গিরা সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অপতৎপরতার প্রকাশ ঘটাতে চায়, তার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় পুলিশ বা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সে কারণে আমাদের দেশে বর্তমানে জঙ্গিদের একটি বড় ধরনের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। এটি ২০১২-২০১৩ সালের বেশ কিছু থানা আক্রমণে যেমনটি দেখা গেছে। ওই সময় পুলিশকে হত্যা করার প্রকাশ্য দৃশ্যও গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী দেখতে পেরেছিল। তখন উগ্র হঠকারী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পুলিশকে ‘শায়েস্তা’ করার মতো প্রশিক্ষণ আছে বলে মনে করত। তার কিছু বহিঃপ্রকাশও তখন তারা ঘটিয়েছিল। এরপর রাজনৈতিক ওই সব সন্ত্রাসীর পুলিশের ওপর হামলার উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে খুব একটা নিতে দেখা যায়নি। কারণ তারা বুঝে গেছে যে পুলিশের ওপর হামলার অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর হামলা। সুতরাং রাষ্ট্র তার আত্মরক্ষার জন্য আইনগতভাবেই এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে তৎপর হতে বাধ্য।

কোনো রাজনৈতিক দলের এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন যে সম্ভব নয়, সেটি হয়তো দেরিতে হলেও তারা উপলব্ধিতে নিয়েছে। কিন্তু উগ্র হঠকারী মতাদর্শে বিশ্বাসী কোনো না কোনো গোষ্ঠীকে নতুনভাবে জঙ্গিবাদী কায়দায় আবির্ভূত হতে দেখা যায়। অনেক তরুণই ধর্মের সরল বিশ্বাসকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা ঘটনা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার নিজস্ব ধর্মীয় মতাদর্শের মতো করে পরিবর্তন আনতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। সে ধরনের কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি সমাজে গোপনে সক্রিয় আছে।

একসময় যারা নকশালবাদী তথা উগ্র মতাবলম্বী হয়ে গলা কাটা, থানা লুট, পুলিশ হত্যা, প্রশাসনকে আক্রমণ ইত্যাদি করে রাষ্ট্রের উচ্ছেদ ঘটাতে আত্মাহুতি দিয়েছিল, তারাও খুব একটা সফল হয়নি। জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা গত এক-দেড় শ বছর আমাদের মহাদেশে নানা বাহিনীতে যোগদান করে আত্মাহুতি দিয়েছে, তাদের আত্মাহুতির সুফলও পৃথিবীতে কেউ দেখেনি। এই বিষয়গুলো তরুণ প্রজন্মের যারা উগ্র হঠকারী, জঙ্গিবাদী চিন্তায় যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করতে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তারা খুব বেশি বাস্তব জ্ঞান দিয়ে বিচার করে দেখে না। তাদের সেই জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা তাদের বিচার করার মতো হয়তো শিক্ষা থাকে না। তারা প্রধানত অন্ধবিশ্বাস ও আবেগতাড়িত হয়ে এসব তথাকথিত ‘বিপ্লববাদী’ অপকর্মে যুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে তরুণদের প্রয়োজন হচ্ছে, ধর্মের পবিত্রতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞানচর্চার জন্য যেসব মৌলিক বইপুস্তক রয়েছে, সেসব বইপুস্তক পাঠ করা, একই সঙ্গে বিশ্ববাস্তবতায় সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, জীবনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমস্যা, সম্ভাবনা ইত্যাদি সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞানার্জন করা। সাধারণ গাইডসর্বস্ব বইপুস্তক পড়ে মোটেও পৃথিবীর জটিল এসব বিষয় জানা যাবে না। সুতরাং যারা এ পথে পা বাড়ায় তারা বয়স, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং ক্রিটিক্যাল ফ্যাকাল্টি তৈরি করার নিরন্তর চেষ্টা থেকে অনেক বেশি দূরে থাকে বলেই এই পথে বেশি পা বাড়ায়।

বাংলাদেশে উগ্র জঙ্গিদের দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যতটা সফল হয়েছে বলে আমাদের মনে হয়, তা নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন নেই। তবে যেটি আমাদের সরকার এবং সমাজসচেতন মানুষকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে তা হচ্ছে, দেশ উগ্র জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর একটি হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সমাজ, রাষ্ট্র ও বিজ্ঞান চিন্তার বিষয়টি খুবই সেকেলে, গোলমেলে এবং তরুণদের মনোজগৎ সুস্থ, স্বাভাবিক চিন্তাধারায় বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি ভূমিকা রাখে না। তা ছাড়া আমাদের রয়েছে নানা ধারা-উপধারার শিক্ষাব্যবস্থা। যা থেকে যেসব তরুণ বের হচ্ছে, তাদের অনুসন্ধিত্সু মন এবং বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক, অভাব, ভুল ব্যাখ্যা, অজ্ঞানতা ইত্যাদি রয়েছে। ফলে এরা খুব বেশিসংখ্যক সৃজনশীল, চিন্তাশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারায় গড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণীও ভুল ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী হয়ে এ ধরনের পথে পা বাড়ায়। একসময় উগ্র বামপন্থী চিন্তায় অনেক মেধাবী তরুণ যুক্ত হয়েছিল। এখন বাম পন্থায় নানা দুর্যোগ চলছে। মতাদর্শের এই ঘাটতি পূরণ করতে উগ্র ডান পন্থায় বিশ্বাসীরা এগিয়ে আসছে। তারাও একই রকম ভুল করছে। তবে এদের আহ্বানে অনেক বেশিসংখ্যক তরুণ-তরুণী, এমনকি বয়স্ক মানুষও পা বাড়াচ্ছে। প্রধান কারণই হচ্ছে, তাদের বিশ্বাসের বিপরীতের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞানতত্ত্ব তাদের জানা নেই। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক নানা ঘটনায় অনেক মানুষই এমন সব প্রচার-প্রচারণায় আপ্লুত হয়, যেগুলোর বিপরীত সঠিক চিন্তাটি জানার মতো তথ্য-উপাত্ত ও বইপুস্তকের অনুসন্ধান তাদের কাছে থাকে না। ফলে সহজ পথ হিসেবে এরা এমন প্রবণতায় অংশ নিয়ে থাকে। আরেকটি গোষ্ঠীকে ব্যক্তিগত জীবনের নানা হতাশা, চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান থেকেও যুক্ত হতে দেখা যায়। আবার পশ্চিমা দুনিয়ায় গিয়ে সেখানকার সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা অসংগতির কোনো সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না জানা থেকেও উগ্র ধর্মান্ধতার পথে যুক্ত হয়। আসলে বিশ্ববাস্তবতার বিকাশ, সমস্যা ও সম্ভাবনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বোঝা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না, বোঝার মানসিক গড়নও থাকে না। সুতরাং নানা জটিল অঙ্কে আমাদের জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের উঠে আসার বিষয়টি দেখতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম, প্রচারমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পরিবার ইত্যাদিকে কমবেশি দায়িত্ব নিতে হবে, কাজ করতে হবে, নতুন প্রজন্মকে এসব জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারণায় গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই জঙ্গিবাদ ক্রমেই দুর্বল হবে।

লেখক : অধ্যাপক, বাউবি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা