kalerkantho

ডেঙ্গুময় দুর্দিনের দুর্ভাবনা

মোস্তফা মামুন

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ডেঙ্গুময় দুর্দিনের দুর্ভাবনা

ওডোমস ক্রিম আনতে পাঠিয়েছিলাম সপ্তাহখানেক আগে। তখনো এমন কাড়াকাড়ি শুরু হয়নি, নিয়মিত ব্যবহারকারীদের কাছে জেনেছিলাম, দেড় শ টাকার মতো দাম। তবু অনেক বেশি টাকার একটা নোট দিয়েছিলাম, কারণ নিশ্চিত ছিলাম, আমাদের প্রিয় ব্যবসায়ীরা এমন সুবর্ণ সুযোগে চুপচাপ বসে থাকতেই পারেন না। ১০-২০ টাকা হলেও বেশি নেবেন। কার্যক্ষেত্রে দাম পড়ল দ্বিগুণ। তখন খুব মেজাজ খারাপ হয়েছিল। এখন অবশ্য ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। দ্বিগুণ দামে হলেও পেয়েছিলাম তো। এখন পাওয়াও যাচ্ছে না।

সত্যি বড় বিচিত্র এই আমরা। যে রোগটা এমন প্রকট, নিজেও আক্রান্ত হতে পারেন পরমুহূর্তেই, তবু এর মধ্যেও নিজেদের প্রকাশ করবেনই। হাসপাতালগুলোর কেউ কেউ যেমন লাখ লাখ টাকা বিল করে স্ফীত কোষাগারটা আরো স্ফীত করার চেষ্টা করছে। বিত্তবান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে ক্ষুদ্ররাও। ডেঙ্গু রোগীদের পথ্য ডাব-মাল্টার দামও ঊর্ধ্বমুখী। এদের ঘৃণা করতে করতে ঘৃণাবোধটাও আজকাল আর ঠিক কাজ করে না। এরাই আসলে আমরা। জগতের সব রকম দুর্যোগ যে আমাদের ওপর চাপে, এর কারণ বোধ হয় এটাই। সামগ্রিক অনাচার।

ব্যবসায়ীরা আছে ব্যবসায় আর আমাদের নেতারা আছেন মসকরায়। ভাবা যায়, মশার কার্যকর ওষুধ কেনানোর জন্য হাইকোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তার পরও কাজ হয়নি কিছুই। সত্যি বললে, মানুষ তাদের কাণ্ড দেখে বুঝে গেছে যে এদের ওপর আর ভরসা করে লাভ নেই। তাই ওডোমস কেনার ধুম পড়েছে। আশপাশে তাকালেই মশা মারতে ব্যস্ত মানুষজনকে দেখতে পাই। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে হয়তো মশা নেই। তবু হাত চলছে। আমাদের সহকর্মী নোমান মোহাম্মদ শ্রীলঙ্কা থেকে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছে মশাপ্রতিরোধী স্প্রে। অফিসের একটা বিভাগে একদিন দেখি, আরেক মশাবিরোধী উপাদান নিমপাতা বিতরণ করা হচ্ছে। সবাই বরাদ্দটা এমন আনন্দে বুঝে নিচ্ছে, যেন এর চেয়ে মহার্ঘ্য কিছু আর হতে পারে না। এমন বনজ-স্থলজ-জলজ—সব রকম প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে ডেঙ্গুর সঙ্গে আমাদের লড়াই। আফসোস যে এই লড়াইয়ে সামনে থাকার কথা যাঁদের, সেই সরকার বা নেতারা পেছনের সারিতে।

অনেক বছর আগে আফ্রিকায় গিয়েছিলাম। কেনিয়ার সপ্তাহ দুয়েকের সেই সফরে জীবনকেই জানলাম নতুন করে। আগে ইয়েলো ফিভারের ইনজেকশন নিতে হলো। সেই সূত্রে ভাইরাসবাহিত অপ্রতিরোধ্য কিছু রোগের নাম শুনে বুঝলাম, পৃথিবীতে এমন অসুখ এখনো বিদ্যমান, যেগুলোর সেই অর্থে কোনো চিকিৎসা নেই। অসুখ-বিসুখের সঙ্গে আছে ভীতিকর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সন্ধ্যার পর যার যাকে ইচ্ছা গুলি করে টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। আমরা ভয়ে অস্থির। কিন্তু ওদিকে আবার দেখি, স্থানীয়রা ঠিকই নাচ-গান করে চলছে। কিভাবে সম্ভব! ওদের ভয় লাগে না? একটু খোঁজখবর করে দেখলাম, যেহেতু এই ভয় কাটানোর কোনো উপায় নেই, তাই ভয়ের সঙ্গে বসবাসের একটা অভ্যাস ওদের হয়ে গেছে। আমাদের জন্য বোধ হয় ডেঙ্গু তা-ই হতে চলেছে। হয়তো আমরা এর পর থেকে জানব, জীবন এ রকমই। প্রতিবছর ডেঙ্গু আসবে। আমাদের অনেকে হারিয়ে যাবে। কী আর করা!

সত্যি বললে, আমাদের দেশে একেকটা দুর্যোগের অর্থ আসলে আমাদের সহ্যক্ষমতা আরেকটু বাড়িয়ে নেওয়া। যেমন শিশু ধর্ষণে এখন আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যেমন সড়কে প্রতিদিন ১৫-২০ জন না মরলে আমাদের মনে হয়, কী যেন একটা আজ ঠিকমতো হলো না। ঠিক এ রকম ডেঙ্গুময় জীবন বা মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে নিন। মন্ত্রীদের কথা আর কাণ্ডে নিশ্চয়ই নিশ্চিত হয়ে গেছেন এই দুর্যোগ দূর হওয়ার নয়।

জাভেদ ভাই শুরুই করলেন এই দুর্যোগ থেকে, ‘দেখো একটা মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি তো ঘোষণা করাই যেত। রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে ঝাঁপাতে পারত।’

‘কিন্তু সেটা করতে হলে তো অনেক বেশি লোক নাকি মরতে হয়। যত লোক মরা দরকার, তত লোক এখনো মরেনি বলে ওনারা অপেক্ষা করছেন।’

‘লাখে ১৫ জন আক্রান্ত হলেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা যায়। এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ বিষয়টাতে কতটা সন্ত্রস্ত। সত্যি যদি বলো, আমি আমার জীবনে বাংলাদেশের মানুষকে কোনো একটা ব্যাপারে এত ভীত দেখিনি।’

‘আগুন সন্ত্রাসের সময়ও ভয় পেয়েছিল।’

‘ভয় পেয়েছিল। হলি আর্টিজানে হামলার পরও ভয় পেয়েছে। কিন্তু তার প্রতিটিতে মানুষ নিজের মতো করে একটা উপায় বের করে নিয়েছিল। মানুষের প্রবৃত্তি হলো যেকোনো বিপদে নিজের বাঁচার একটা পথ সে খুঁজে এবং যখন সেটা পেয়ে যায়, তখন আর আতঙ্ক তাঁকে গ্রাস করে না। আগুন সন্ত্রাসের সময় মানুষ মনে করল, আচ্ছা তাহলে এখন কিছুদিন আমি বাসে চড়ব না। ভয়াবহ বন্যা দেখে মানুষ ভাবে—আচ্ছা, আমি এই বন্যাপ্রবণ এলাকায় যাব না। ওগুলো তাই ভয়ংকর হয়েও সামগ্রিক ভীতি নয়। কিন্তু ডেঙ্গু? কোথায় যাবে! কিভাবে বাঁচবে। প্রত্যেক মানুষের দিন শুরু হয়, আজ হয়তো বেঁচে গেলাম কিন্তু কাল! এ দেশের মানুষকে এখন দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অথবা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ভীত।’

‘কিন্তু এখন তো সবাই বলছে নিজেই নিজের ঘর পরিষ্কার করতে। ডেঙ্গু মশা তো ঘরেই তৈরি হয়।’

‘মানুষ করছে। কিন্তু করেও সে নিশ্চিত হতে পারছে না। অসুখবিসুখ বা এ রকম ভাইরাসজনিত রোগকে তো আর ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যাবে না; কিন্তু মানুষ যখন দেখত তার অভিভাবক যাঁরা, তাঁরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তখন সে এক রকম ভরসা পেত। ধরো, আজকে যদি তোমার এলাকার কাউন্সিলর ১০০ লোক নিয়ে রাস্তায় নামতেন, আসতেন বাড়ি বাড়ি, সঙ্গে দু-একজন লার্ভা কিভাবে মারতে হয় সে রকম প্রশিক্ষিত লোক, তাহলেই ভরসাটা বেড়ে যেত।’

জাভেদ ভাইকে একটু খেপিয়ে দিতেই বলি, ‘কিন্তু সচেতনতামূলক কাজ তো ওঁরা করছেন...তারকাদের নিয়ে ঝাড়ু দেওয়া।’

‘দেখো তারকাদের দিয়ে মানুষকে সচেতন করা যায় কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমাদের দেশে তো গবেষণা হয় না, কিন্তু প্রথম বিশ্বে এ নিয়ে আলোচনা-পাল্টা আলোচনা আছে। আগে তারকাদের মানুষ খুব বেশি দেখতে পেত না, কোনো একটা অনুষ্ঠানে এলে তাই তাঁদের দেখার জন্য আগ্রহ তৈরি হতো। এখন ফেসবুক-ইউটিউবের যুগে তাঁরা এত বেশি সহজলভ্য যে তাঁদের আর সে রকম কোনো আবেদন নেই। আরেকটা অবাক ব্যাপার দেখো, বাচ্চাদের স্কুলটা পর্যন্ত বন্ধ করা হলো না। যেন এই কয়েক দিন স্কুলে গেলেই ওরা সব বিদ্যাসাগর হয়ে যাবে।’

‘কর্তারা তো বলেছেন, বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে—এ রকম কোনো নিশ্চিত তথ্য তাঁদের কাছে নেই?’

‘সেখানে গিয়ে যে আক্রান্ত হচ্ছে না, সেই তথ্যটাই বা তাঁরা নিশ্চিত হচ্ছেন কিভাবে? কে গবেষণা করলেন? মন্ত্রণালয়ের তল্পিবাহক কেউ? সত্যি বললে, রাজনৈতিক অনিয়ম ধামাচাপা দিতে দিতে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে অসুখবিসুখ নিয়েও সেই খেলাটাই খেলতে চাচ্ছেন তাঁরা। কে জানে, তলোয়ারকে সুঁই ভাবার ভুলটা হচ্ছে কি না!’

‘তাহলে কী এই এভাবেই চলবে...’

জাভেদ ভাই একটু ভেবে প্রসঙ্গটা বদলান, ‘খুব কিছু বদলানোর তো সুযোগ দেখি না। সেই অর্থে কোনো প্রতিষেধক নেই। দুই-তিন দশক ধরে মেডিক্যাল সায়েন্সও বোধ হয় সেভাবে এগোচ্ছে না। আসলে এখন সবাই আইটি মানে প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে ব্যস্ত। তাই এই ক্ষেত্রটায় যেভাবে পৃথিবী লাফিয়ে লাফিয়ে আগাচ্ছে, মানবিক প্রয়োজনের জায়গাগুলোতে সেভাবে নয়।’

জাভেদ ভাইকে একটু হতাশ দেখায়। বোধ হয় কথাটা ঠিক। অ্যাপ তৈরি হচ্ছে নানা রকম। অবিশ্বাস্য সব অগ্রগতি এই ক্ষেত্রে। জীবন সহজ আর আরামপ্রদ হচ্ছে; কিন্তু তাতে মজে গিয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদটা যেন কমে গেছে। তাই সামান্য মশার কাছে আমরা অসহায়।

লেখাটা সাধারণত একটা কৌতুক দিয়ে শেষ করি। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ে কৌতুক চলে না। কিন্তু কৌতুকের চেয়ে বড় কৌতুক যে দেখে ফেললাম।

সেদিন চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ একটা খবরে দেখি, ‘দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।’ মুখের কথা শুধু নয়; সরেজমিন প্রতিবেদন। হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। তারা সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। যারা আছে, তাদের কথাবার্তায়ও এমন ভাব—যেন ডেঙ্গু হওয়াটা বিরাট কৃতিত্বের ব্যাপার।

আশ্চর্য ব্যাপার! একটু আগে না শুনলাম পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। রোগী বাড়ছে। এক-দেড় ঘণ্টায় কী ম্যাজিক হয়ে গেল।

ম্যাজিকটা হলো, খবরটা বিটিভির। সব চ্যানেলে দেখায় বলে অন্য একটা চ্যানেলে দেখে ভুল করেছিলাম।

এর চেয়ে নির্মম রসিকতা শুনেছেন! বাংলাদেশে থাকেন। বেঁচে থাকেন। আরো অনেক দেখবেন।

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য