kalerkantho

ভিআইপি বিড়ম্বনা পুরনো প্রথা

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভিআইপি বিড়ম্বনা পুরনো প্রথা

এ দেশে একটির পর একটি অঘটন এত ঘটে যে আজ যে ঘটনা বলব তা ‘সবচেয়ে বড় মর্মান্তিক ঘটনা’—দেখা যাবে দুদিন পর লেখা প্রকাশ পেতে পেতে এই শব্দটি যেন তামাদি হয়ে গেছে। এর চেয়ে মারাত্মক ঘটনা যোগ হয়ে আগের শব্দগুচ্ছকে দুর্বল করে দিয়েছে। না হলে ২৫ জুলাই কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে যে মর্মান্তিক, অমানবিক ঘটনার সূত্রপাত হলো, আর এর জেরে অ্যাম্বুল্যান্সে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা কিশোরটি বেঘোরে মৃত্যুবরণ করল, একে হালকাভাবে দেখার উপায় কোথায়! কিন্তু গত সপ্তাহে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একজন দায়িত্বশীল আমলার বক্তব্য পড়ে মনে হলো তিতাসের মৃত্যু সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হয়তো নয়! কিন্তু এমন বক্তব্য কিশোরটির মৃত্যুর কারণকে হালকা করে ফেলার প্রয়াস নয় তো! ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সুতরাং এই ঘটনায় কার দোষ, আর কার দোষ নয়—এসব আলোচনার অবকাশ নেই।

মানুষ যদি বিবেকবান হয় এবং কোনো অমানবিক ঘটনার কষ্ট যদি তার মরমে স্পর্শ করে তবে একে মর্মান্তিক বলেই চিহ্নিত করা যাবে। কিন্তু সবাই কি বিবেক নিয়ে চলেন? বলা হয় বানর এবং কাক নিজেদের বিপদে একতাবদ্ধ হয়। একটি বানরকে হত্যা করলে শত শত বানর এসে ঘিরে ফেলে। কাকের বেলায়ও তাই। এ দেশে আমলাদের ঐক্যও বোধ হয় একই রকম। না হলে ৩১ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটের ঘটনায় তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করতে একজন মাঝারি আমলা অমন কুিসত যুক্তির অবতারণা করবেন কেন! যেহেতু একজন যুগ্ম সচিবের কারণে ফেরি বিলম্বের কথা উঠেছে, তাই তাঁকে আড়াল করতে তাঁর সমপদমর্যাদার একজন সহকর্মী প্রশ্ন তুলেছেন—‘কিশোর তিতাসকে কে মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি দিয়েছে? ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোরের ড্রাইভিং লাইসেন্সও থাকার সুযোগ নেই। তদন্তে এসব বিষয়ও বের হয়ে আসা উচিত।’ আমি পড়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। তদন্ত হচ্ছে ফেরিঘাটে অযাচিত বিলম্বের কারণে একজন আহত কিশোরের মৃত্যু নিয়ে। আমাদের প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ববান কর্মকর্তা হতভাগ্য তিতাসের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনের বদলে বেআইনি মোটরসাইকেল চালানোর অপরাধে কিশোর তিতাসকে মরণোত্তর শাস্তি দিতে চান। এখন তো দেখছি সড়ক পার হতে গিয়ে বাসচাপায় পথচারী মারা গেলে তিনি কেন ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করেননি, এই অপরাধে তাদেরও মরণোত্তর শাস্তির দাবি উঠবে!

আমাদের ফেরিঘাটগুলোতে ভিআইপি বিড়ম্বনায় সাধারণ যাত্রী হয়রানি নতুন কিছু নয়। মানুষ এখন এসব নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছে। সুবিধাভোগী ও সুবিধাপ্রত্যাশী দাপুটে আমলাই শুধু নন, রাজনৈতিক নেতারাও একইভাবে বিড়ম্বনা তৈরি করেন। গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর জননেতাদের হওয়ার কথা জনকল্যাণকামী, কিন্তু এ দেশের জননেতারা, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন জননেতারা সরকারি বড় বড় পদ-পদবিতে থাকলে জনবিচ্ছিন্ন হতে পছন্দ করেন। নিজেদের ভিআইপি হিসেবে চিহ্নিত করে একমাত্র ভোট প্রার্থনার সময়টুকু ছাড়া বাকি সময় সাধারণ জনগণকে অতি সাধারণ বিবেচনা করে অস্পৃশ্য ভাবতে থাকেন। মানুষের কষ্ট তাঁদের ছুুঁয়ে যায় না। ভিআইপি হিসেবে নিজেদের অধিকারকেই সুরক্ষা করেন।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ঈদুল ফিতরের কয়েক দিন পর শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় ফিরব। ফেরি ছাড়বে সকাল ১০টায়। আমরা সাড়ে ৮টার মধ্যে ঘাটে পৌঁছলাম। ঈদফেরত গাড়ির ভারি চাপ। কাঁঠালবাড়ী ঘাটে সোজাসুজি ফেরিতে ওঠার রাস্তায় অনেক ট্রাক সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাটের তদারকিতে যারা আছে তারা আমাদের প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসগুলো বাঁ দিকের বিকল্প পথে নামিয়ে দিল। সাড়ে ৯টার মধ্যে মাওয়া ঘাট থেকে ‘কেতকি’ ফেরিটি চলে এলো। আনলোড করার পর এখন আমাদের গাড়ি ফেরিতে ওঠার পালা। ১৪তম সিরিয়ালে আমার গাড়ি। হিসাব করে দেখলাম অনায়াসে আমরা ফেরিতে উঠতে পারব। কিন্তু দ্রুতই সে আশা নির্বাপিত হতে লাগল। প্রথম দিকের চার-পাঁচটি গাড়ি যাওয়ার পর আমাদের থামিয়ে দেওয়া হলো। যে সোজা পথে আমাদের গাড়ি আসতে মানা ছিল সে পথেই নবাগত অনেক কার, মাইক্রোবাস ও বাস তরতর করে ফেরিতে উঠে ফেরি পূর্ণ করে দিল। আর তার জন্য ইজারাদারসহ একটি সিন্ডিকেট প্রকাশ্যেই টাকা লেনদেন করল। পাশের টং দোকানে বসে চা খেতে খেতে একজন মাঝবয়সী স্থানীয় ভদ্রলোক বললেন, এগুলো স্বাভাবিক। গাড়ির চাপ থাকলে এমন দুই নম্বরি প্রকাশ্যেই হয়। আমাদের হতাশার নদীতে ফেলে দিয়ে ছেড়ে দিল ফেরি।

এর পরের ফেরি দুপুর ২টায়। অর্থাৎ ৮টায় এসে ২টা পর্যন্ত পদ্মার ঢেউ গুনতে হবে। এর মধ্যে ফেরিঘাটের একজন আশার কথা শোনালেন। বললেন, এমন গাড়ির চাপ থাকলে মাঝেমধ্যে বিশেষ ফেরি দেওয়া হয়। কপাল ভালো থাকলে এর মধ্যে একটি ফেরি পেয়েও যেতে পারেন।...কপাল বোধ হয় খুলল। দেখলাম ‘ফরিদপুর’ নামের সেই ফেরিটি আসছে ঘাটের দিকে। আমাদের উদ্ধার করতেই বোধ হয় মাওয়া থেকে একেবারে খালি এসেছে। কিন্তু ফেরিটি আমাদের ঘাটে না ভিড়ে কয়েক শ গজ দূরে আরেকটি ঘাটের পন্টুনে গিয়ে ভিড়ল। ঘাটসংশ্লিষ্ট একজন বললেন, এটি এসেছে ভিআইপি নেওয়ার জন্য। ডেপুটি স্পিকার মহোদয় ফিরবেন। তিনি রাজি থাকলে আপনারাও যেতে পারবেন। কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছি বলে মনটা হালকা লাগল। জননেতা নিশ্চয়ই মানুষের কষ্ট বুঝবেন। আমরা প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। ঘাটের ভদ্রলোক বললেন, স্পিকার সাহেব ওঠার পর ফেরি এই ঘাটে ভিড়বে। তখন আপনারা উঠতে পারবেন।

আধা ঘণ্টা পর খবর এলো স্পিকার সাহেব মত পাল্টেছেন। এখনই ফিরবেন না। মধ্যাহ্ন ভোজের পর ফিরবেন। আমরা বললাম, তাহলে এই ফেরিটি একবার মাওয়া ঘুরে আসতে পারে। তাতে আটকে পড়া মানুষের অনেক উপকার হবে। ভিআইপিও যথাসময়ে ফিরতে পারবেন। আমার কথা শুনে স্বয়ংক্রিয় উত্তর এলো, ‘ফেরিটি ভিআইপিদের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য নয়।’ এদিকে ফেরির আশায় বসে থাকা যাত্রীদের অবস্থা করুণ। গত দুদিন থেকে থেকে বৃষ্টি হওয়ার পর এ দিনটিতে ছিল মেঘভাঙা রোদ। কঠিন গরমে পদ্মার পারে মানুষের ত্রাহি অবস্থা। মাইক্রোবাসে শিশুদের কান্না।

এবার বছর দুই আগের কথা। শরীয়তপুর যাব। আমার সঙ্গে গাড়িতে ব্যবসায়ী বন্ধু আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলেন। প্রথম ফেরি ধরতে সময়ের আগেই চলে এসেছি। ঘাটে ফেরিও প্রস্তুত। কিন্তু উঠতে মানা। কারণ ভিআইপি পথে আছেন। তিনি উঠলে পরে অন্য গাড়ি উঠবে। আমার করিতকর্মা বন্ধু নেমে ঘাটের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বললেন। জানলেন একজন যুগ্ম সচিব আসবেন। বন্ধুটি আমার পরিচয়টি জানালেন। বন্ধুটি জানেন না এসব পানসে পরিচয়ের মূল্য নেই এখানে। বন্ধুটি মনে করেন এরা বেতন স্কেল দিয়ে নাকি ভিআইপির গুরুত্ব বিচার করে। তাকে জানালেন এই অধ্যাপক ১ নম্বর গ্রেডে বেতন পান। আপনাদের যুগ্ম সচিবের অনেক ওপরে। কিন্তু কোনো ভাবান্তর হলো না। আমাদের অপেক্ষা করতে হয় ভিআইপি মহোদয়ের শুভাগমন পর্যন্ত।

এই প্রসঙ্গে আমার এক প্রাক্তন ছাত্র তার অভিজ্ঞতা বলেছিল। ওর বাবার বন্ধু একজন উচ্চপদের আমলা। ওরা মাওয়া ফেরিঘাটের আধা ঘণ্টা দূরত্বে আছে। প্রথম ফেরি ছেড়ে যাওয়ার সময় এখন। বাবা ফোন করলেন আমলা বন্ধুটিকে। কোনো উপায় বের করা যায় কি না। আমলা জানালেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই। আমি বলে দিচ্ছি। তোমরা যাওয়ার পরই ফেরি ছাড়বে। আর তোমাদের গাড়ির জন্য একটি জায়গা ফাঁকা রাখতে বলব।’ ছাত্রটি জানাল, বাবার বন্ধুর কল্যাণে কিছুক্ষণের জন্য তারাও সেদিন ভিআইপি হয়ে পড়েছিল।

আমরা আমাদের আমলা ও নেতা ভিআইপিদের দেখে বিস্মিত হই। জনগণের কর্মচারী ও নেতা হয়েও তাঁরা জনগণের সঙ্গে চলেন না। ফেরিঘাটের এই জনদুর্ভোগের সময়ও তাঁদের সেবার জন্য রাষ্ট্রের বহু সহস্র টাকার জ্বালানি পুড়ে মাওয়া ঘাট থেকে খালি ফেরি এসে অপেক্ষা করে। সাধারণ মানুষের টাকায় এসব বিশেষ ফেরি চলে, আর বিপদে পড়া সাধারণ মানুষ অসহায় দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। সম্প্রতি মহামান্য আদালত জানালেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সবাই রাষ্ট্রের সেবক। ভিআইপি নন। তাহলে এসব নেতা আর আমলা অবৈধভাবে ভিআইপি সুবিধা ভোগ করতেন আর দাপট দেখাতেন?

 

বছর কয়েক আগে একটি টিভি টক শো দেখছিলাম। বিএনপির সংসদ সদস্যরা তখন প্রায়ই সংসদ বর্জন করছিলেন। বিএনপির এক মাঝারি নেতাকে প্রশ্ন করা হলো, ‘আপনারা যে সংসদ সদস্য হিসেবে সব সুবিধা নিচ্ছেন—অথচ সংসদে গিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন না, এতে আপনাদের খারাপ লাগে না?’ মাননীয় সংসদ সদস্য বিব্রত না হয়ে সপ্রতিভ উত্তর দিলেন—‘এসব সুবিধা সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের প্রিভিলেজ। অর্থাৎ আমাদের জন্য নির্ধারিত সুবিধা।’ বুঝলাম এসব মাননীয়রা জনগণের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য না বুঝলেও নিজেদের প্রিভিলেজটা ঠিক বোঝেন। এভাবে আমরা সাধারণরা সংসদ সদস্যদের প্রিভিলেজ ও ভিআইপিদের অধিকার জোগান দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছি এবং ঘাম ঝরাচ্ছি রাজধানীর জ্যামে আটকে থেকে বা পদ্মা পারে রোদে পুড়ে। আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের বসতি যেসব রাজনৈতিক দলে সেসব দল যদি মানবিক হতে পারে, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারে এবং আমলাদের প্রতি সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে, তবে সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন হবে এ দেশে। নয়তো বারবার অমানিশায় পথ হারাবে গণতন্ত্র।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা