kalerkantho

কৃত্রিম সংকটের পেছনের কুশীলব

আবেদ খান

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



কৃত্রিম সংকটের পেছনের কুশীলব

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাক-মার্কিন চক্রান্তকারীরা বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তাকে তাদের ছক বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে তারা এই সিদ্ধান্তে স্থির হয় যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা ছাড়া তাঁকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করা সম্ভব নয়। আর এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চক্রান্তকারীরা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই নানা ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। বিশেষভাবে খাদ্য সংকট সৃষ্টির জন্য তারা সংঘবদ্ধভাবে চতুর্মুখী তৎপরতা শুরু করে। তাদের তৎপরতায় ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে তখন চালের অভাব ছিল। প্রলয়ংকরী বন্যা সেই অভাবকে নিশ্চিতভাবেই আরো বাড়িয়ে তুলেছিল। তা সত্ত্বেও অবস্থা বঙ্গবন্ধু সরকারের আয়ত্তের বাইরে চলে যেত না, যদি না বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের এজেন্টরা চক্রান্ত করত।

আমলাদের লবণ চক্রান্ত

সশস্ত্র যুদ্ধ কিংবা বিপ্লবের ভেতর দিয়ে যেসব দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেখানে পরাভূত সরকারের অফিসারদের নিজ নিজ দায়িত্বে বহাল রাখার নজির নেই। তাদের চোখে কোনো স্বাধীনতার স্বপ্ন থাকে না। থাকে না কোনো আদর্শবাদ। সুতরাং আমলাদের পুরনো দিনের অভিজ্ঞতা দেশ গঠনের কাজে মোটেই সহায়ক হয় না; বরং তাঁরা যদি অসৎ হন, বিশ্বাসঘাতক হন, তাহলে তাঁরা পদে পদে সরকারকে অপদস্থ করতে পারেন। বেইজ্জত করতে পারেন। অতি সহজেই তাঁরা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মহত্প্রাণ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সরকারের প্রতিটি দপ্তরে বহাল রেখেছিলেন পাকিস্তান সরকারের আমলাদের।

সেই তাঁদের একাংশ চক্রান্তকারীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সরকারের অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিলম্বিত করেন। ফলে সরকারের ভাবমূর্তি জনগণের কাছে কলঙ্কিত হয়। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯৭৪ সালের লবণ সংকট। ওই বছর প্রথম দিকে বাংলাদেশে লবণের ‘দুর্ভিক্ষ’ দেখা দেয়। প্রতি সের লবণের দর লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে একেবারে ৬০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। অথচ তখন চট্টগ্রাম বন্দরে প্রচুর লবণ জমা ছিল। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারলেন, রেল ওয়াগনের অভাবের অজুহাতে আমলারা চট্টগ্রাম থেকে লবণ আনতেন না, তাই লবণের দাম আকাশছোঁয়া। বঙ্গবন্ধু আমলাদের ওপর ভরসা না রেখে নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম থেকে লবণ আনার ব্যবস্থা করেন। তিনি ওই লবণ আনার জন্য রেলের সব ওয়াগন রিকুইজিশন করেন। চট্টগ্রামের গুদামজাত লবণ কয়েক দিনের মধ্যেই সারা দেশে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। ফলে লবণের দাম কমে যায়। কিন্তু এর আগেই যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। চক্রান্তকারীরা লবণের দুর্ভিক্ষকে তাদের কাজে লাগিয়ে নিয়েছে।

ফুড পলিটিকস এবং দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি

মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে পৃথিবীর সব মুক্তিপ্রাপ্ত দেশকে স্বাধীনতার গোড়ার দিকে ভুগতে হয়। রুশ বিপ্লবের পর ১৫-২০ বছর সে দেশের জনগণকে কঠিন দুঃখ-কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। ওই সময় সোভিয়েত রাশিয়ায় খাদ্যের অভাবে বহু লোকের প্রাণও গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীন, ভিয়েতনাম ও পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলোও একই অবস্থার শিকার হয়। একই ধরনের অসুবিধা ভোগ করে বিপ্লবোত্তর আলজেরিয়া, কিউবাসহ বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশেরও তা-ই হচ্ছিল।

কিন্তু কুচক্রীদের প্রচারণায় এ দেশের মানুষ ইতিহাস থেকে এই শিক্ষা নেয়নি। উপরন্তু চক্রান্তকারীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা চক্রান্তের অংশ হিসেবে এ দেশের মানুষের মনে এই ধারণা দেয় যে স্বাধীনতা হলো একটি আশ্চর্য জাদুর কাঠি, এর ছোঁয়ায় নিমেষেই মরুভূমিতেও দুধের নদী বয়ে যায়। নিমেষেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর হয়ে যায়।

হ্যাঁ, তা হয় বৈকি! কিন্তু নিমেষেই নয়। ধীরে ধীরে। সবাই মিলে দেশগঠনের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। বঙ্গবন্ধু সেই কাজটি শুরু করেছিলেন। আর বলেছিলেন, ‘গাছ বুনলেই ফল হয় না। ফল পেতে দেরি করতে হয়। বীজ থেকে গাছ, গাছ থেকেই ফল আসে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার বীজ বুনেছে। তা থেকে গাছও হয়েছে। তবে পাকা ফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে। আমি পাঁচ বছরের মধ্যে আপনাগোর কিছু দিবার পারুম না।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-হানাদাররা এ দেশের মানুষকে ‘ভাতে মারার’ জন্য ‘পোড়া মাটি নীতি’ অবলম্বনের মাধ্যমে মজুদ খাদ্যশস্য সব নষ্ট করে দেয়। অন্যদিকে যুদ্ধ চলাকালে অনেক কৃষক জমি চাষ করতে পারেনি। ফলে ফসল হয়নি। বাংলাদেশ তখন এমনিই খাদ্যে স্বনির্ভর ছিল না। ঘাটতি পূরণের জন্য তখন প্রতিবছর বিদেশ থেকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন খাদ্য আমদানি করতে হয়। এর ওপর পাকিস্তান সরকারের ‘পোড়া মাটি নীতি’ ও নতুন ফসল উৎপাদনে বাধা দেশের খাদ্য পরিস্থিতিকে শোচনীয় করে তোলে।

সেই সময় যেসব বিদেশি সাংবাদিক বাংলাদেশে এসেছিলেন, তাঁদের আশঙ্কা ছিল, খাদ্যাভাবে বাংলাদেশে অন্তত এক কোটি লোক মারা যাবে। স্বাধীনতার পর প্রথম দুই বছর অর্থাৎ ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার কোনো রকমে সামাল দেয়। এ ক্ষেত্রে তখন প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারত অনেকখানি সহায়তা করেছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালে খাদ্য সংকট আরো বাড়ে এবং ভারতেও তখন খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তাই ভারত থেকে বাড়তি কোনো সাহায্য আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। উপরন্তু দেশে আঘাত হানে ভয়াবহ বন্যা। দেশের একটি বিরাট অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে সরকার দিশাহারা হয়ে যায়। অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আর চক্রান্তকারীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ করতে নানামুখী তৎপরতা শুরু করে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যে খাদ্য খরিদ করেছিল, সেগুলো সময়মতো যাতে জনগণের হাতে এসে পৌঁছতে না পারে সে জন্য তারা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ফলে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। তারই অনিবার্য পরিণতি দুর্ভিক্ষ। বঙ্গবন্ধু ওই সময় একাধিক ভাষণে এসব অভিযোগ করেন। অভিযোগের স্বীকৃতি মিলেছে এমা রথচাইল্ডের এক প্রবন্ধে। কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনসের (নিউ ইয়র্ক) পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ পত্রিকায় এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি সংখ্যায়।

এমা রথচাইল্ড ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের জন্য সরাসরি মার্কিন সরকারকেই দায়ী করেন। প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘ফুড পলিটিকস’ বা ‘খাদ্য-রাজনীতি’। সেখানে রথচাইল্ড লিখেছেন, ‘সম্প্রতি খাদ্যই শক্তি নামক একটি তত্ত্ব চালু হয়েছে।...এই তত্ত্ব অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় খাদ্য উৎপাদক ও খাদ্য রপ্তানিকারী দেশ। ...উন্নয়নশীল দেশসমূহ অতিদরিদ্র দেশ থেকে তেলের বাদশাহ আরব রাষ্ট্রগুলোও সেখান থেকে খাদ্য আমদানি করে...।’

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে ওই প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক বাজার থেকে মার্কিন খাদ্য খরিদ করে। কিন্তু আমেরিকার খাদ্যনীতির দরুনই ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ। ১৯৭৪ সালের গোড়ায় বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য খরিদ করার জন্য কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে। তখনকার বাজারদর অনুযায়ী খাদ্যের দাম ছিল অত্যন্ত চড়া। কথা ছিল বাংলাদেশ ওই খাদ্যশস্য ধারে পাবে। তবে সেই ধার হবে স্বল্পমেয়াদি।

১৯৭৪ সালে গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশে বিদেশি মুদ্রার দারুণ অভাব দেখা দেয়। মার্কিন সরকারের কাছ থেকে যে ঋণ পাওয়ার কথা ছিল, মার্কিন সরকার সেই ঋণ দেওয়া তখন স্থগিত করে। তাই শরৎকালে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানির জন্য যে দুটি মার্কিন খাদ্য-ব্যবসায়ী সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তি বাতিল করে দেয়।

অন্যদিকে আমেরিকার পিএল-৪৮০ কার্যসূচি অনুযায়ী বাংলাদেশে খাদ্য সাহায্য পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ওই বছরই কিউবার কাছে পাট বিক্রি করায় আমেরিকা ক্ষিপ্ত হয়ে বাংলাদেশে খাদ্য-সাহায্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। পরে অবশ্য মার্কিন অফিসাররা গোপনে অনেক পরামর্শ করে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে খাদ্য পাঠান। তত দিনে দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা যে নানা উপায়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্য কেনেন এবং সেগুলো নষ্ট করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন, এর প্রমাণ সাংবাদিক পরেশ সাহার বইয়েও উল্লেখ আছে। পরেশ সাহার ভাষায়, ‘১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর আমি বাংলাদেশে যাই। তখন ঢাকার অন্তর্গত সাভার বন্দরের জনৈক ব্যবসায়ী আমাকে জানান, তিনি কটি বিদেশি সংস্থাকে চাল সরবরাহ করতেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, ওই সংগৃহীত চাল বাংলাদেশের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য বিতরণ করা হবে। কিন্তু তিনি জানতে পেরেছেন, ওই চাল দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়নি, বাংলাদেশের খাদ্য সংকট আরো শোচনীয় করার জন্য ওই সব চাল সুন্দরবনের নদীগর্ভে ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, গোপন সূত্র থেকে ওই খবর পাওয়ার পর তিনি বিদেশি সংস্থাকে চাল সরবরাহ বন্ধ করে দেন।’

একদিকে আমেরিকা বাংলাদেশের ক্ষুধার অন্ন নিয়ে রাজনীতি করেছে, জনগণের কাছে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারকে হেয় করার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্য সাহায্য পাঠায়নি; অন্যদিকে কয়েকটি মার্কিন সেবাব্রতী সংস্থা (গুপ্তচর সংস্থা?) বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল কিনে সেগুলো নষ্ট করে দিয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্য-সংকট সেই সময় তাই আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে বঙ্গবন্ধু মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েন। এখানে সাংবাদিক পরেশ সাহার ‘মুজিব হত্যার তদন্ত’ বই থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি : ‘১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় শেখ মুজিব কোনো রাতেই ঘুমাতে পারেননি। সারা রাত তিনি তাঁর বাসভবনের বারান্দায় পায়চারি করেছেন। খাদ্যমন্ত্রী মোমিন সাহেবকে ডেকে বলেছেন, কিছুই লুকিয়ো না। না খেতে পেয়ে আমার বাংলার কত লোক মরছে, তার সত্য হিসাব জাতীয় সংসদে পেশ করো। দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে সফর করতে গিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি কেঁদেছেন আর কেঁদেছেন।’ (পৃষ্ঠা-৬৫)

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা