kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গ্রাম উন্নয়নের রূপ-রূপান্তর

মিল্টন বিশ্বাস

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গ্রাম উন্নয়নের রূপ-রূপান্তর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (২০১৮) ইশতেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রত্যন্ত গ্রামে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে। দেশের যুবগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত, উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তর করার জন্য আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। প্রতিটি গ্রামকে শহরের মতো করে উন্নত করার অঙ্গীকার অর্থাৎ শহরের সমান সুবিধা পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি যা ইশতেহারে এবার ব্যক্ত করা হয়েছে, তা গত ১০ বছরে উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ ‘স্বল্পোন্নত’ দেশ থেকে ‘উন্নয়নশীল’ দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এর আগে দীর্ঘ ৪২ বছর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় ছিল এ দেশ। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, অতীতে এই সরকার গ্রামীণ জনপদে পরিবর্তনের অঙ্গীকারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। তা ছাড়া বর্তমান সরকারের রয়েছে ধারাবাহিকতা। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো গতি পেয়েছে। গ্রামের অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই আছে কৃষি আর গ্রামীণ উৎপাদন কাঠামো। গত ১০ বছরে সেই গ্রামের উন্নয়নের ইতিহাস অনুসন্ধানের প্রয়াস নিলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের ধারায় বর্তমান সময়ে ভিন্নতর এক মাত্রা সংযুক্ত হয়েছে। এ সময় (২০০৯-২০১৮) সরকারি বাজেটে গ্রামাঞ্চলের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গ্রামের অতীত ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিককালের কৃষি রূপান্তরের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে উন্নয়ন ভাবনায়ও এসেছে নতুন অভিব্যক্তি।

বাংলাদেশে মোট গ্রাম আছে ৮৭ হাজার ৩১৬টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৮ হাজার ১৩৮টি। সবচেয়ে কম গ্রাম বরিশাল বিভাগে, মাত্র চার হাজার ৯৭টি। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ১১ কোটির বেশি লোকের বাস রয়েছে এসব গ্রামে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে। সমতল এলাকা ছাড়াও গ্রামীণ জনপদে রয়েছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য—কোথাও রয়েছে হাওর ও জলাভূমি, আবার কোথাও পার্বত্যভূমি। আছে এদেশে অন্তর্ভুক্ত ছিটমহলের নতুন বাসিন্দারা। কোথাও বা সাগরের তটরেখা বিদীর্ণ করে চলে গেছে জনবসতি। কোথাও অরণ্যের বৃক্ষচ্ছায়ায় বসতি গড়েছে এ দেশের মৃত্তিকার সন্তান। রয়েছে নদীর বুকে ভাসমান জীবনও।

স্বাধীনতার পর ব্যাপক নগরায়ণ ও আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার প্রভাবে গ্রামের মানুষ শহরমুখী হতে শুরু করে। পোশাকশিল্পের ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে গ্রামের বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ চাষাবাদ ও খেত-খামার ফেলে তুলনামূলক সস্তা দামে নিজেদের শ্রমিক হিসেবে নাম লেখায়। অবশ্য পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান এখন দ্বিতীয়। তবে বড় বড় শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে কুটির শিল্পের সমাদর কমেছে। ফলে কর্মসংস্থানের খোঁজে, নিজেদের নিত্যনৈমিত্তিক অভাব পূরণে ও উচ্চাশার কারণে মানুষ গ্রামীণ জীবন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া রয়েছে নদীভাঙন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহারা মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার বাস্তবতা থেকে শহরমুখী হওয়ার করুণ ইতিহাস।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার ছিল—একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ, গৃহায়ণ, আদর্শ গ্রাম, ঘরে ফেরা ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। বর্গাচাষিদের জন্য ঋণ, ক্ষেতমজুরদের কর্মসংস্থান ও তাদের পল্লী বেতনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি—সড়ক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা সদরকে সংযুক্ত করা। এসব ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত রয়েছে। একইভাবে অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং সামাজিক উন্নয়নে ২০১৪ সালে যেসব নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল তা পূরণ হয়েছে। যেমন মাথাপিছু আয়, প্রবৃদ্ধির হার, দারিদ্র্য দূরীকরণ—এসব ক্ষেত্রে আমরা সাফল্য দেখেছি। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট ভালো। দারিদ্র্য দূরীকরণের দিকেও যদি দেখা যায়, যা লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সরকারের অর্জন তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। যে হারে দারিদ্র্য দূরীকরণ হয়েছে, সেই হারটা অবশ্যই ইতিবাচক। এর মধ্যে মাথাপিছু আয় হয়েছে এক হাজার ৮০০ ডলার। যা ২০০৬ সালে ছিল ৫৪৩ ডলার। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৮ শতাংশ। একজন রিকশাচালকের দৈনিক আয় ২০০৬ সালে ছিল ২০০ টাকা, ২০১৮ সালে হয়েছে ৫০০-৭০০ টাকা। পোশাকশ্রমিকের মাসিক বেতন ২০০৬ সালে ছিল এক হাজার ৬০০ টাকা, বর্তমানে তা হয়েছে আট হাজার। অতীতে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হতো না। এখন বছরে ৩৭ কোটি বই বিতরণ করা হয়। মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে ১৪৫টি প্রকল্প। সব জেলায় রেল যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৩০টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। জানা গেছে, ২০১৯ সালের মধ্যেই দেশের সব ইউনিয়ন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আসবে। শুধু তা-ই নয়, তিন মাসের মধ্যে দেশের ৫৪৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হবে। গ্রামপর্যায়ে শহরের নাগরিক সেবা ও সুবিধা পৌঁছে দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ১০ বছরে গ্রামের বেশির ভাগ ছনের ঘর পরিবর্তনের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে। হারিকেনের আলোর বদলে বিজলি বাতি বা এনার্জি বাল্বের সরবরাহ বেড়েছে। তবে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি কিছু পার্বত্য ও হাওরাঞ্চলে। অবশ্য দেশের ৯০ শতাংশ লোক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। বাকি ১০ শতাংশ গ্রামে বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম এই বছরের মধ্যে শতভাগ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে ১৪ শতাংশ মানুষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। এখন গ্রামের ৫০-৬০ শতাংশের ঘরে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা এবং প্রায় প্রতিটি ঘরের জন্য সুপেয় পানির বন্দোবস্ত রয়েছে। তবে কিছু জেলায় পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা এখনো জীবনযাত্রায় সমস্যার সৃষ্টি করছে। গ্রামের মানুষ এখন সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত হয় না। তারা টেলিভিশন ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিনোদনের জগতে বিচরণ করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবর নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পায়।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণে গ্রামীণ বাংলাদেশের উন্নয়নের পেছনে প্রধানতম কৃতিত্ব হচ্ছে কৃষির সাফল্য। যেমন—ভালো ফসল, দামের ওঠা-নামা কম, বাজারজাতকরণে সুবিধা। এরপর হলো ক্রমবর্ধিষ্ণু কর্মসংস্থান বা মজুরিপ্রাপ্তি। তৃতীয়ত, রেমিট্যান্সের প্রবাহ। চতুর্থত, ছোট পরিবার তথা প্রজননহার হ্রাস পাওয়া। সর্বশেষ, সাক্ষরতা তথা শিক্ষার হার বৃদ্ধি। অবশ্য আমরা প্রথমেই বলতে চাই, গ্রামীণ জনপদের পরিবর্তনের অন্যতম অনুঘটক ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’। গত এক দশকে পাকা রাস্তা, সেতু, স্কুল নির্মিত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও সেচ সুবিধার ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ফলে গ্রাম ও শহরের দূরত্ব হ্রাস পেয়েছে এবং বৃদ্ধি পেয়েছে অভিবাসন। এর ফলে উৎপাদন ও উপকরণ বিনিময় সহজ ও ব্যবসাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। ২০০৯ সালে গ্রামীণ জনপদে পাকা সড়ক ও গ্রামীণ রাস্তা ছিল যথাক্রমে ৬০ হাজার ৫০০ কিমি এবং এক হাজার ১৫০ কিমি। তা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৭৭ হাজার কিমি এবং তিন হাজার ৫০০ কিমি।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজির (২০১৫) যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানে কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে নিয়ে উন্নয়নের চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে। তাও আবার গৃহীত হয়েছে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন ধারণায়। ওই লক্ষ্যমাত্রার কয়েকটি যেমন—দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত কাজের সুবিধা নিশ্চিত করা, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয় রোধ ও বন্ধ করা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করা প্রভৃতি বিষয়ে সরাসরি গ্রামীণ জনপদের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আসলে গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য দরকার সেখানে যে প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐশ্বর্য রয়েছে সেগুলোকে সঠিকভাব কাজে লাগানো। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষাবাদ, উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ, গ্রাম্য জনগণের ঐক্য ও সরকারের সহযোগিতামূলক মনোভাবই পারে গ্রামীণ জীবনের হারানো আনন্দ ও লুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে দিতে। গত ১০ বছরে জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষিত হওয়ায় গ্রামীণ জনপদে এখন সুশাসনের সুবাতাস বইছে। আশা করা যায়, আগামী পাঁচ বছরে ৮৭ হাজার ৩১৬টি গ্রামের জনজীবন ও সমাজে শহরের সব সুবিধা বিকশিত হবে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা