kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শিক্ষায় উদ্ভাবন : শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে

ড. ছিদ্দিকুর রহমান

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



শিক্ষায় উদ্ভাবন : শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে

সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা সর্বাধিক। এ ক্ষমতার সুষ্ঠু প্রয়োগের ফলেই এককালে গুহাবাসী মানুষ আজ মহকাশে বিচরণ করছে, আর গুহার শিয়াল গুহায়ই আছে। আরাম-আয়েশে থাকার জন্য পাতা দিয়ে বাতাস করা থেকে হাতপাখা, এ থেকে বৈদ্যুতিক পাখা, এরপর এসি, তারপর আর কত কী আসবে! এ সবই ক্রমাগত উদ্ভাবনের ফসল। আসল কথা হলো, আমরা যে কাজ যেভাবে করে আসছি, ওই কাজ ওইভাবে করতে থাকলে একই ফল পাব। উন্নততর ফল পেতে হলে উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রয়োগ করে উন্নততর পদ্ধতিতে ভিন্নভাবে তা করতে হবে। বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে পরিমাণগত দিকের প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে জনগণকে মানবসম্পদে রূপান্তর করার বিষয়ে অনেক কিছু করার আছে। টেকসই জাতীয় উন্নয়নের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। খরচ না বাড়িয়ে বা অল্প খরচে শিক্ষায় এমন কিছু কার্যক্রম চালু করা যায়, যার ফলে একদিকে শিক্ষার মানোন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন করা সম্ভব, অন্যদিকে শিক্ষার ইতিহাসে নতুন নতুন মাইলফলক স্থাপন করে স্বর্ণযুগের সূচনা করাও সম্ভব। এ ধরনের কয়েকটি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলো—

সাধারণ, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় ভারসাম্য রক্ষা

এটা সত্যি যে বাংলাদেশ ঘাটতি-উদ্বৃত্ত সমস্যায় ভুগছে। একদিকে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদের অভাব, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত বেকারের আধিক্য। আমাদের দেশে পোশাকশিল্পসহ বহু শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রে উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন লোকবলের অভাব। ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বহু দেশের অনেকে আমাদের কলকারখানায় কাজ করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত দক্ষতাহীন লাখ লাখ সাধারণ ডিগ্রিধারী বেরোচ্ছে, কোনো অবস্থায়ই এতসংখ্যককে সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাকরি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে দিনে দিনে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সমাজে বিক্ষুব্ধতা বাড়ছে। এ সমস্যা সমাধানকল্পে আমাদের জাতীয় নীতি হওয়া দরকার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য বাধ্যতামূলক একমুখী মানসম্মত মৌলিক শিক্ষা। একমুখী মানসম্মত মৌলিক শিক্ষার মাধ্যামে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, জীবনদক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। অষ্টম শ্রেণি শেষে কমপক্ষে অর্ধেক শিক্ষার্থী বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যাবে, মেধা ও প্রবণতার ভিত্তিতে অবশিষ্ট শিক্ষার্থী সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষায় যাবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষা হবে বহুমুখী। চাহিদা ও স্থানীয় সুযোগের ভিত্তিতে অঞ্চলভিত্তিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করতে হবে।

দশম শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে অর্ধেক যাবে কারিগরি শিক্ষায় এবং বাকি অর্ধেক সাধারণ শিক্ষায়। এ কথা সত্য যে, আইন করে এ নীতি বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা লাভের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এ নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বিক্রয়যোগ্য দক্ষতা (saleable skill) অর্জন নিশ্চিত করতে হবে। যেমন—একজন শিক্ষার্থী ছুতার (carpenter) ট্রেডভিত্তিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা শেষ করে সে যদি ভালোভাবে আসবাবপত্র তৈরি করতে না পারে, তাহলে এ শিক্ষা তার বা দেশের কোনো কাজে আসবে না। বৃত্তিমূলক শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থী ওই বৃত্তি গ্রহণ করে আয়-রোজগার ও উত্পাদন করতে পারতে হবে। গরিব শিক্ষার্থীদের অনেকে যথাযথ দক্ষতা অর্জন করে বৃত্তিমূলক বা কারিগরি শিক্ষা সমাপ্ত করলেও অর্থের অভাবে দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বকর্মসংস্থান করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে কম সুদে ঋণ লাভের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি পন্থা গ্রহণ করা যায়। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য উদ্বুদ্ধ করা যায়। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের ঝোঁক বৃদ্ধির জন্য ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ‘জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা’ এবং নবম-দশম শ্রেণিতে ‘ক্যারিয়ার শিক্ষা’ ২০১৩ সাল থেকে চালু করা হয়েছিল। ভালোই চলছিল। ২০১৭ সালে হঠাৎ এ বিষয়গুলোসহ আরো চারটি বিষয়কে ধারাবাহিক মূল্যায়নের অংশ করা হলো। ধারাবাহিক মূল্যায়নপদ্ধতি বাস্তবায়নের সঠিক কলাকৌশল নির্ধারণ না করে এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না দিয়ে শুধু প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালু করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ধারাবাহিক মূল্যায়নভুক্ত বিষয়গুলোর পাঠ্যপুস্তক প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেওয়া হচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত জরিপের ভিত্তিতে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, সারা দেশের ৮০ শতাংশের বেশি বিদ্যালয়ে এসব বিষয় একেবারেই পড়ানো হয় না। আন্দাজ করে ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর প্রদান করা হয়। এ শুধু অপচয় নয়, শিক্ষার্থীদের অনৈতিক পন্থা অবলম্বন শেখানো হচ্ছে, না পড়িয়ে ও পরীক্ষা না নিয়ে শুধু শুধু নম্বর প্রদান।

মানসম্মত শিক্ষা অর্জন নিশ্চিতকরণ

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বিকাশ এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে অন্যের বাসার গৃহকর্মী, রিকশাচালক, ভূমিহীন কৃষকও তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠায়। কিন্তু পাঁচ, আট বা দশ বছর বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করেও যদি কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ অর্জন না করে, তাহলে সবই বৃথা। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এক-দশমাংশের কম শিক্ষার্থী শুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে পারে এবং পড়ে বোঝে এবং সাধারণ গাণিতিক হিসাব-নিকাশ করতে পারে। শিক্ষার গুণগত মান বহুবিধ প্রভাবকের ওপর নির্ভরশীল যেমন—শিক্ষা অর্জনে সহায়তাকারী হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা উপকরণ, আসবাবপত্র, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নেতৃত্ব ইত্যাদি। এসবের মধ্যে সর্বোত্কৃষ্ট শিক্ষক। মানসম্মত শিক্ষার জন্য চাই মানসম্মত শিক্ষক। শিক্ষক ভালো হলে গাছতলায়ও মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব। বাংলাদেশে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব বড় প্রকট। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় অর্ধেক সৃজনশীল প্রশ্ন করতে পারেন না। এ মানের শিক্ষক কী করে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবেন! বিদ্যালয় পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষকপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হলে সরকারি কর্ম কমিশনের মতো শিক্ষা কর্ম কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। কর্মরত শিক্ষকদের ধারাবাহিকভাবে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের (hands on training) মাধ্যমে যোগ্য করে তুলতে হবে। বর্তমানে এনটিআরসিএ বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষক নির্বাচন করে থাকে। মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষকের বিষয়জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, পেশাগত প্রবণতা, পেশার প্রতি অঙ্গীকার এবং নৈতিক মূল্যবোধ অত্যাবশ্যক। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশন এসব দিক যাচাই করে শিক্ষক নির্বাচন করলে যোগ্য শিক্ষক পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষণের মান সন্তোষজনক নয়। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন না বা করেন না। প্রশিক্ষণ হতে হবে হাতে-কলমে, শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যা করবেন, প্রশিক্ষণে তা করে দেখাতে হবে এবং প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের দিয়ে প্রশিক্ষণে তা হাতে-কলমে করাতে হবে। ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সাজাতে হবে। তা ছাড়া সঞ্চরিত  (induction) প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করার জন্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএর পরিবর্তে বিশিষ্ট শিক্ষকদের সমন্বয়ে জাতীয় শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠনের কথা বলা আছে।

মেয়াদ বৃদ্ধি ও শিখন কৌশল পরিবর্তন

মৌলিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর ব্যাবহারিক সাক্ষরতা, দক্ষতা, বাঞ্ছনীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ অর্জন করার কথা। এককথায় মৌলিক শিক্ষা জীবনের ও পরবর্তী শিক্ষার ভিত। ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর পক্ষে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে এসব কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। একে তো সময়ের স্বল্পতা, অন্যদিকে দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ বিকাশের জন্য প্রাথমিক বয়ঃক্রমের শিক্ষার্থীরা অপরিপক্ব। এ সব কিছু বিবেচনায় রেখে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পাঁচ থেকে বৃদ্ধি করে আট বছর করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনও আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে। আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা হবে একমুখী, সর্বজনীন, অবৈতনিক ও সবার জন্য বাধ্যতামূলক। অনেকের ধারণা, ৭০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচজন করে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে, চারটি করে নতুন শ্রেণিকক্ষ ও আসবাবপত্র তৈরি করে আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এর জন্য কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন। সাধারণ দৃষ্টিতে তা-ই মনে হবে। এভাবে করতে গেলে প্রকট সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হবে। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পাঠদানরত শিক্ষকরা বেকার হয়ে যাবেন। তাঁরা সবাই এমপিওভুক্ত। তাঁদের হয় চাকরিচ্যুত করতে হবে, না হয় বসিয়ে বসিয়ে এমপিওর টাকা দিতে হবে। তা কি হয়!

ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলে কোনো সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি না করে অতি কম খরচ ও কম সময়ে আট বছর মেয়দি প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা সম্ভব। বর্তমানে ৭০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি শিক্ষা শেষ করে শিক্ষার্থীরা ২০ হাজার নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সবাই প্রাথমিকের লেখাপড়া শেষ করে যদি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তাহলে কোনো অবস্থায়ই ২৫ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ের প্রয়োজন হবে না। আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে হলে ক) ২৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি চালু করতে হবে। যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ নেই, ওই সব প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অব্যবহৃত শ্রেণিকক্ষে উচ্চ প্রাথমিকের (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির) কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়, এতে নতুন শ্রেণিকক্ষ বা আসবাবপত্রের প্রয়োজন হবে না; খ) যেসব শিক্ষক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পাঠদান করতেন, তাঁদের প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়ে উচ্চ প্রাথমিকে পাঠদানের জন্য নিয়োগ দেওয়া। এতে কারো চাকরি যাবে না বা নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে না। তাঁদের চাকরি জাতীয়করণ করা হলেও সরকারের ব্যয় খুব বেশি বৃদ্ধি পাবে না, কারণ তাঁরা এমপিওভুক্ত।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন—কে পড়াল এবং কোথায় পড়াল—এসব বড় কথা নয়, মূল বিষয় হলো, কী পড়াল এবং কিভাবে পড়াল। আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো : ১) প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একীভূত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন এবং শিক্ষাক্রমভিত্তিক শিখনসামগ্রী (পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক নির্দেশিকা ও শিক্ষা উপকরণ) তৈরি এবং ২) প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস।

বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রবর্তন

সুস্থ দেহ সুস্থ মন। সুস্বাস্থ্য শিক্ষা অর্জনের পূর্বশর্ত। শিশুদের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে তাদের পক্ষে লেখাপড়ায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষক যতই ভালো পড়ান, বইপত্র ও শিক্ষার পরিবেশ যতই উন্নতমানের হোক না কেন, শিশু অসুস্থ থাকলে বিদ্যালয়ে আসবে না বা এলেও লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারবে না। অনেক শিশু রোগাক্রান্ত হলেও অসচেতনতা বা অজ্ঞতার কারণে অভিভাবক বা শিক্ষক তা শনাক্ত করতে পারেন না। রোগ প্রকট আকার ধারণ করলে তৎপর হয়। অনেক ক্ষেত্রে তখন কিছুই করার থাকে না। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা সম্ভব হলে সহজেই সারিয়ে তোলা যায়। বিদ্যালয় একটি সংগঠন, যেখানে নির্ধারিত বয়সের শিশুদের একত্রে পাওয়া যায়। প্রতিবছর এক বা দুইবার ইউনিয়ন বা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার ও তাঁর সহকারী স্কুলে উপস্থিত হয়ে একে একে সব শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন এবং সাধারণ উপসর্গ যেমন—রক্তশূন্যতা, কৃমি, পুষ্টিহীনতা, দৃষ্টি সমস্যা ইত্যাদি রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসাসেবা প্রদান করবেন এবং জটিল রোগ চিহ্নিত করে বিশেষ চিকিৎসাসেবার জন্য ‘রেফার’ করবেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালু করতে হবে। এ ব্যবস্থা সুস্থ ও সুশিক্ষিত জাতি গঠনে সবিশেষ অবদান রাখবে।

প্রকট শিক্ষা সমস্যার সমাধান

বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক সমস্যা। এর মধ্যে কয়েকটি সমস্যা খুবই প্রকট। এসব সমস্যার আশু সমাধান প্রয়োজন। এসব সমস্যা শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এর জন্য চাই সংশ্লিষ্ট মহলের অঙ্গীকার। এখানে পাঁচটি প্রকট সমস্যা উল্লেখ করা হলো : ক) মহৎ উদ্দেশ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করা পাঠ্যপুস্তকের অপব্যবহার। খ) এসএসসি ও এইচএসসি পাবলিক পরীক্ষার ব্যাবহারিক অংশে টাকার বিনিময়ে নম্বর ক্রয়। গ) সৃজনশীল প্রশ্নের নামে না বুঝে মুখস্থ করার সুযোগ প্রদান। ঘ) অপেশাজীবী দ্বারা পেশাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালন এবং ঙ) বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্টিফিকেটের ব্যবসা।

শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় কর্ম কমিশনের মতো জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের যোগ্যতা বৃদ্ধি করে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে না; আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করে সুদৃঢ় মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রবর্তনের মতো কার্যক্রম বাস্তবায়নেও খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে না। এসব করা হলে শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপন করা যাবে। পঞ্চম প্রস্তাবে উল্লিখিত পাঁচটি শিক্ষা সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোতে হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক (অব.), আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা