kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রংপুর-ঢাকা যোগাযোগ : একটু নজর দেবেন কি

ড. শফিক আশরাফ

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রংপুর-ঢাকা যোগাযোগ : একটু নজর দেবেন কি

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্রশহর রংপুর। রংপুরকে ঘিরে আশপাশের যে জেলাগুলো রয়েছে তার প্রায় সবই সীমান্তবর্তী। যেমন কুড়িগ্রাম জেলার দুই দিক ঘিরে রয়েছে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ জেলার সীমান্ত। নীলফামারী, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর অঞ্চল ভারতের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, কোচবিহার, পশ্চিম দিনাজপুর জেলার সীমান্তঘেঁষা। এসব জেলার সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের যোগাযোগের মাধ্যম পথ রংপুর। শুধু যোগাযোগই নয়—এসব জেলার মানুষের চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনোদন সবই রংপুরের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ অনেকটা অলিখিতভাবেই উত্তরের রাজধানী শহরের মর্যাদায় আসীন রংপুর। কিন্তু এখন কথা হলো—রংপুরের ভৌত অবকাঠামো, রাস্তাঘাট কিংবা বাণিজ্য ও চিকিৎসাসেবা কোনোটিই উত্তরের এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়।

রংপুরের সঙ্গে রাজধানী শহর ঢাকার যোগাযোগের জন্য একটিমাত্র ট্রেন। সে ট্রেনের বেশির ভাগ অংশ দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে বাতিল হওয়া বগি মেরামত করে জোড়াতালি দিয়ে বানানো। দু-একটি এসি বগি থাকলেও প্রায়ই নষ্ট থাকে, জানালার কাচ ভাঙা, বাথরুমগুলোর কল খোলা ইত্যাদি সমস্যা মেনে নিয়ে উত্তর থেকে হাজার হাজার মানুষ ট্রেনযাত্রা করে। কিন্তু এই মানুষগুলোর সঙ্গে দুর্ভাগা নিয়তির মতো লেগে থাকে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়। রংপুর এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার সময় সন্ধ্যা ৭.৩০টা। কিন্তু এটি যদি খুব সময়মতো ছাড়ে সেটা হবে রাত ১১টা। এ ছাড়া রাত ২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে ট্রেন ছাড়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এরপরও এ অঞ্চলের যাত্রীরা অসীম ধৈর্য নিয়ে ট্রেনে যাত্রা করে। ট্রেন ভর্তি থাকে মানুষে, প্রায় কোনো আসনই ফাঁকা থাকে না। আরেকটি ট্রেন আছে, লালমনি এক্সপ্রেস। অনেক আগেই বাতিল হওয়ার মতো ট্রেনটি বগি ভর্তি করে যাত্রী নিয়ে যক্ষ্মা রোগীর মতো ধুঁকতে ধুঁকতে লালমনিরহাট থেকে ঢাকা কখন যায়, কখন আসে সেটা ভুক্তভোগীমাত্রই জানে। ট্রেন যদি সরকারের সেবামূলক খাত হয়, তাহলে সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত উত্তরের লাখ লাখ মানুষ। এখানে আন্তনগর ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি, আর জরুরি বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ। এটা হলে বর্তমান সময়ের চেয়ে অর্ধেক সময়ে রংপুর থেকে ঢাকা পৌঁছানো সম্ভব। একসময় রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত নৌযোগাযোগ চালু ছিল। এখন শোনা যাচ্ছে, এই নৌযোগাযোগ পুনরায় স্থাপনের জন্য সরকার উদ্যোগী হচ্ছে। এটা যদি করা যায়, সেটা হবে উত্তরের মানুষের যোগাযোগ ইতিহাস বদলে দেওয়ার মতো একটি ঘটনা। উত্তরের সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগের রাস্তা মাত্র একটি। রংপুর থেকে ঢাকা পর্যন্ত এই রাস্তার কোনো বিকল্প নেই, নেই কোনো বাইপাস। দুই লেনের এই রাস্তা শুধু অপর্যাপ্তই নয়, রাস্তার মান ভীষণ খারাপ। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঢাকা থেকে বগুড়া পর্যন্ত বিল-ঝিল, নদী-নালা পানিতে টইটম্বুর থাকে। এ সময় ভারী যানবাহনের চাপ রাস্তা নিতে পারে না। ফলে সহজেই কার্পেটিং উঠে খানাখন্দ তৈরি হয়। ফল হয় হাজার হাজার গাড়ির লম্বা যানজট। মানুষ অসংখ্য কর্মঘণ্টা নষ্ট করে গাড়িতে বসে থাকে। কয়টার গাড়ি কয়টায় পৌঁছবে কেউ জানে না! দুই লেনের রাস্তা চার লেনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উত্তরের মানুষ আশায় বুক বেঁধে আছে, এটা হলেই তাদের দুর্ভোগ লাঘব হবে। কিন্তু রাস্তার কাজের মান যথাযথ মনিটরিং করা না হলে দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে মনে হয় না। বরং দীর্ঘ রাস্তা, সারা বছর সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা গচ্চা দিতে হবে সরকারকে। আর সংস্কারকাজে ব্যস্ত থাকার অজুহাতে আগের যানজট দুর্ভোগ অপরিবর্তিত থাকবে।

রংপুর-ঢাকা যোগাযোগ দুর্ভোগের আরেকটি কারণ রাস্তায় হাট বা দোকান। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পার হয়ে প্রায় বগুড়া পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তাজুড়ে বসে কলার হাট। সেটি রাস্তার আশপাশে নয়, একেবারে রাস্তার ওপর! এখানে যানজট ছাড়াও দুর্ঘটনা প্রায়দিনকার ঘটনা। এই অঞ্চলটি কোনো না কোনো জেলা প্রশাসনের অধীন, হাট-বাজার ইজারা দেয় তারা। জনসেবার ব্রত নিয়ে নিয়োজিত ব্যক্তিরা ঠিক কী কারণে মহাসড়কের ওপর কলার হাট ইজারা দিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে, এর কারণ কারো বোধগম্য নয়। এ ছাড়া মহাস্থানগড় এলাকা ও মোকামতলায় মহাসড়ক ঘেঁষে প্রায় প্রতিদিন বাজার বসে। শুধু হাট-বাজার নয়, রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের অনেক জায়গা দখল করে আছে বিভিন্ন দোকানপাট। দুর্ঘটনা এড়াতে রাস্তার পাশে বাজার এলাকায় রোড ডিভাইডার দিয়ে লেন আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী কিংবা বিকিকিনির জন্য রাখা পণ্য অথবা যত্রতত্র পার্কিং করে রাখা গাড়ি। ফলে রোড ডিভাইডার কোথাও কোথাও সুবিধার চেয়ে অসুবিধা সৃষ্টি করেছে বেশি। মহাসড়কে নছিমন, করিমন, ইজি বাইক ও সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা থাকলেও রংপুর-ঢাকা সড়কে কোনো অজ্ঞাত কারণে সেগুলো অবাধে যাতায়াত করে, আর তা পুলিশের উপস্থিতিতেই।

এসব দেখে সহজেই বলা যায়, রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও ট্রাফিক জ্যামের কারণ বেখেয়াল ও নজরদারির অভাব। বিশেষ করে দুই ঈদের আগে এই মহাসড়ক পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। ঢাকা থেকে ঈদ করতে আসা গার্মেন্টকর্মীর জন্য হয়তো অধীর অপেক্ষায় বসে থাকে মা-বাবা কিংবা আদরের ছোট ভাই-বোন। তাদের আগমনেই উত্তরের ঈদ আনন্দের জোয়ারে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। যখন এই অপেক্ষার প্রহর শেষে মানুষটির লাশ আসে, তখন শুধু তার পরিবার নয়, আশপাশের কয়েক গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে বিষাদ! হারিয়ে যায় তাদের ঈদ আনন্দ। ঈদ শেষে পরিবারের আপনজনটি যখন বিদায় নিয়ে নিরাপদে ঢাকা যাওয়ার কথা, সেটা না হয়ে ফিরে আসে লাশ হয়ে! আমরা দূর থেকে শুধু একটি অ্যাকসিডেন্ট দেখি কিংবা শুধু দেখি ঈদ যাত্রায় মৃত মানুষের লাশ। তাদের পরিবারের কান্না আমরা দেখি না। তাদের কান্নার এত জোর নেই যে তা বহুদূর পৌঁছবে। রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে, হাট-বাজার, দোকানপাট উচ্ছেদসহ ধীরগতির যানবাহন নিষিদ্ধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখা দরকার, এই উত্তরের মানুষই ঢাকায় কলকারখানার চাকা ঘোরাচ্ছে। উত্তরের শস্য ও সবজি দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাচ্ছে। যারা এত কিছু দিচ্ছে, তারা কিন্তু কিছু চাচ্ছে না কিংবা চাওয়ার মতো শক্তি তাদের নেই। তাই উত্তরের দিকে একটু নজর দিন।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা