kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আফগানদের বিপক্ষে খেলা চ্যালেঞ্জ

ইকরামউজ্জমান

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আফগানদের বিপক্ষে খেলা চ্যালেঞ্জ

বিগত ১৯ বছরে দেশের মাটিতে লাল বলের টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার আগে সম্ভবত প্রতিপক্ষের  বোলিং আক্রমণকে ঘিরে এত মানসিক চাপ, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, চিন্তাগ্রস্ত, আশঙ্কা আর এক ধরনের আতঙ্কে ভোগেননি—যেটা আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাঁদের স্পিন আক্রমণ নিয়ে ভুগেছেন আজ থেকে চট্টগ্রামে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে একমাত্র টেস্ট ম্যাচ খেলার আগে! ক্রিকেটারদের মানসিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ শুধু প্রকটভাবে লক্ষণীয় হয়নি, আফগান স্পিনারদের সামর্থ্য লক্ষ করে খোদ চিন্তিত প্রধান নির্বাচকও! এটা প্রিন্ট মিডিয়ায় এসেছে।

ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করছেন বেশ কিছুদিন ধরে। খেলার আগেই প্রতিপক্ষের স্পিন আক্রমণ নিয়ে এত বেশি মাথা ঘামানো মানেই মানসিক শক্তিকে খাটো করে মাঠে  নামা। মানসিক অস্থিরতা আর আতঙ্ক তো নির্ভার সাহসী ক্রিকেট এবং উপভোগের অন্তরায়। মিডিয়ায় চার সপ্তাহ ধরে আফগান স্পিন আক্রমণ নিয়ে প্রচারণার গান বেজেছে, যে গান স্বয়ং ক্রিকেটাররাই শুনিয়েছেন। বিষয়টি বড় বেশি হয়ে গেছে। মিডিয়া তার কাজ করবে। অবশ্যই দায়দায়িত্ব ও জবাবদিহি আছে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে।

বাংলাদেশ দল আফগানিস্তান দলকে গত বিশ্বকাপে  বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে ওয়ানডে ক্রিকেটে। এখন অবশ্য টেস্ট ক্রিকেট। ছোট সংস্করণের ক্রিকেটে (ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি) আফগানরা অল্প সময়ের মধ্যে খুব ভালো উন্নতি করেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ড প্রতিটি টেস্ট খেলুড়ে দেশকে ছোট সংস্করণের ক্রিকেটে পরাজয়ের স্বাদ উপহার দিয়েছে। আয়ারল্যান্ডকে তো তাদের দ্বিতীয় টেস্টে সাত উইকেটে পরাজিত করেছে।

বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ। ভিন্নধর্মী, দীর্ঘ সংস্করণের খেলা। খেলার ‘অ্যাপ্রোচ’ ক্রিকেটারদের মেজাজ, মানসিকতাও একেবারে অন্য ধরনের। টেস্ট ক্রিকেটকে বলা হয় আসল ক্রিকেট। এখানে ক্রিকেটারদের সামর্থ্য, আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য এবং স্কিলের পরীক্ষা হয়! এই ক্রিকেটে ফাঁকিঝুঁকির সুযোগ নেই। অভ্যস্ত হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে ব্যাট বা বল করতে হয় সেশন টু সেশন, উইকেট বুঝে, দলের প্রয়োজন অনুযায়ী। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বড় বেশি সহায়ক। অভিজ্ঞতা আর জয়ের জন্য ক্ষুধা টেস্ট ক্রিকেটের পুরনো রূপ ক্রমেই পাল্টে ফেলছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কখনো চাপহীন নয়। খেলায় চাপ থাকবেই। চাপকে যত দূর সম্ভব সামাল দিয়ে খেলতে হবে নিজের সেরা খেলা, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। সামর্থ্যের  প্রয়োগ যথাসময়ে সবচেয়ে জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আফগান স্পিনারদের সামর্থ্য এবং কার্যকারিতা নিয়ে বড় বেশি গবেষণা ও চিন্তাভাবনা করার পরিপ্রেক্ষিতে এর প্রভাব খেলায় ভর করাটা অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশ দলের দলগত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও ভালো হয়নি। প্রস্তুতি ভালো হলেও মাঠে কাজ সহজ হয়, নির্ভার ক্রিকেট খেলা সম্ভব হয়। বাস্তবতায় জাতীয় দলের খুব কম ক্রিকেটার আছেন, যাঁরা খেলার মধ্যে ঢুকে থাকেন, অন্য কিছুতে মনঃসংযোগ দেন না।

বিশ্বকাপের আগে টি-টোয়েন্টি সিরিজে (৩-০) আফগানরা বাংলাদেশ দলকে ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করেছে। আর তাই আফগান স্পিনারদের (রশিদ খান, মোহাম্মদ নবী, মুজিবুর রহমান, জাহির এবং কায়েস) বল দেশের উইকেটেও খেলা ভীষণ কষ্টকর হবে, এই চিন্তা মাথা থেকে সরাতে হবে। আফগানদের স্পিন আক্রমণে পেস স্পিন, অফ স্পিন, চায়নাম্যান ছাড়াও বাড়তি কিছু আছে। স্পিন আক্রমণই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। অতীতে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা তো অন্য প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বিশ্বমানের লেগ স্পিনার অফ স্পিনার, গুগলি ও চায়নাম্যানের বিপক্ষে খেলেছেন। সব কিছুই নির্ভর করছে মানসিক শক্তি ও দৃঢ় প্রত্যয়ের ওপর। খেলা তো দেশের জন্য, দেশের গৌরবের জন্য। মানসিক দুর্বলতা সব ক্ষেত্রে বড় বেশি ক্ষতিকর। বনের বাঘে কামড় দেওয়ার আগে মনের বাঘে কামড় দিয়ে দেয়।

আফগান স্পিনাররা ভালো। অধিনায়ক রশিদ খান তো বিশ্বমানের লেগ স্পিনার। তাঁর সঙ্গে নবী, মুজিব, জাহির ও কায়েস—এঁরা সবাই পরীক্ষিত। ছোট সংস্করণের ক্রিকেটে এঁরা ভালো করেছেন। যেহেতু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে ভালো করেছেন, দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেট টেস্টেও ভালো না করার তো কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ দল আফগান আক্রমণকে সমীহ করেই খেলবে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে চট্টগ্রামের একমাত্র টেস্ট ম্যাচটি সত্যি কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর এটাও ঠিক, এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা সম্ভব। সবাই মিলে মনঃসংযোগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের চেয়ে শুধু ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। আত্মনিবেদন করতে হবে দলের জন্য। ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাস—এর তো কোনো বিকল্প নেই।

সমস্যা হলো বোর্ডের হয়ে সব কিছু দেখভাল করার দায়িত্ব হলো ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির। এই কমিটির কর্মকর্তারা তো বিভিন্ন বিষয়ে ‘কনফিউজ’। উইকেট তৈরি, ১৫ সদস্যের স্কোয়াড গঠন এবং লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে। অনেক কথাই বলা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত যাহা বায়ান্ন তাহাই তিপান্ন। উইকেটের ব্যাপারে তো বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না। দেশে বিগত ১০টি টেস্টে স্পিনাররা নিয়েছেন ১৬১টি উইকেট, আর সিমাররা ১৫টি। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সব দলের বিপক্ষে তো জয়ে স্পিনাররাই বড় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরাই বলতে গেলে দলকে জিতিয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট খেলেছে ২০০০ সালের নভেম্বরে। আর আফগানরা ২০১৭ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর প্রথম টেস্ট খেলেছে গত বছর ভারতের বিপক্ষে। অভিষেক টেস্টে পরাজিত হয়েছে ২২৬ রানের ব্যবধানে। দ্বিতীয় টেস্টে অবশ্য আফগানরা আয়ারল্যান্ডকে পরাজিত করেছে ৭ উইকেটে। তৃতীয় টেস্ট তারা খেলতে নামবে বাংলাদেশ দলের বিপক্ষে। আফগানরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভালোভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। তাদের লক্ষ্য টেস্ট ক্রিকেটেও উন্নতির রাস্তা ধরে হাঁটা। রশিদ খানের নেতৃত্বে টেস্ট  স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে অভিজ্ঞ এবং তরুণ সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের নিয়ে। আফগানিস্তানের দুই সাবেক অধিনায়ক নবী ও আসগরও টেস্ট দলে আছেন। তাঁরা দুইজন তরুণ অধিনায়ক রশিদ খানকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতে পারবেন। আফগানিস্তানের স্পিন আক্রমণ নিয়ে আগেই কথা বলেছি। আফগান স্কোয়াডে আছেন অভিজ্ঞ পেসার শাপুর জাদরান। বলের গতিই শুধু নয়, চমৎকার লাইন-লেন্থ মেনটেইন করে বুদ্ধি খাটিয়ে বল করেন। উইকেট যদি শেষ পর্যন্ত স্লো, লো এবং ট্যানিং হয়, তাহলে উভয় দলে স্পিনারদের বেশি দেখা যাবে। অর্থাৎ চারজন স্পিনার। আফগানদের একটি প্লাস পয়েন্ট আছে, এই দলের চার-পাঁচজন খেলোয়াড় কয়েক বছর ধরে প্রতিবারই বাংলাদেশে এসে খেলেছেন। 

বাংলাদেশ ছয় মাস পর আবার একমাত্র টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামবে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে। অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ দল এগিয়ে আছে। এই ভেন্যুকে বলা হয় ‘লাকি গ্রাউন্ড’। কিন্তু বাংলাদেশ তো এই ভেন্যুতে জিতেছে মাত্র দুইটি টেস্টে। ছয়টি ড্র করেছে। হেরেছে ১০টি টেস্টে। তবে ওয়ানডেতে ২১টি খেলার মধ্যে বাংলাদেশ দল জিতেছে ১২টি খেলায়।

সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে মাঠে নামবে বাংলাদেশ দল। পারফরম্যান্সের বদৌলতে সাকিবের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। সাকিব অবশ্য জানেন জনপ্রিয়তার এই সিংহাসনটি বড় বেশি স্পর্শকাতর। মাশরাফি এই বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। একটু ব্যত্যয় হলে আর উপায় নেই। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আল হাসান একটি দৈনিকে বলেছেন, ‘মানসিকভাবে আমি টেস্ট ও টি-টোয়েন্টির নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত নই। তবে দলটা এখন ভালো অবস্থায় নেই। নিজেও বুঝতে পারছি, দলটিকে মোটামুটি একটা অবস্থায় আনতে হলে আমি অধিনায়ক হলে ভালো। নয়তো কোনো সংস্করণেই অধিনায়কত্ব করার ব্যাপারে আমি নিজে তেমন আগ্রহ পাচ্ছি না।’

প্রাথমিকভাবে ক্যাম্পে ৩৫ ক্রিকেটারকে ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে নতুন মুখও ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৫ জনের স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে পুরনোদের নিয়েই। কোনো রকম ঝুঁকিতে যেতে চাননি নির্বাচকরা। অবশ্য এ ধরনের অবস্থায় ঝুঁকি নেওয়ার কথাও নয়। তামিম ইকবাল আগেই ছুটি নিয়ে বিশ্রামে গিয়েছেন ফর্মে খারাপ সময় থেকে বের হয়ে আসার জন্য। পেসার মুস্তাফিজকে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাঁর বিষয়ে অনেক কথাই শোনা গেছে। তিনি ফিট, আবার ফিট না। বোলিং অ্যাকশন পরিবর্তনে কি তাঁর কোমরে ব্যথা হয়েছে? যা হোক এসব বিতর্ক এখন অর্থহীন, যা আছে সেটা নিয়েই ভাবতে হবে। দলে আছেন পেসার তাসকিন, আবু জায়েদ ও ইবাদত হোসেন। স্পিনে সাকিবের সঙ্গে তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাঈম হাসান। চারজন জেনুইন স্পিনার।

বাংলাদেশ সর্বশেষ টেস্ট জিতেছে এই জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে গত বছর নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬৪ রানে। একই বছর ড্র করেছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। আর ২০১৭ সালে এই মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হেরেছে ৭ উইকেটে।

বাংলাদেশ আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলতে নামবে ১১৫তম টেস্ট। আর আফগানদের এটা হবে তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ। গত তিনটি টেস্টে বাংলাদেশ চট্টগ্রামে একজন পেসার নিয়ে খেলেছে। এবার এর ব্যত্যয় ঘটবে কি না সময় বলে দেবে। মনে হচ্ছে বাংলাদেশ হয়তো চারজন স্পিনার নিয়ে খেলতে পারে। সব কিছুই কিন্তু নির্ভর করছে উইকেটের ওপর। স্কোয়াডে মোসাদ্দেক হোসেনকে রাখা হয়েছে দলে মিডল অর্ডারে শক্তি বাড়ানোর জন্য। তামিমের পরিবর্তে ওপেনিংয়ে কি থাকবেন সাদমান ইসলাম? সাদমান অফ স্ট্যাম্পের বল ছেড়ে খেলেন। বলের লাইনে যান। সাদমান এ পর্যন্ত তিনটি টেস্ট খেলেছেন। সাকিব, মুশফিক, লিটন দাস, মাহমুদ উল্লাহ, মুমিনুল হক, সৌম্য, মিঠুন তাঁদের নিয়ে ব্যাটিং সাইড শক্তিশালী।

আসল কথা হলো—দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলা। এই খেলার অর্জন তো আগামী নভেম্বরে ভারতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে (দুইটি টেস্ট) দলকে অনেক বেশি উজ্জীবিত রাখবে।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা