kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনই সোনার বাংলার চাবিকাঠি

বাহালুল মজনুন চুন্নু

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনই সোনার বাংলার চাবিকাঠি

শিক্ষার প্রথম পাঠ সাক্ষরতা। সাক্ষরতা অর্জনের মধ্য দিয়েই একজন মানুষ তার শিক্ষাজীবন শুরু করে। সাক্ষরতা অর্জনের মধ্য দিয়ে একজন মানুষ তার অর্জিত দক্ষতাকে শিখন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, সারা জীবন যেমন শেখার কাজ অব্যাহত রাখতে পারে, তেমনি স্বশিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে সমাজে স্থান করে নিতে পারে। সাক্ষরতার  ধারণাটি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে হিব্রু সভ্যতায় চিহ্ন বা প্রতিকৃতিভিত্তিক অক্ষরের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। রোমান ও গ্রিকরাও মনের ভাব লিখিতভাবে প্রকাশ করার উপায় হিসেবে চিহ্ন বা সংকেত ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় চিহ্ন বা সংকেত তথা অক্ষর চেনা, পড়া, লেখা ও ব্যবহার করার প্রক্রিয়া, যা সাক্ষরতা হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাক্ষরতার সংজ্ঞায় তফাৎ থাকলেও ১৯৬৭ সালে ইউনেসকো সর্বজনীন একটি সংজ্ঞা দেয়, যেখানে পড়তে, লিখতে, বলতে পারার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশ করতে পারাকে সাক্ষরতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ব্যক্তিকে সাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য অন্তত তিনটি শর্ত মানতে হয়— ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে। এই প্রতিটি কাজই হবে ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাক্ষরতার ক্ষেত্রে সাধারণত নিজের ভাষার অক্ষরজ্ঞান জানাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে মাল্টিলিঙ্গুয়ালিজম বা বহুভাষা শিখনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কেননা শুধু নিজের মাতৃভাষার অক্ষরজ্ঞান অর্জন করলেই হয় না, পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার অক্ষরজ্ঞান জানাটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা কিন্তু সবার মাতৃভাষা নয়, বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা রয়েছে। আবার ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হলেও সেখানে বহু ধরনের ভাষা বিদ্যমান। তো মাতৃভাষায় অক্ষরজ্ঞান অর্জন করা জীবনদক্ষতা অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি হলেও রাষ্ট্রভাষায় সাক্ষরতা অর্জন করাটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজির অজ্ঞরজ্ঞান অর্জন করাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু একটি ভাষাই নয়, জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভাষাগুলোর অক্ষরজ্ঞান ও জীবন দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে তাই এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের স্লোগান ঠিক করা হয়েছে—‘লিটারেসি অ্যান্ড মাল্টিলিঙ্গুয়ালিজম’। তবে স্লোগান ঠিক করলেই হবে না, একে বাস্তবায়নের জন্য সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আমরা জানি সাক্ষরতার সঙ্গে একটি দেশের উন্নতি, অনুন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে। এমনকি একটি দেশের উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম সামাজিক সূচক সাক্ষরতার হার। যে দেশের সাক্ষরতার হার যত বেশি সে দেশ তত উন্নত। সাক্ষরতা মানুষকে কর্মক্ষম ও মানবসম্পদে পরিণত করে। সাক্ষরতার মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের দ্বার উন্মুক্ত হয়, যা জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাই সাক্ষরতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবীয় অধিকার হিসেবে বিশ্বে গৃহীত হয়ে আসছে। এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশু মৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি বিকশিতকরণের ক্ষেত্রেই শুধু সাক্ষরতা অনন্য ভূমিকা পালন করে না, এটি একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক মনোবল বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। একজন নিরক্ষর বা সাক্ষরতা জ্ঞানশূন্য ব্যক্তিকে সমাজের ‘বোঝা’ বলে বিবেচনা করা হয়। কেননা বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ন্যূনতম শিক্ষা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। একটি উৎপাদনশীল, উন্নয়নমুখী, কর্মদক্ষ-সচেতনমুখী-আলোকিত ও সুশৃঙ্খল জাতি গঠনে সাক্ষরতার দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল সমাজ নির্মাণের মূল ভিত্তিই হলো সাক্ষরতার দক্ষতা অর্জন করা। তা ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রমকে টেকসই করার জন্য সাক্ষরতার বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বিশ্বে এখনো প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৮ কোটিই সাক্ষর নয়। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি পাঁচজনের একজন নিরক্ষর। আর এই জনগোষ্ঠীর ৬৪ শতাংশই নারী। শিশুদের ক্ষেত্রেও চিত্রটা উদ্বেগজনক। জাতিসংঘ ঘোষিত সবার জন্য শিক্ষা স্লোগানের পরও বিশ্বের সাড়ে সাত কোটির বেশি শিশুই জানে না কী করে লিখতে-পড়তে হয়। এই জন্যই আমরা দেখি, জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত মিলেনিয়াম গোল তথা সহস্রাবদ্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল তথা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সাক্ষরতা দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে সাক্ষর লোকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষই ছিল শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই বিষয়টি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, এই দেশের জনগণকে সাক্ষর না করা গেলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য যুগপত্ভাবে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সব সময়ই গণমুখী শিক্ষাকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণমুখী শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্যই ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে তাঁর নির্দেশনায় একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত পর্যাপ্ত বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা পাঠদানের বিষয়টি আবির্ভূত করা হয়। তিনি সাক্ষরতা আন্দোলনের সূচনা করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৭২-৭৩ সালে দেশপ্রেমিক মোকছেদ আলীর উদ্যোগে ঠাকুরগাঁও জেলার কচুবাড়ি কৃষ্টপুর গ্রাম দেশের প্রথম নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম হয়ে ওঠা। নিরক্ষরতা দূরীকরণের ওপর বঙ্গবন্ধু যে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে। গণশিক্ষা বিস্তারে তথা নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ করেছিলেন আড়াই কোটি টাকা। সাক্ষরতা বা বয়স্ক শিক্ষার (১৫+) জন্য ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রণীত কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়, যার ওপর ভিত্তি করে সাক্ষরতা কার্যক্রম বিস্তারে গ্রহণ করা হয় নানামুখী পদক্ষেপ। তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিতেও সাক্ষরতাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে সাক্ষরতার হার দীর্ঘকাল স্থবির অবস্থায় থাকলেও ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিগত সাড়ে আট বছরে সাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এখনো নিরক্ষর। স্বাধীনতার পর সাত কোটি মানুষের মধ্যে যেখানে সাক্ষরতার হার মাত্র ২০ শতাংশ ছিল, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে তা ৭২.৩ শতাংশ।

সাক্ষরতার হারের দিক দিয়ে এই যে ক্রমোন্নতি তা কিন্তু আশাব্যঞ্জক। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে দেশের বিদ্যমান ২৮ শতাংশ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষর ও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪-এর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাসংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষার প্রসার ও নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কর্তৃক ১৫-৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষের জন্য দেশব্যাপী ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প’ (৬৪ জেলা) নামে একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় ২০২০ সালের মধ্যে ৬৪টি জেলায় পাঁচ হাজার ২৫টি কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করে নব্য সাক্ষরদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানের আয়বর্ধক কাজে সম্পৃক্ত করে জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তবে আমাদের দেশে এখনো মাল্টিলিঙ্গুয়ালিজম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। একদিকে সব ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষার লিখিত রূপ এখনো তৈরি হয়নি, ফলে তারা নিজেদের মাতৃভাষায় সাক্ষরতা অর্জন করতে পারছে না। আবার সাক্ষরতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা ইংরেজিকে এখনো তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। যুগের চাহিদার কথা বিবেচনা করে এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরো মনোযোগী হতে হবে। সরকারের একার পক্ষে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে মাল্টিলিঙ্গুয়ালিজম বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিগত সংস্থার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। যদি সাক্ষরতার ক্ষেত্রে মাল্টিলিঙ্গুয়ালিজম বাস্তবায়ন করা যায় এবং সাক্ষরতার হার শতভাগ করা যায়, তাহলে এই দেশ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় পরিণত হওয়াটা হবে শুধু সময়ের ব্যাপার।

 

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা