kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চামড়া খাতের উল্টোপথে যাত্রা

অরুণ কর্মকার

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চামড়া খাতের উল্টোপথে যাত্রা

সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনার উল্টোপথে চলেছে দেশের চামড়া খাত। সরকার চাচ্ছে চামড়াকে দেশের নামমাত্র দ্বিতীয় রপ্তানি খাত থেকে কার্যকর দ্বিতীয় রপ্তানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। সেই পথযাত্রায় সরকার ২০২১ সালে চামড়া রপ্তানি থেকে ৫০০ কোটি (পাঁচ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারি পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল হয়ে ২০৪১ সাল পর্যন্ত দৃষ্টি প্রসারিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই খাতের যে অবস্থা তাতে আপাতত ২০২১ সালের মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখাই ভালো।

তবে এ কথা ঠিক যে সরকার ২০২১ সালে দেশকে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তরের যে লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের যে অঙ্গীকার সরকারের রয়েছে, সে ক্ষেত্রে চামড়া খাতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। 

রপ্তানি বাড়ানোসহ চামড়া খাত উন্নয়নের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার ২০১৭ সালে চামড়াকে ওই বছরের ‘বার্ষিক পণ্য (প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার)’ ঘোষণা করেছিল। চামড়াশিল্পে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও ব্যবসায়ীদের নগদ সহায়তাসহ নানা রকম প্রণোদনা সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দিয়ে এসেছে। কিন্তু ফল হচ্ছে উল্টো। এখন পর্যন্ত কোনো কিছুই কাজে আসেনি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব বলছে, ২০১৭ সালে সরকার চামড়া খাতে রপ্তানি উন্নয়নের পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকে এই খাতে রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২২৩.৬ কোটি মার্কিন ডলার। পরের বছর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই আয় কমে হয়েছে ১৯৮.৭ কোটি ডলার। এর পরের বছর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা আরো কমে হয়েছে ১৮৭.৫ কোটি ডলার। এই অবস্থায় চামড়া রপ্তানি থেকে ২০২১ সালে ৫০০ কোটি ডলার আয় করার সরকারি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কেন এই উল্টো যাত্রা : চামড়া খাতের এই উল্টো যাত্রার সবচেয়ে বড় কারণ, দেশের চামড়াশিল্প পরিবেশবান্ধব (কমপ্লায়েন্স) নয়। বিশ্বের বড় এবং ব্র্যান্ডেড কম্পানিগুলো বাংলাদেশের চামড়া কেনে না। এই শ্রেণির কয়েকটি কম্পানির বাংলাদেশেও শিল্প আছে। তারাসহ দেশীয় যে প্রতিষ্ঠানগুলো চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে, তারা আমদানি করা চামড়া ব্যবহার করে। ফলে শুধু দেশের চামড়ার রপ্তানিই যে কমছে তা নয়, দেশে চামড়ার আমদানিও বাড়ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে চামড়া আমদানি হয়েছে ৯৪৫ কোটি টাকার।

উল্টো যাত্রার আরেকটি কারণ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের লুটেপুটে খাওয়ার সংস্কৃতি। এরা ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে এবং নিতে যতটা সিদ্ধহস্ত, শিল্প ব্যবস্থাপনায় এবং রপ্তানি উন্নয়নে ততটা মনোযোগী নয়। এখানে একটানা দুই-তিন বছর নামমাত্র কিছু চামড়া রপ্তানি করেও তার কয়েক গুণ বেশি সরকারি অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার নজির আছে। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ কিংবা রপ্তানি উন্নয়নের প্রতি তাদের মনোযোগ কম। তারা দিনমজুরের মতো দৈনিক ভিত্তিতে অন্য কারো কারখানায় কাজ করে (জব ওয়ার্ক) প্রতিদিন ভালো অঙ্কের নগদ অর্থ পকেটস্থ করে।

অব্যবস্থাপনার একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে প্রায় প্রতিবছরই কোরবানির চামড়া বেচাকেনা নিয়ে হাহাকার রব ওঠা। দেশের এত বড় একটা সম্পদ নিয়ে যুগ যুগ ধরে এই অবস্থা চামড়া খাতের বিপন্নতার বড় প্রমাণ। এ বছরও যথারীতি সেই রব উঠেছে এবং এখনো তার কোনো সুরাহা হয়নি। এর দায় সরকারের যেমন আছে, তেমনি এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো মহলই তা থেকে রেহাই পেতে পারে না।

কমপ্লায়েন্সের শর্ত কী : চামড়া খাতকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার প্রধান দুটি শর্ত হচ্ছে এই শিল্পের তরল ও কঠিন বর্জ্য পরিশোধন। এই দুটি শর্ত পূরণ করা গেলে কমপ্লায়েন্সের ৭০ শতাংশ পূরণ হবে। বাকি শর্তের মধ্যে আছে কারখানার কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, অন্যান্য সুবিধা ইত্যাদি।

বেশ কিছু ভালো (মানে ধান্ধাবাজ নয়, এমন) উদ্যোক্তার কারখানার কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই কমপ্লায়েন্স অনুযায়ী আছে। কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলেও তা পূরণের চেষ্টা তারা করছে। অর্থাৎ কমপ্লায়েন্সের ৩০ শতাংশ পূরণ করা কঠিন কিছু নয়। এ ছাড়া তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এটিপি) স্থাপন ও চালু করারও চেষ্টা আছে। এই চেষ্টার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন দরকার। এটিপি স্থাপনের মৌলিক কাজটি যেহেতু হয়ে আছে, সেহেতু সরকার এবং এই শিল্পের মালিকরা আন্তরিক হলে এর পূর্ণ বাস্তবায়নও কঠিন কিংবা খুব বেশি সময়সাপেক্ষ হওয়ার কথা নয়।

এরপর থাকে চামড়াশিল্পের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে এই কাজটির জন্য বিন্দুমাত্র উদ্যোগ-আয়োজন এখন পর্যন্ত করা হয়নি। অথচ কমপ্লায়েন্সের অন্তত ৩৫ শতাংশ পূরণ করা এ বিষয়টির ওপর নির্ভর করছে। চামড়াশিল্পের কঠিন বর্জ্য দেশের মাটি, পানি (ভূগর্ভের পানিসহ) ও বায়ু দূষণের একটি মারাত্মক উৎস। এই বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবার তৈরিতে। অথচ এই বর্জ্যে চামড়াশিল্পে ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, লিড, মার্কারির মতো এমন অনেক রাসায়নিক মিশ্রিত আছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে অপরিমেয় ক্ষতিকর। দেশের প্রায় সব মানুষ মাছ ও হাঁস-মুরগির মাংসের মাধ্যমে এসব রাসায়নিকের দূষণের শিকার হচ্ছে।

পরিত্রাণের উপায় কী : চামড়াশিল্পের কঠিন বর্জ্য পরিশোধনই দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্ববাজারে রপ্তানি বাড়ানোর একমাত্র উপায়। আজকাল হাতের নাগালে এমন প্রযুক্তি পাওয়া যাচ্ছে, যার মাধ্যমে চামড়াশিল্পের কঠিন বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন, পরিবেশবান্ধব ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করা যায়। ইতালির উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির বিস্তারিত খবরাখবর বাংলাদেশেও এসেছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে আগ্রহী দু-একজন এই প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প স্থাপনে নীতিসহায়তার জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরেও যাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সব জেনেশুনেও সাড়া দিচ্ছেন না।

তবে এ জন্য বিশ্ব বসে থাকবে না। ২০২১ সাল থেকে সারা পৃথিবীতে ‘ইকোফ্রেন্ডলি চামড়া’র ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকবে। সারা পৃথিবীতে চামড়াশিল্পের জন্য স্লোগান হবে ‘নো কমপ্লায়েন্স, নো এক্সপোর্ট’। আমরা সেই পরিস্থিতির সঙ্গে কিভাবে নিজেদের খাপ খাওয়াব, কিভাবে আমাদের চামড়াশিল্পকে রক্ষা করব এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে অগ্রসর হব—তা ভাবার জন্য বেশি সময় আমাদের হাতে নেই।

এরই মধ্যে ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ বহু দূর এগিয়ে গেছে। ২০০১ সালে ভিয়েতনামের চামড়া রপ্তানি থেকে আয় ছিল ১৮০ (১.৮ বিলিয়ন) কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৭০০ কোটি ডলার। তাদের রপ্তানির নির্ধারিত লক্ষ্য ২০২০ সালে দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে তিন হাজার ৮০০ কোটি এবং ২০৩৫ সালে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার কোটি ডলার। আমরা এগোতে না পারলে বিশ্ববাজার তাদের দখলে চলে যাবে। আমরা ছিটকে পড়ব অনেক অনেক নিচের খাদে।

 

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা