kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আমরা স্বার্থপর মানুষ চাই না

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমরা স্বার্থপর মানুষ চাই না

এখন মানুষকে নিয়ে আমাদের বেশি করে ভাবতে হচ্ছে। ক্রমাগত মানুষের যে পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে আমাদের গবেষণা করারও সময় এখন এসেছে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ নিজের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। কিন্তু মানুষ বুঝতে পারছে না একাই ভালো থাকা যায় না, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে হয়। মানুষ নিজে জানতে ও বুঝতে পারছে, সে যে কাজটি করছে তা অনৈতিক ও অবৈধ। কিন্তু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সেটিকে সে বিভিন্ন খোঁড়া যুক্তি দিয়ে সত্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের সুবিধাবাদী মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা আছে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এর ফলে যারা নৈতিকতা চর্চা করছে কিংবা যারা নিজেদের নৈতিক বলে মনে করছে তারাও একসময় ক্ষমতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অসত্যকে সত্য বলে মেনে নিচ্ছে। অনৈতিক বিষয়গুলোকে ভেতর থেকে ঘৃণা করলেও তা যে মন্দ কাজ সেটি বলার ও প্রতিবাদ করার মতো অবস্থান থেকে নিজেকে বিরত রাখছে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, মানবজাতির স্বভাব হচ্ছে সত্যের চেয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিরাপদ মনে করা। তাঁর এই দার্শনিক চিন্তাটি বিভিন্নভাবে মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হতে দেখা যাচ্ছে। এতে করে মানুষ ক্রমাগতভাবে মনুষত্বহীন জড় পদার্থে পরিণত হচ্ছে। ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ, সাদাকে সাদা কিংবা কালোকে কালো বলার মানবিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে। মানুষের নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটছে না বরং অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে মানুষের নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। এতে করে দিন দিন পরশ্রীকাতরতা বাড়ছে ও ভঙ্গুর মানসিকতার মানুষ তৈরি হচ্ছে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা নিখাদ সত্য কথা বলেছেন, ‘আজকাল আমাদের দেশে দেখবেন, ভালো মানুষেরা বিচ্ছিন্ন। ভালো মানুষদের মধ্যে যোগাযোগ নেই। তাঁরা একা, পরস্পরকে খুঁজে পান না। কিন্তু যারা খারাপ, তারা খুবই সংঘবদ্ধ।’

ইদানীং আমরা লক্ষ করছি ভালো ও মহৎ মানুষেরা একা হয়ে পড়ছেন। এর কারণ হচ্ছে তাঁরা অনৈতিকতা ও অসততার সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা করতে পারেন না। অন্যদিকে অসৎ লোকেরা সংগঠিত ও একটি সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ করছে। কোনো ব্যক্তি সততার সঙ্গে কাজ করতে চায়, কিন্তু সেভাবে কাজ করতে পারছে না। ব্যক্তিটি সার্কেলের বিন্দুতে অবস্থান করছে। কিন্তু যে সার্কেল বা বৃত্তটি রয়েছে তার চারপাশের সব ব্যক্তিই অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ। লোকটি একা হওয়ায় বৃত্তের বাইরে বের হতে পারছে না। বৃত্তের বাইরে আরেকটি যে বিন্দু রয়েছে সেখানে বৃত্তের চারপাশের মানুষেরা তাকে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। এর ফলে কয়েকটি অবস্থা তৈরি হতে পারে। যেমন—লোকটি অসততার প্রতিবাদ করলেও সেটি কাউকে প্রভাবান্বিত করছে না কিংবা প্রতিবাদটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অসৎ লোকদের সার্কেল তাদের পরস্পরের অবৈধ ঐক্যে ও সম্পর্কের কারণে সৎ ব্যক্তিটিকে অসৎ ব্যক্তি হিসেবে প্রমাণ করছে। কারণ এ ক্ষেত্রে সৎ লোকটির পক্ষে কথা বলার মতো কেউ থাকছে না। কিন্তু দুর্নীতিবাজ লোকেরা একে অন্যের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে নিজেরা সেফ জোনে থাকছে। আবার অনেক সময় সৎ ব্যক্তিটি অন্যদের সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে নিজেও অসততার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কিংবা নিষ্ক্রিয় হতে বাধ্য হচ্ছে। এতে করে সৎ, ত্যাগী ও মহৎ মানুষদের মধ্যে একধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। যার প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিরূপভাবে প্রভাবিত করছে। নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, সহযোগিতামূলক একটি পরিবেশে স্বার্থপর প্রাণীদের সুষ্ঠু বিকাশ সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বার্থপরতা মানুষকে পিছিয়ে দেয়। কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের গবেষক রবার্ট লিভিংস্টোন বলেন, স্বার্থপরতা মানুষের মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব জাগিয়ে দেয়। এত কিছু নেতিবাচক বিষয় স্বার্থপরতার মধ্যে থাকলেও এটি এখন শক্ত শিকড় গেড়ে বসেছে। আজকের বাস্তবতায় স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও ব্যক্তিস্বার্থকে একে অন্যের সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। স্বার্থপরতা আর অধিকার যে এক কথা নয়, এ বিষয়টি মানুষকে বুঝতে হবে। স্বার্থপরতায় থাকে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চাতুর্য ও অপকৌশল। সেটাকে নিজের অধিকার বলে অনেকেই প্রমাণ করার চেষ্টা করে। এটিও আরেকটি অপরাধ। এটিকে যারা উৎসাহী করছে তারাও সমভাবে অপরাধী। অন্যদিকে অধিকার হচ্ছে নৈতিকভাবে মানুষের যেটি প্রাপ্য তা থেকে তাকে বঞ্চিত না করে তার সুরক্ষা প্রদান করা। কিন্তু স্বার্থপরতার অশুভশক্তির ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এ ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আপাতদৃষ্টিতে একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা প্রদান করলেও এর ফলাফল সামষ্টিক সমাজকে কলুষিত করছে। এখান থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের চেয়ে সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। তা না হলে এর ফলাফল কারো জন্যই শুভকর হবে না।

সবাই পৃথিবীতে মানুষ হতে পারে না। কেউ কেউ মানুষ—এই মহামূল্যবান অভিজ্ঞতাটি সবার থাকা দরকার। যারা প্রকৃতই মানুষ তাদের হয়তো মনে হতে পারে হেরে যাচ্ছে। কিন্তু এ পরাজয় জয়ের থেকেও অনেক বেশি মর্যাদার। সাময়িক পরাজয় একদিন জয়কে অতিক্রম করবে—এই বিশ্বাস সবার মধ্যে থাকতে হবে। মানুষের অন্ধ চোখ খুলুক, অবরুদ্ধ মন খুলুক। জয় হোক বিশুদ্ধ জীবনের। যে মর্যাদায় নৈতিকতা নেই, সে মর্যাদার কোনো দাম নেই। মানুষ চাইলেই সম্মানিত হতে পারে না, সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করতে হয়। যারা লুকিয়ে অযাচিতভাবে অন্যের সমালোচনা করে, তারা কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কারণ তারা কাপুরুষ হয়, বিশ্বাসঘাতক হয়। তারা ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলতে পারে না। তারা সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পারে না। তাদের জন্য সমবেদনা। অনেক সময় মানুষ দল ভারী করার জন্য অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। একসময় সেই অন্যায়ের ফলাফল মানুষকে নিঃসঙ্গ করে ফেলে। আমরা চাই উদার পৃথিবীর উদার মানুষ, যারা বিবেক ও নিজের আত্মা দ্বারা তাড়িত হবে। তবেই না আমরা মানুষ।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা