kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিজেপির রাজনৈতিক হাতিয়ার এনআরসি

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিজেপির রাজনৈতিক হাতিয়ার এনআরসি

বিংশ বা একবিংশ শতাব্দীতেও ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজ্য আসামের ১৯ লাখ লোক ‘দেশহীন’ হয়ে পড়ল। আর এটা হয়েছে আসাম ও দিল্লির সরকার মিলে সাম্প্রদায়িক ইস্যু সামনে রেখে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার ফলে। এখন ভারতের নানা প্রান্তে প্রশ্ন উঠেছে—এরপর কি পশ্চিমবঙ্গ? দিল্লি? নাকি তেলেঙ্গানা? বিজেপির দাপুটে নেতারা দেশজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিদেশি নাগরিকদের তাঁরা দেশছাড়া করবেন। কিন্তু কারা বিদেশি? এ প্রশ্নের জবাব তাঁরা দিতে পারেননি। সে যোগ্যতা তাঁদের নেই। বিদেশি নাগরিক, বিদেশি নাগরিক বলে গত শতকের আটের দশক থেকে চিৎকার করে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক বিজেপি সভাপতি এবং বর্তমানে মেঘালয়ের রাজ্যপাল তথাগত রায়। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আসাম থেকে বিদেশি নাগরিক চিহ্নিত করে তাদের ভারতের বাইরে পাঠানোর পরিকল্পনা শুরু হয়। বিজেপি এবং আসামের একটি রাজনৈতিক দল অগপ ছাড়া তাদের এই হঠকারী সিদ্ধান্তকে কেউ সমর্থন করেনি। দেশহীন হয়ে পড়া ভারতের আসাম রাজ্যের ১৯ লাখ লোকের ব্যাপারে জাতিপুঞ্জে মানবাধিকার কমিশনে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনার  ফলাফল কী দাঁড়াবে তা এই মুহূর্তে বলা খুব মুশকিল, তবে সব রাজনৈতিক দল যে খুশি নয়, তা তাদের বিবৃতিগুলো পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়।

ভারতের গোয়েন্দা সূত্রের খবর, পাকিস্তানি গোয়েন্দাচক্র আইএসআই ‘দেশহীন’ ১৯ লাখ লোককে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে ঠেলে দিয়ে একটি গোলমাল বাধানোর চক্রান্ত করছে। আর তারা সেই পথেই এগোচ্ছে। এনআরসি কি—তা নিয়ে এর আগে বহু আলোচনা হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট গুয়াহাটি থেকে এনআরসির যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেই তালিকাকে ভুয়া তালিকা বলা যায়। নাগরিকপঞ্জির ব্যাপারে যিনি হিরো, তিনি অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আগামী সপ্তাহে গুয়াহাটি যাচ্ছেন। তিনি দিল্লিতে বলেছেন যে তিনি সরেজমিনে  ব্যাপারটি তদন্ত করে দেখতে চান। মোদি সরকার দেরিতে হলেও কিছুটা উপলব্ধি করতে পারছে, বিশ্ববাসী একবিংশ শতাব্দীতে ১৯ লাখ লোককে দেশহীন করলে বিশ্বের দরবারে ভারতের মুখ দেখানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। বিদেশনীতি চরম ব্যর্থতার মুখে পড়বে।

৩১ আগস্ট আসামের চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়ল ১৯ লাখ তিন হাজার ৬৫৭ জনের নাম। এর বিরুদ্ধে প্রথমে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে, তারপর হাইকোর্টে ও সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানো যাবে। কিন্তু এ সবই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। আজ, এই মুহূর্তে এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের কার্যত কোনো ‘দেশ’ নেই। এনআরসি কর্তৃপক্ষ জানায়, তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদন করেছিলেন তিন কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৬৬১ জন; ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম খসড়া এবং গত বছর ৩০ জুলাই চূড়ান্ত খসড়া মিলিয়ে মোট দুই কোটি ৮৯ লাখ ৮৩ হাজার ৬৭৭ জনের নাম ওঠে। সর্বশেষ চূড়ান্ত তালিকায় আরো ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৩২৭ জনের নাম যুক্ত হয়েছে। ফলে আসামে এখন ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা তিন কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার চার। এনআরসি থেকে বাদ পড়ারা ১২০ দিনের মধ্যে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু পুরো ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পক্ষপাতদুষ্টতার বহু উদাহরণ আছে। এনআরসি প্রকাশ উপলক্ষে আসামজুড়ে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গুয়াহাটিসহ স্পর্শকাতর এলাকায় আধা সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। জারি হয়েছে ১৪৪ ধারা, নজরদারি চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, যদিও রাত পর্যন্ত কোনো অশান্তির খবর মেলেনি। শুধু শোনিতপুরের দোলাবাড়ি গ্রামের শায়রা বেগম নামে এক মহিলা তালিকা প্রকাশের আগেই আত্মঘাতী হন বলে খবর পাওয়া যায়। স্বামী ও সন্তানের নাম খসড়ায় না থাকায় তিনি চিন্তিত ছিলেন। পরিবারের দাবি, গ্রামের কেউ তাঁকে বলেন, তালিকায় নাম না থাকলেই পুলিশ ধরবে। এরপরই তিনি কুয়ায় ঝাঁঁপ দেন। তবে জেলার পুলিশ সুপারের দাবি মহিলা বহুদিন ধরেই মানসিক ভারসাম্যহীন। এর সঙ্গে এনআরসির কোনো যোগ নেই।

কলকাতার সারদাকাণ্ডের অন্যতম নায়ক আসামের বিজেপির ডেপুটি চিফ মিনিস্টার বসন্ত বিশ্বশর্মা। তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিজেপি যখন দিল্লিতে ক্ষমতায় আসে তখন তদন্ত শুরু হয়। তিনি রাতারাতি ৩০ বছরের কংগ্রেসের সদস্যপদ ছেড়ে নিজেকে বাঁচানোর জন্য বিজেপিতে যোগদান করেন। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেতা মুকুল রায় যেমন নিজেকে বাঁচানোর জন্য বিজেপিতে যোগদান করেন, ঠিক সে রকমটাই তিনি করেন। সেই আসামের চিফ মিনিস্টার এখন বিদেশি নাগরিকের অজুহাত দেখিয়ে আসাম থেকে বিদেশি তকমা দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে দেশছাড়া করতে মরিয়া। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং ১৯ লাখ লোকের কী হয়—সেদিকেই সবার নজর। তার ওপর আবার গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো আরএসএসের লোকরা পশ্চিমবঙ্গে হুমকি দিচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি করা হবে।

উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রচারে গিয়ে বিজেপি নেতা বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুমকি দিয়েছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গেও নাগরিকপঞ্জি করা হবে। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগেই তাঁরা এই কাজে হাত দেবেন। আসামে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের পরই পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি ও তেলেঙ্গানায় বিজেপির সব নেতা এনআরসি চালুর দাবি তুলে দিলেন। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলের নেতারা মনে করছেন বিজেপি নেতারা এনআরসিকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করছেন, তাঁরা মেরুকরণের রাজনীতি করবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্র বলছে, ২০২০ সালে এনআরসি বা ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার চূড়ান্ত হবে। তা আগামী দিনে গোটা দেশে এনআরসির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, তাঁরা রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাবেন। তবে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন করে নিয়ে হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেবেন।

আগামী বছর দিল্লির বিধানসভা ভোট। তার আগে এনআরসির দাবি তুলে রাজ্য বিজেপি সভাপতি মনোজ তিওয়ারির দাবি—দিল্লিতে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তাই এখানে এনআরসি দরকার। একই সুরে তেলেঙ্গানার বিজেপি পরিষদীয় দলনেতা রাজা সিংহের দাবি তেলেঙ্গানায় এনআরসি হোক। এমআইএম নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসির দিকে আঙুল তুলে তাঁর অভিযোগ, হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য নিজের ভোটব্যাংক বাড়াতে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিচ্ছেন। ওয়াইসির পাল্টা যুক্তি—বেআইনি অনুপ্রবেশকারীর জিকির তোলা হচ্ছে। আসামের চূড়ান্ত তালিকা থেকে ১৯ লাখের মতো মানুষ বাদ পড়েছেন। এবার অমিত শাহ ব্যাখ্যা দিন, তিনি কোথা থেকে ৪০ লাখ অনুপ্রবেশকারী পেয়েছিলেন? তাঁর অভিযোগ, বিজেপি যদি শুধু হিন্দুদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয় তা সমানাধিকার নীতি বিরোধী হবে।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা