kalerkantho

হারিয়ে যাচ্ছে ইলিশের স্বাদ

ড. এ কে এম নওশাদ আলম

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হারিয়ে যাচ্ছে ইলিশের স্বাদ

ইলিশের স্বতন্ত্র নরম তৈলাক্ত আঁশহীন মাংস, জিব চুইয়ে পড়া অনন্য স্বাদ ও গন্ধ আর মুখের ভেতর চমৎকার স্বাদানুভূতির কারণে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় মাছগুলোর একটি বলে গণ্য করা হয়। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ও সারা বিশ্বে এর চাহিদা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে এর স্বাদে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে পত্রিকান্তরে খবর বেরিয়েছে। ইলিশ আর আগের মতো মানুষকে টানতে পারছে না। কেন ইলিশের স্বাদ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, কেন এত দুর্মূল্যের ইলিশ মায়ের পরশ মাখা রান্নার পরও মুখে তোলা যাচ্ছে না, কেনই বা ইলিশ ভাজতে গেলে খাবার টেবিলে অপেক্ষমাণ মেহমানরা আগের মতো এর ম-ম গন্ধে মোহিত হচ্ছে না—এসব কারণ খুঁজে বের করা দরকার।

সবার আগে জানা দরকার কেন ইলিশ এত মজা! গবেষণায় জানা গেছে, মাছের স্বাদ ও গন্ধ ছড়িয়ে থাকে অনেক রাসায়নিক উপাদানের ভেতর, যেগুলো আবার প্রজাতি, কাল বা পারিপার্শ্বিকতাভেদে ভিন্ন হতে পারে। মাছের স্বাদ ও গন্ধের মূল অংশটি তৈরি হয় গ্লুটামিক এসিড ও নিওক্লিওটাইডের সঙ্গে সোডিয়াম ও ক্লোরাইড আয়নের পারস্পরিক ঐক্য ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। বিরল কিছু রাসায়নিক উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ কোনো মাছের স্বাদ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। যেমন—পৃথিবীর সবচেয়ে মজাদার মাছের প্রতিযোগিতায় ইলিশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আটলান্টিক স্যামনের স্বাদের কারণটি হচ্ছে ‘আনসারিন’ নামের একটি বিরল এমাইনো এসিড। তেমনিভাবে ইলিশের অনন্য স্বাদ সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা পালন করে এর চর্বি ও ফ্যাটি এসিড, যা অন্যান্য মাছের মতো পেটের অঙ্কীয়দেশে জমা না হয়ে বরং সারা দেহে, পেশি-কলার ভাঁজে ভাঁজে, কোষের পরতে পরতে সুষমভাবে বিন্যস্ত থাকে। তাই কাঁটা ছাড়িয়ে একবার জিবে তুলে দিলে ইলিশের নরম মাংস মার্শমেলোর মতো দ্রুত গলে যায়, স্বাদ সক্রিয় সুগন্ধি উপাদানগুলো লালায় মিশে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে মস্তিষ্কে দ্রুত সুখানুভূতি পৌঁছে দেয়। তাইতো ইলিশ দেশ-বিদেশের ভোক্তাদের কাছে এতটা মজাদার লাগে।

ইলিশ একই সঙ্গে একটি অতি আমিষ, অতি চর্বির মাছ। খুব কম মাছে এই বিরল বৈশিষ্ট্যটি দেখা যায়। পরিণত ইলিশে অশোধিত আমিষের পরিমাণ প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ এবং চর্বির পরিমাণ আকার ও মৌসুমভেদে ৮ থেকে ২০ শতাংশ। সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের মধ্যে স্টিয়ারিক এসিডের পরিমাণ সর্বাধিক—প্রায় ৫০ শতাংশ। অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের মধ্যে মনো-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড, যেমন—অলেইক এসিডের পরিমাণ সর্বাধিক, প্রায় ১৮ থেকে ২৫ শতাংশ। আর বাকিটা পলি-অসম্পৃক্ত বা একাধিক দ্বিবন্ধনযুক্ত ফ্যাটি এসিড, যেমন—লিনোলেইক, লিনোলেনিক, এরাকিডনিক, এইকোসা-পেন্টাএনইক ও ডোকোসা-হেক্সাএনইক এসিড। আবার এদের মধ্যে বেশির ভাগ হচ্ছে এইকোসা-পেন্টাএনইক (ইপিএ) ও ডোকোসা-হেক্সাএনইক এসিড (ডিএইচএ) নামের ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে উপকারী কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়, ধমনির দেয়ালে জমা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলকে তাড়িয়ে সরু রক্তনালিকে প্রসারিত করে হূিপণ্ডজনিত জীবনঘাতী নানা রোগ (ইসকেমিয়া, মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রার্কশন, স্ট্রোক ইত্যাদি) থেকে রক্ষা করে। অন্যদিকে ইলিশের জীবনচক্রের নানা ধাপে এই পলি অসম্পৃৃক্ত ফ্যাটি এসিডের মাত্রা কমবেশি হওয়ার কারণেই প্রধানত এর অনন্যসাধারণ স্বাদ ও পাগলপারা গন্ধের তারতম্য হয় বলে আমাদের গবেষণায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ইদানীং হঠাৎ করে ইলিশের স্বাদ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে হলে এর জীবনচক্রের কোন সময়ে কী কারণে স্বাদের মাত্রায় হেরফের ঘটে তা বিস্তারিত জানা দরকার। ইলিশ মূলত সামুদ্রিক মাছ হলেও ডিম পাড়ার সময় দলে দলে মিঠা পানিতে উঠে আসে এবং নদীর অপেক্ষাকৃত গভীর শান্ত তলদেশে বা খাঁড়িতে ডিম পাড়ে। বাচ্চারা তিন-চার মাসে জাটকায় রূপান্তরের পর সমুদ্রে ফিরে যায় এবং তিন-চার বছরের মধ্যে ডিম পাড়ার উপযুক্ত হয়ে আবার একই পথে নদীতে ফিরে আসে। এভাবে ইলিশের জীবনচক্র চলতে থাকে।

ইলিশ সমুদ্রে থাকাকালে দেহের ভেতরে লবণের ঘনত্ব কম থাকায় অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় দেহে পানির পরিমাণ কমে যায়। পানি হ্রাস ঠেকাতে মাছ নানা ধরনের অভিযোজন দ্বারা মূত্রের পরিমাণ কমিয়ে দেয়, দেহে লবণ প্রবেশ করতে দেয় না, বরং কিছু কিছু লবণ বের করে দেয়। এতে কোষগুলো দৃঢ় ও শক্ত থাকে, পেশি শক্ত ও অনমনীয় হয়। অন্যদিকে সমুদ্রের ৩ থেকে ৩.৫ শতাংশ লবণাক্ততা থেকে নদীর প্রায় শূন্য লবণাক্ততায় লবণ-পানির ভারসাম্যতা পরিবর্তনের ফলে মাছকে বেশি পরিমাণ মূত্র তৈরি করতে হয়। নদীতে ইলিশ অনেক বেশি পানি মুখ, ফুলকা ও ত্বক দিয়ে গ্রহণ করে। এতে কোষগুলো নরম ও নমনীয় হয় এবং চর্বি-আমিষের আন্ত আণবিক সমন্বয়টি আরামদায়ক হয়। মাছ নদীতে অভিপ্রয়াণকালে কোনো খাবার গ্রহণ করে না বা খুবই কম খাবার গ্রহণ করে। লবণাক্ত আবাসস্থলের পরিবেশ, কাদা-বালি অথবা খাদ্য থেকে পেশিতে যোগ হওয়া বেশির ভাগ দুর্গন্ধ মিষ্টি পানিতে প্রবেশকালে ক্রমাগত ডায়ালিসিসের মাধ্যমে দূর হয়ে যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইলিশের স্বাদ তার পরিভ্রমণ কাল ও অভিপ্রয়াণ দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভরশীল। নদী বেয়ে এরা যত ওপরে ওঠে, তত বেশি মনো-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড পলি-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডে পরিবর্তিত হয়, তত বেশি এদের দেহস্থিত দুর্গন্ধ স্বাদু পানিতে ডায়ালিসিস হয়ে বের হয়ে যায়। আর তাতে ইলিশের স্বাদ তত বেড়ে যায়। আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণায় অসম্পৃৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ সামুদ্রিক ইলিশে সবচেয়ে কম ১১.৫ শতাংশ এবং পদ্মার ইলিশে সবচেয়ে বেশি ২৬.৪৭ শতাংশ পাওয়া গেছে। এমনকি নদীর আরো উজানে ডোকোসা-হেক্সাএনইক এসিড, এইকোসা-পেন্টাইনইক এসিড থেকে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ন্যূনতম চাঁদপুর বা পায়রা পর্যন্ত উঠলেও কি ইলিশের দেহে আগের স্বাদ পাওয়া যাবে না? কিছুদিন আগেও তো ধলেশ্বরী, মাওয়া বা মেঘনার উজানে ধরা ইলিশ অনেক মজার ছিল! এখন সেই স্বাদ কোথায় হারিয়ে গেল? চলুন না নদীতে একটি সহজ পর্যবেক্ষণ করি—ঢাকার সদরঘাট থেকে মীরকাদিম, মুন্সীগঞ্জ, মেঘনার ষাটনল হয়ে চাঁদপুর মাছঘাট পর্যন্ত নদীর পানির রং পরীক্ষা করি, গন্ধ শুঁকে দেখি। আমাদের গবেষকদল চাঁদপুর পর্যন্ত উল্লিখিত প্রতিটি পয়েন্টে পানির রং কালো এবং গন্ধ পচাগলা সবজির মতো পেয়েছে। বিগত মার্চ-এপ্রিল মাসে মীরকাদিমের কাছে ধলেশ্বরী-বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যার ত্রিমোহনীতে পানির রং ছিল নিকষ কালো, চাঁদপুর পর্যন্ত যেতে যেতে তা কিছুটা হালকা কালো, তবে কোনোভাবেই স্বচ্ছ ছিল না। আর গন্ধের বেলায় ষাটনল পর্যন্ত সবটাই ছিল জঘন্য পচা! গেল মার্চ মাসে পোস্তগোলার বুড়িগঙ্গা, মদনগঞ্জের শীতলক্ষ্যা, মীরকাদিমের ত্রিমোহনী ও মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী পয়েন্টে মারাত্মক ক্ষতিকর পাঁচটি হেভিমেটাল (মার্কারি, লেড, কপার, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম) সূচক জলজ প্রাণীর জন্য নিরাপদ মাত্রার চেয়ে ১৭.০, ১৩.৭, ১.২ ও ০.৭ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ এই চার পয়েন্টে ছিল যথাক্রমে ১.০, ০.৯, ৪.২ এবং ৪.৮ পিপিএম। প্রথম দুটি স্থানে প্রাণের অস্তিত্ব একবারে নেই, পরের দুই স্থান প্রায় প্রাণহীন! এখন বর্ষায় বৃষ্টির ঢল ও নিম্নের জোয়ারের প্রভাবে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে হয়তো। তবে পরবর্তী সময়ে শুকনা মৌসুম ধরে দূষণের মাত্রা এ রকম চলতে থাকলে তা ষাটনল, চাঁদপুর হয়ে আরো ভাটিতে পুরো মেঘনা মোহনা গ্রাস করে ফেলবে। তখন ইলিশের স্বাদ ধরে রাখা তো দূরের কথা, মেঘনায় ঢুকতেই জীবন বাঁচানো দায় হয়ে পড়বে। পদ্মা সেতু তৈরির পর নানা কর্মকাণ্ডে ভবিষ্যতে পদ্মা-বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-তুরাগ-বালু-মেঘনাবাহিত বর্জ্য ততধিক মাত্রায় মিশে স্বাদু পানিতে ডিম ছাড়তে আসা ইলিশকে কি স্বস্তি দেবে? ওপরে আর উঠতেও পারবে না, ফ্যাটি এসিডে পরিবর্তনও আসবে না। এ রকম পানিতে ইলিশ তার স্বাভাবিক স্বাদ শুধু হারাতেই থাকবে।

লেখক : অধ্যাপক, ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

মন্তব্য