kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সময়ের প্রতিধ্বনি

চীনের সিল্ক রোড মহাপরিকল্পনা জীবনমান উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখবে

মোস্তফা কামাল

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চীনের সিল্ক রোড মহাপরিকল্পনা জীবনমান উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখবে

মহাচীন হিসেবেই চীনের খ্যাতি। বিশাল আয়তন, জনশক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি, এমনকি সামরিক শক্তিতেও চীন এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। চীনকে বাদ দিয়ে কোনো দেশের পক্ষেই কিছু করা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘বিশ্বমোড়ল ডোনাল্ড ট্রাম্প’ যে বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুধু শুধু ‘মুই কী হনু রে’ বলে তো লাভ নেই! আর পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে টক্কর লাগতে গেলেও বুঝেশুনে যাওয়া উচিত। 

চীন বিশ্ববাজার কিভাবে দখল করে আছে, তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দিতে চাই। এখন থেকে প্রায় দেড় দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভিজিটরস প্রগ্রামে এক মাসের সফরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। সেই সফরের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের বিশালত্ব দেখানোর জন্য আমাদের ৯টি স্টেটে নিয়ে যায়। আমরা ভীষণ খুশি। নিজ খরচে যুক্তরাষ্ট্র দেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যা হোক, শিকাগো বিমানবন্দরে নেমে মনে হলো, ওখানকার স্থানীয় কিছু স্যুভেনির কিনি। দোকানে কিনতে গিয়ে দেখলাম সেগুলো সবই চীনের তৈরি। শুধু তা-ই নয়, যতটা স্টেটে গিয়েছি, সেখানেই দেখেছি চায়না মার্কেট এবং সেটি আমেরিকান ক্রেতাদের খুব প্রিয় জায়গা।

আসলে চীনের পণ্য কোথায় নেই? বিশ্বের সর্বত্রই চীন দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে তার বাজার তৈরি করেছে। দিনে দিনে সেই অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হয়েছে। ইচ্ছা করলেই এ অবস্থান থেকে তাকে সরানো যাবে না। চীন প্রায় এক দশক আগে থেকেই চিন্তা করেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের স্বার্থে এশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে। এই সংযোগের নাম দেওয়া হয়েছে সিল্ক রোড।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘ব্রেন চাইল্ড’ হচ্ছে—সিল্ক রোড অর্থনৈতিক বেল্ট। একে বলা হয় ‘ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট’। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট কাজাখস্তান ও ইন্দোনেশিয়া সফর করেন। তখন তিনি প্রথমবারের মতো সিল্ক রোডের মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। সিল্ক রোডই হবে একুশ শতকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের প্রধান সোপান। তবে চীনের প্রেসিডেন্টের স্বপ্ন আরো বড়। তিনি এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকাকে এক সুতায় গাঁথতে চান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে সিল্ক রোড বিশাল ভূমিকা রাখবে। 

প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের প্রস্তাব উপস্থাপনের পরপরই চীনের উদ্যোগে কর্মকর্তা পর্যায়ে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি পাঠালেও ভারত পাঠায়নি। সিল্ক রোড ইস্যুতে ভারত খুব সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে। তারা এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে চীন তার উদ্যোগ থেকে একচুলও পিছু হটেনি, বরং পূর্ণোদ্যমে এগিয়ে চলছে। চীন বলছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ এবং সমমর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। সংলাপের মধ্য দিয়ে যৌথ উন্নয়নের একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে। এতে কোনো বিজয়ী বা পরাজিত পক্ষ থাকবে না। এই মহাপ্রকল্প সবার জন্য লাভজনক হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে যে ধরনের উদ্যোগ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে চীন, তা এ রকম—সিল্ক রোড নির্মাণের কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে ব্যাপক তদারকির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রপ্তানিজাত পণ্যের বাজার সৃষ্টি এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্যের ওপর গুরুত্বারোপ এবং নতুন নতুন বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সমতা আনা হবে। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পর্যটন, স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

সিল্ক রোডের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্য পরিবহন ত্বরান্বিত করতে চীন ইতিমধ্যেই উরুমচি আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর নির্মাণে হাত দিয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে সিল্ক রোডের সঙ্গে চীনের এক্সপ্রেস রেলওয়ে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি এর মানোন্নয়নের কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া চীনে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে হরগোস ও কাশগর অর্থনৈতিক উন্নয়ন অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক সীমান্ত সহযোগিতা কেন্দ্র এবং চীন-কাজাখস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্ত সহযোগিতা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সহযোগিতা কেন্দ্রগুলো ৩৫টি প্রকল্প নিয়ে কাজ করবে। এ জন্য ৩০ বিলিয়ন ইয়েন বাজেট ধরা হয়েছে।

চীনের প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়, সিল্ক রোডের নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করতে এবং কাস্টমস ব্যবস্থা উন্নত করতে করণীয় নির্ধারণের কাজ চলছে। এরই মধ্যে শিনচিয়ান রাজ্য সরকার বিদেশি বিনিয়োগে ৬৫টি দেশের ১৪৭৮টি এন্টারপ্রাইজের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার।

উরুমচিতে অনুষ্ঠিত ১৬টি দেশের ২০ সম্পাদক-নির্বাহী সম্পাদকদের আন্তর্জাতিক সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্যই ছিল সিল্ক রোড। একাধিক সেশনে সিল্ক রোডের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং সিনিয়র সাংবাদিকদের মতামত ও পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের বিদ্যমান বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে আসে। সেমিনারে বলা হয়, কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। এই দুই দেশ সব সময়ই পরস্পরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। ফলে ভারত ও পাকিস্তানের কারণে সিল্ক রোডের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হতে পারে।

চীন সরকার এই ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং পাঁচ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সিল্ক রোডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করে চীন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং নিজেই যেহেতু এই মহাপ্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা, সেহেতু তিনি নিজেই বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের কাছে উপস্থাপন করছেন।

সংশ্লিষ্ট এক প্রশ্নের জবাবে চীনের বিশেষজ্ঞ উ লেইফেন বলেন, সিল্ক রোড সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে। এই উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; সর্বোপরি এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখবে।

উ লেইফেনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চীনের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ তিয়ান ওয়েন বলেন, সিল্ক রোড এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। সিল্ক রোডের সঙ্গে ভারত-পাকিস্তানও সম্পৃক্ত। ওই দুই দেশ যুক্ত না হলে সিল্ক রোড সফল হবে না। পাকিস্তান সিল্ক রোডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক হলেও ভারত এখনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে চীনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এটা একটা বড় বাধা।

আমরা দেখছি, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ ভারত-পাকিস্তান বিরোধের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বিপুল সম্ভাবনার এই জোট। দুই দেশের বিরোধ না থাকলে সার্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কার্যকর আঞ্চলিক জোট হতে পারত। এত দিনে হয়তো সার্ক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা চালু হয়ে যেত। ভিসাব্যবস্থাও উন্মুক্ত হয়ে যেত। আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থাও সহজতর হতো।

চীনের আগে ইউএন-এসকাপ ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে ও এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে অনেক দূর এগিয়েছিল । অনেক কাজ তারা সম্পন্নও করেছিল। কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের কারণে সেই উদ্যোগ থেমে গেছে। এখন আর কোনো ফোরামেই এ বিষয়ে আলোচনা হয় না।

চীন আশা করছে, ইউএন-এসকাপ ব্যর্থ হলেও তাদের সিল্ক রোডের উদ্যোগ সফল হবে। ভারত এখন রাজি না হলেও শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়ে পারবে না। আমরাও চাই, চীনের উদ্যোগ সফল হোক। আমরাও মনে করি সিল্ক রোড সফল হলে এশিয়া অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। আমরা এখন শেষ দৃশ্য দেখার অপেক্ষায়।

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

 

* আগামীকাল পড়ুন : মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধ, চীনের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা