kalerkantho

ঈদুল আজহা এবং সর্বজনীন ঈদ উৎসব

ইসহাক খান

১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঈদুল আজহা এবং সর্বজনীন ঈদ উৎসব

মুসলিম সম্প্রদায়ের দুটি বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সাধারণ মানুষ সহজভাবে বলে রোজার ঈদ এবং কোরবানির ঈদ। সাধারণ মানুষের সেই কোরবানির ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বারপ্রান্তে। পশুর হাটগুলো মানুষের পদচারণায় মুখর।

ঈদুল আজহার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে পশু কোরবানি। ধনবানদের জন্য কোরবানি ফরজ করা হয়েছে। অর্থাৎ ধনাঢ্য ব্যক্তিদের পশু কোরবানি বাধ্যতামূলক। 

হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) মহান আল্লাহপাক স্বপ্নের মাধ্যমে জানালেন, তোমার প্রিয় বস্তুকে তুমি কোরবানি করো। এই স্বপ্ন দেখে নবী ইব্রাহিম (আ.) ভাবনায় পড়লেন। তিনি প্রিয় বস্তুর সন্ধান করতে লাগলেন। কিন্তু তিনি ভেবে কিছুতেই প্রিয় বস্তুর সন্ধান করতে পারলেন না। একই স্বপ্ন আবার তাঁকে দেখালেন আল্লাহপাক। পর পর কয়েক রাতে আল্লাহপাক তাঁকে একই স্বপ্ন দেখালেন। তিনি গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন তাঁর প্রিয় বস্তু কী? অবশেষে তিনি রাব্বুল আলামিনের স্বপ্নের ইশারা বুঝতে পারলেন। তাঁর প্রিয় বস্তু তাঁর প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)। তাঁকেই কোরবানি করতে বলছেন তাঁর প্রভু। তিনি পুত্র ইসমাইলকে কোরবানির উদ্দেশে নিয়ে গেলেন একটি পাহাড়ে। পুত্রকে শুইয়ে তাঁর গলায় ছুরি চালাতেই আল্লাহপাকের ঈশারায় অলৌকিকভাবে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। অক্ষত থেকে যান প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)। সেই থেকে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের জন্য তাঁর উদ্দেশে পশু কোরবানি করা হয়। 

কোরবানি মূলত আত্ম-উৎসর্গ। আত্মশুদ্ধির জন্য স্রষ্টার উদ্দেশে বান্দার এই আত্মসমর্পণ। মনের পশু কোরবানি দিয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে ধর্মের নির্দেশনাকে মেনে এই আয়োজন। গরিবরাও যাতে এই উৎসবে সমভাবে শামিল হতে পারে তার জন্য কোরবানির অংশ তাদের ভাগে বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে ধর্মীয় গ্রন্থে। গরিব আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদেরও হক রয়েছে এতে।

কিন্তু বাস্তবে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখি। কোরবানির মূল উদ্দেশ্য এড়িয়ে লোক দেখানো কোরবানিতে মেতে ওঠে বিত্তবানরা। প্রতিবেশীর কোরবানির পশুর চেয়ে তার পশু দামি এবং আকারে বড় হতে হবে। না হলে মান-সম্মান খোয়া যাবে—সমাজে আজ এই অশুভ প্রতিযোগিতা মানুষের চিত্তকে কলুষিত করছে। ফলে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। স্রষ্টার সন্তুষ্টির পরিবর্তে নিজেদের সন্তুষ্টি নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে মানুষ। আর তাই লোক দেখানো অশুভ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে বিত্তবানরা। কথিত আছে, অনেক বিত্তবান ব্যক্তি গত বছরের কোরবানির মাংস চলতি বছরও খেতে পারবে। ফ্রিজে সঞ্চয় করে রেখেছে। অথচ সেই মাংস গরিব-মিসকিনদের প্রাপ্য। তাদের বঞ্চিত করে নিজেরাই গরিবের হক খেয়ে কোরবানির তাৎপর্য নষ্ট করছে। ব্যবসায়ীদের বরাতে জানা যায়, কোরবানির ঈদের আগে-আগে ফ্রিজ ক্রয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে সাধারণ মানুষ এই ফ্রিজের ক্রেতা নয়। এই ক্রেতা বিত্তবানরা। যাদের ঘরে একটি ফ্রিজ থাকার পর আরো একটি ডিপ ফ্রিজ কিনছে শুধু কোরবানির মাংস জমিয়ে রাখার জন্য। তাহলে কোরবানির তাৎপর্য কোথায়? কোরবানির তাৎপর্য হলো মনের পশুকে কোরবানি করে আত্মশুদ্ধ হওয়া। অথচ বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিত্তবানরা অসম প্রতিযোগিতায় ধাবিত হয়েছে—কে কত বড় পশু কোরবানি করতে পারে। এই অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক। মানুষের ভেতর শুভবুদ্ধির উদয় হোক। মহান প্রভু তাদের অন্তরে শুভবুদ্ধির উদয়ের তৌফিক দিন।

ঈদের অফুরান আনন্দ মূলত শিশুদের। যাদের কোনো দায়িত্ব নেই। তারা প্রাণ খুলে আনন্দ করতে পারে। যেমন আমরা ছোটবেলায় করেছি। রোজার ঈদের আনন্দ প্রথম রোজা থেকেই শুরু হয়ে যেত। অপেক্ষায় থাকতাম বাবা কবে বাজারে নিয়ে গিয়ে নতুন শার্ট কিনে দেবেন। সেই নতুন শার্ট পেয়ে আমরা লুকিয়ে রাখতাম। ঈদের দিনের আগে সেটা কাউকে দেখাতাম না। যদি পুরনো হয়ে যায় এই কারণে এই গোপনীয়তা। আমরা অল্প অল্প করে পয়সা জমিয়ে ঈদের দিনে যে পথে মেলা বসত সেই মেলা থেকে ঝুড়ি-বুন্দি কিনে খেতাম। কোরবানি ঈদ এলে বাড়িতে যখন গরু কিনে আনা হতো সেই গরুকে আমরা গোসল করাতাম। ঘাস খেতে দিতাম। আর ভেতরে ভেতরে আনন্দ ও খুশির পুলক অনুভব করতাম।

সেই আমরা যখন শিশুর পিতা হলাম, আমাদের ঘাড়ে দায়িত্বের বোঝা চাপল। ছোটবেলার মতো আর ঈদ নিয়ে উচ্ছ্বাস করা হয় না। দায়িত্ব মানুষের চিন্তাভাবনা পাল্টে দেয়। এখন শিশুর আনন্দ আমাকে আমোদিত করে। তার উচ্ছ্বাস আমাকে উচ্ছ্বসিত করে। আমার ঈদের উচ্ছ্বাস আজ আমার শিশুদের মধ্যে দেখতে পাই। যেমন আমরা একসময় উল্লসিত ছিলাম ঈদ নিয়ে, এখন তারাও ততটাই উল্লসিত ঈদ নিয়ে।

এবারের ঈদের আনন্দ অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে। দেশজুড়ে চলছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। বলা যায় রোগটি মহামারি রূপ ধারণ করেছে। বেসরকারি হিসাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ঠাঁই হচ্ছে না। অথচ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ভীষণ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ডেঙ্গু রোগকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দিলেন। অথচ আমরা টিভি চ্যানেলে দেখলাম হাসপাতালে সিট না পেয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুকে কোলে নিয়ে মা-বাবা পাগলের মতো অন্য হাসপাতালে ছুটছে। উত্তরের মেয়র বললেন, প্রয়োজন হলে বিমানে করে ডেঙ্গু রোগের ওষুধ আনা হবে। যেখানে সরকারি হিসাবে বিশের বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মারা গেছে, তার পরও ওষুধের প্রয়োজন হয়নি এখনো? স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবারের ঈদ যাত্রায় ঢাকাবাসীকে ঢাকা ত্যাগ না করতে বলেছেন। কারণ হিসেবে বলেছেন, ঢাকায় এডিস আক্রান্তদের কারণে ডেঙ্গু সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চলছে আরেক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যা। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যায় মানুষজন বাড়িঘর ফেলে উঁচু স্থানে কিংবা বাঁধে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের দিন যাচ্ছে খেয়ে না খেয়ে। তাদের যেহেতু মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, বেঁচে থাকার উপকরণ নেই; কিভাবে তারা কোরবানি করবে? কোথায়ই বা কোরবানি করবে? জনগণের বৃহৎ একটি অংশ ঈদের এই উৎসব থেকে বঞ্চিত।

মানুষের আশা মহান প্রভু প্রাকৃতিক এই বিপর্যয় থেকে সবাইকে রক্ষা করবেন। এবং ত্যাগের এই উৎসবে সবাইকে অংশগ্রহণে সুযোগ দেবেন। শুধু আশা নয় সবারই প্রার্থনা, মহান আল্লাহ তায়ালা এই বিপর্যয় থেকে বান্দাদের উদ্ধার করে তাদের জীবন যাপন নির্বিঘ্ন করবেন। এবং বান্দাদের তাঁর উদ্দেশে ত্যাগের মহিমা প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন। যেন মানুষ আবার ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে ধনী-গরিব পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারে।          

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার

মন্তব্য