kalerkantho

বিশ্বে কোণঠাসা পাকিস্তান কাশ্মীরে ফিরছে কাশ্মীর

বাহারউদ্দিন

১৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশ্বে কোণঠাসা পাকিস্তান কাশ্মীরে ফিরছে কাশ্মীর

কাশ্মীর নিয়ে ভারতের স্বস্তি বাড়ছে, শান্তি ফিরছে উপত্যকায়, লোকজনকে মাঝে মাঝে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে, তাদের চেক করে ছেড়ে দিচ্ছে নিরাপত্তারক্ষীরা। শ্রীনগরে গত দুদিনে একটিও অঘটন ঘটেনি, ডাউন টাউনের বড় মসজিদ ছাড়া উপত্যকার সব এলাকায় নির্বিঘ্নে জুমার নামাজে সব মহল খুশি। ডাললেক, নাগিনলেকে কিছু কিছু হাউসবোট ও মাছ ধরার নৌকা নজরে এসেছে। মেঘলা আকাশে সূর্যোদয়, সূর্যের লুকোচুরি খানিকটা আশ্বস্ত করেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। কারফিউতুল্য স্তব্ধতা পাশ ফেরাচ্ছে। ১৪৪ ধারা প্রত্যাহূত। তবে স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো নিশ্ছিদ্র। রাজনৈতিক নেতারাও গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

আপাতত হিংসাহীন, ক্ষোভহীন, উপত্যকার জড়সড় চালচিত্র পকিস্তানকে ও তাদের সহযোগী জঙ্গিদেরও ভাবিয়ে তুলছে। জঙ্গিরা ভেবেছিল উত্তপ্ত স্তম্ভিত পরিস্থিতি থেকে তারা ফায়দা তুলবে। অবলুপ্ত ৩৭০ ধারাকে ঘিরে গণবিক্ষোভ আছড়ে পড়বে, পেছন থেকে তারা ইন্ধন জোগাবে। হলো না। কাশ্মীর স্বাভাবিক অবস্থার দিকে হাঁটছে।

পরিস্থিতিতে স্থিতির প্রত্যাবর্তন স্থায়ী হলেও পাকিস্তানের লম্ফঝম্প বাড়বে। সমস্যাটিকে তারা আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যেতে মরিয়া। আর এ কারণেই দিন দুয়েক আগে গণপরিষদের যৌথ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান হুমকি দিয়েছিলেন, পুলওয়ামার মতো কোনো অঘটন যদি ঘটে যায়, ইসলামাবাদ তার দায়িত্ব নেবে না। এর মানে কী? ইমরান প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন কাশ্মীরে জইশ-ই-মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তৈয়বা ও হিজব এ মুজাহিদিনের মতো সংগঠিত সন্ত্রাসবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতায় তাদের সায় আছে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এক মাস আগে সীমান্তবর্তী পাকিস্তান ভূখণ্ডে জঙ্গিদের যেসব ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সন্ত্রাসবাদীদের কয়েকটি সংগঠনকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় নিয়ে এসে ইসলামাবাদ যে কসমেটিক মনোভাব দেখিয়েছে, সে অবস্থান থেকে হঠাৎ সে সরে গেছে। কোটলি, রাওয়ালকোট, বাগ, মুজাফফরাবাদে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসবাদীরা আবার জড়ো হয়েছে। সেনা তৎপরতাও চোখে পড়ছে। ভারতের উঁচুস্তরের গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, দিল্লি নজর রাখছে। এসব এলাকায় ভারতীয় সেনা-আধা সেনাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের গতিবিধি রহস্যময়। বরাবর এ রকমই ছিল। অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস, বহির্মুখী সন্ত্রাসের খাঁচা থেকে বেরোতে পারছে না। জটিলতা ক্রমেই তাকে ঘেরাও করছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারার অবলুপ্তি এবং বৃহত্তর কাশ্মীরকে আলাদা দুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণার পর এবং বিষয়টি নিয়ে আমাদের লোকসভায় ও রাজ্যসভায়, আমাদের নেহরু লিগেসির বুদ্ধিজীবীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখে পাকিস্তান ভেবেছিল উপত্যকার বরফ-চাপা আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত কোণঠাসা হয়ে পড়বে। কিন্তু ক্ষমতাশালী ভারত, ভারতের কূটনীতির সাফল্য বাস্তবতার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। কিভাবে? রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রথমেই উদ্বেগ প্রকাশ করে দুই দেশকে সংযত থাকার আহ্বান জানায়। গতকাল সরাসরি বলল, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমরা দুই দেশের ঝগড়ায় হস্তক্ষেপ করতে চাই না। পাকিস্তানের স্বাভাবিক মিত্র চীন জানিয়ে দেয় সরাসরি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার অবলুপ্তি নিয়ে আমরা মাথা ঘামাব না। তবে বৌদ্ধ অধ্যুষিত লাদাখকে স্বায়ত্তশাসনের আওতায় নিয়ে আসাকে ঘিরে প্রশ্ন আছে। কূটনৈতিক শীতলতায় হিসাবি আর চাপা কৌশল তৈরিতে অভ্যস্ত চীনের মনোভাবে সব সময়ে নিনাদিত স্বর গরহাজির। যা করে খুবই ঠাণ্ডা মাথায়। ধীরে সুস্থে। তার অভ্যাসে ঝটকা হাওয়া নেই। কাশ্মীর নিয়ে বেইজিং কতটা, কিভাবে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে, এ নিয়ে প্রশ্ন ঝুলে রইল। পাকিস্তানের জমিনে চীনের বিনিয়োগ সর্বজনবিদিত। রাস্তা তৈরি করছে, বন্দর নির্মাণেও তার কড়ি ও কারিগরি ঢুকছে। কিন্তু ভারতের মতো বড় বাজারে তার অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিধি পাকিস্তানি বাজারের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। এ বাজার হাতছাড়া করতে কি চাইবে? ভারতে চীনের পণ্য প্রবেশ নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ওয়াশিংটনও দক্ষিণ এশিয়ায় বড় বাজার দাবি করছে। দিল্লির সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো শীতল। ওবামার আমলে উষ্ণতা প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়। আবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আমদানি-রপ্তানিতে মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধিকে ঘিরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রক্রিয়া খানিকটা শীতল হয়ে ওঠে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অতিরিক্ত ভারত-আসক্তি নজরে এলেই চীন নড়েচড়ে বসবে। রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি পরিষ্কার। গতকাল পুতিন বলেছেন, সংবিধানের অনুশাসন মেনেই ভারত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছাঁটাই করেছে। তার মানে, বিশ্বমঞ্চের মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াও তার স্বাভাবিক বন্ধু ভারতের পাশে আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে।

পশ্চিম এশিয়া একসময় কাশ্মীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করত। বলত, ভারত যা করছে, তা ঠিক নয়। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, তারাও এই ইস্যুতে পাকিস্তানের হৈচৈকে বিলকুল আমল দিচ্ছে না। সংযুক্ত আমির শাহি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ ঝামেলায় তারা নাক গলাবে না। কাতার, সৌদি আরব, সমস্যাজর্জরিত সিরিয়া ও ইরাক এখনো মৌন। দিল্লির সঙ্গে গত ছয় বছরে মধ্য এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরানের যে হৃদ্যতা, যে বাণিজ্যিক লেনদেন গড়ে উঠছে, এসব খতিয়ে দেখে মনে হচ্ছে—মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়া সতর্কতা অবলম্বন করে পাকিস্তানের জেদ আর সামরিক ক্ষমতামত্ততাকে বিলকুল আমল দেবে না। অর্থাৎ আগের মতোই কাশ্মীর ইস্যুতে ইসলামাবাদ নিঃসঙ্গ হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রসংঘ বা অন্যান্য বিশ্বমঞ্চেও কোণঠাসা অবস্থান থেকে তার মুক্তি দিল্লি দূর-অস্তের মতো নিছক এক উপস্বপ্ন। এই স্বপ্ননামাকে অক্ষরিত করতে হলে তাকে কাশ্মীরে ভারতের অন্যত্র নিরন্তর দুঃস্বপ্ন জাগিয়ে রাখতে হবে। কাশ্মীরমুখী সন্ত্রাসবাদীদের ঘন ঘন প্ররোচিত করতে হবে। বলতে হবে কাশ্মীরে মানবাধিকার নিহত, আহত। কাশ্মীরিদের আজাদির লড়াই ন্যায়সংগত। এটা ইসলামাবাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাধ্যবাধকতা। এখানে নয় ন্যায়-অন্যায়, বৈষম্য বা সুবিচার বিষয় নয়। বিষয় কাশ্মীরকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান হারানোর প্রতিশোধকামী প্রতিস্পর্ধার বাস্তবায়ন। এ কারণেও জঙ্গি পোষার মতো আত্মঘাতী, দেশবিরোধী, সংশয়াচ্ছন্ন সিদ্ধান্ত কাঁধে নিয়ে তার রাষ্ট্রীয় চেহারা, তার অর্থনীতি, তার কূটনীতি ক্রমেই নুয়ে পড়ছে।

পাকিস্তানের সিভিক সোসাইটি যুদ্ধবিরোধী, আর রাষ্ট্রযুদ্ধের অবাস্তবতা ও বাস্তব পরিণাম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হলেও বাধ্যতামূলক শর্তে হুমকি দেবে, পরমাণু বোমা দেখিয়ে ভারতকে, বিশ্বকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকবে। আক্ষরিক অর্থে ইসলামাবাদ কাশ্মীরিদের হিতাকাঙ্ক্ষী হলে তাদের দখলে থাকা কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিত। বৃহত্তর কাশ্মীর নিয়ে, কাশ্মীরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করত। স্বাধীন কাশ্মীর পাকিস্তানের অভিপ্রেত আকাঙ্ক্ষা নয়। আকাঙ্ক্ষা তার খণ্ডিত কাশ্মীরের জমি দখল। কাশ্মীরিরা স্বেচ্ছায় ভারতের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ১৯৪৭ সালে। এ ইচ্ছার মৃত্যু চায় পাকিস্তান রাষ্ট্র। এ রকম আরোপিত মৃত্যু কি সম্ভব? এত সহজ? ভারতের মতো মহাগণতন্ত্রের, বহুত্ববাদিতার, বহু সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্রে। ভারত ভুল করেনি বলব না। সুবিচার আর নিষ্ঠার রাজনীতি, সমাজনীতি, উন্নয়ননীতি উপত্যকায় যদি স্থাপিত হতে পারত, তাহলে উসকানির জবরদস্তি হার মানত। তথাকথিত আজাদির লড়াইয়ের নারা উঠত না বিস্তৃত উপত্যকায়। দিল্লি কাশ্মীরিয়তের ইতিহাস, তার আত্মমর্যাদার ইতিহাস, তার মানবিক বন্ধন আর মিশ্র সংস্কৃতির পরম্পরা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল নয়। আমাদের হাল আমলের পলিসি মেকাররা নেহরু, ইন্দিরা আর অটল বিহারি বাজপেয়ির মতো প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ, সুবিবেচক হয়ে উঠলে কাশ্মীর ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরে ফিরে আসবে। ডাললেকে অবাধে নৌকা চলবে। নিশাতবাগের জলদ্বীপে ফুটে উঠবে হাজার হাজার গোলাপ।

 

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক

[email protected]

মন্তব্য