kalerkantho

হিরোশিমার সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি

চিন্ময় মুত্সুদ্দী

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হিরোশিমার সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি

৭৪ বছর আগের ঘটনা। এখনো তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা বলছিলেন ৮২ বছর বয়সী হাদা সোয়েকো, ‘তিন বোনকে বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে রেখে কোনো মতে বেরিয়ে আসি। চারদিকে ভয়ংকর অন্ধকার। মা-বাবার দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি। তিন বোন পুড়ে অঙ্গার হলো। আমার ঘাড়ে গভীর ক্ষত। সেই ক্ষত এখনো বয়ে চলেছি।’ হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের লেকচার রুমে তিনি আমাদের কাছে ৬ আগস্ট ১৯৪৫ সালের সকালটার স্মৃতি বর্ণনা করছিলেন।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে আমরা টোকিও থেকে হিরোশিমায় এসে পৌঁছাই। আমি ছাড়া আমার স্ত্রী অনামিকা মুত্সুদ্দী ও চট্টগ্রামের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ভাগ্যধন বড়ুয়া। জাপানের রিসসো কোসেই কাইয়ের আমন্ত্রণে সফরের একপর্যায়ে তাঁরা হিরোশিমা ভ্রমণের ব্যবস্থা করেন। এপ্রিলের এক স্নিগ্ধ দুপুর আর মনোরম সকালে হিরোশিমার রাস্তায়, শপিং মলে ও রেস্তোরাঁয় সেখানকার মানুষের ব্যস্ত আনাগোনা দেখে হয়তো বোঝা যাবে না এই শহর আর তার মানুষজন সেদিন সকালে কিভাবে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছিল। এর তিন দিন পর একই ঘটনা ঘটে নাগাসাকিতে। এ বিভীষিকার কথা সারা জাপানের মানুষ মনে রেখেছে।

প্রতিবছরের মতো এবারও একই কায়দায় স্মরণ করা হবে অ্যাটম বোমার আগুনে আর বিকিরণ বা রেডিয়েশনে নিহত চার লাখ ৬০ হাজার মানুষকে। সুস্থতা কামনা করা হবে আহত এক লাখ ৮০ হাজার মানুষের মধ্যে যারা বেঁচে আছে তাদের জন্য। আর প্রত্যাশায় থাকবে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত পৃথিবী গড়ার। হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কে সমবেত জনতা সকাল ঠিক ৮টা ১৫ মিনিটে নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে স্মরণ করবে ইউরেনিয়াম-কোর অ্যাটম বোমায় নিহতদের। জনতার অংশ হয়ে থাকবে বোমায় আহত অনেকেই, যারা হিবাকুশা নামে পরিচিত। আর থাকবে বোমায় নিহতদের স্বজনরা।

লিটলবয় নামের প্রথম বোমাটি পড়ে হিরোশিমায়। তিন দিন পর ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে ফেলা বোমাটির নাম ছিল ফ্যাট ম্যান। এরই মধ্যে মার্কিন প্রশাসন নিশ্চিত হয় যে জাপানিদের নতুন করে ব্যাপক আক্রমণ করার ক্ষমতা আর নেই। পর্দার অন্তরালে তাদের শর্তহীন আত্মসমর্পণের দূতিয়ালি করছিল কেউ কেউ। তার পরও ঠিক এই সময়ে পরমাণু বোমার আক্রমণ কেন? পরমাণু বোমা আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বে মার্কিন প্রভাব দৃঢ় করা। এটা করে আসলে জানানো হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দ্য ম্যানহাটান প্রজেক্ট থেকে প্রত্যাশিত ফলাফল লাভ করেছে এবং বিশ্বকে তা দেখাতে তারা আগ্রহী। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে টক্করে যেতে চায় এমন রাষ্ট্রগুলোকে আগাম সতর্ক করে দিয়ে নিজেদের সামরিক শক্তির ওজনটাও বুঝিয়ে দেওয়া হলো। আর নাগাসাকিতে বোমা ফেলে বোঝানো হলো, এই মারণাস্ত্র তাদের ভাণ্ডারে আরো মজুদ রয়েছে। এর প্রায় ২০ বছর পর ভিয়েতনামে নাপাম বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র আবার পৃথিবীকে জানিয়ে দেয় পৃথিবী ধ্বংসের মারণাস্ত্র তৈরির গবেষণায় তারা থেমে নেই।     

পারমাণবিক বোমার ধ্বংসাবশেষ থেকে গত ৭৪ বছরে নিষ্ঠা, একাগ্রতা, সততা আর সময়ানুবর্তিতা দিয়ে জাপানিরা বিশ্বে অর্থনৈতিক জায়ান্ট হয়েছে। অ্যাটম বোমা আক্রমণে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া হিরোশিমা আর নাগাসাকি আবার গড়ে তোলা হয়েছে পরিকল্পিত পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে। ধ্বংসাবশেষের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে কিছু হিরোশিমা স্মৃতি জাদুঘরে, কিছু শান্তি উদ্যানে (পিস পার্ক) আর কিছু প্রকাশ্যে রাজপথের ধারে। এ ঘটনা এখনো তাদের তাড়িত করে। কিন্তু কোনো সশব্দ প্রকাশ নেই। পরাজয়ের গ্লানি তাদের হীনম্মন্য করেনি। ক্ষমা প্রার্থনা আর বিনয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্বল করে বিশ্ববাসীর কাছে প্রশংসা আর শ্রদ্ধা অর্জন করেছে।

জাতি হিসেবে জাপানিরা নিজেদের যতটা না এশীয় ভাবে, তার চেয়ে বেশি উন্নত বিশ্বের অংশ মনে করে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক সাহায্য ও সহযোগিতা দিচ্ছে উদার হাতে। একই সঙ্গে ব্যবসায় মনোযোগী পুরোদমে। ইলেকট্রনিকসে তারা ইউরোপকে টেক্কা দিয়েছে বহু আগে। বিশ্বব্যাপী গাড়ির বাজারে তারা এখনো শীর্ষে। কলকারখানার যন্ত্রপাতি নির্মাণেও একসময় তারা ছিল শীর্ষে।

হিরোশিমা স্টেশনে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন মিজ আইকো হাতানো ও মিজ মিতুওকা। সফরের পুরোটা সময় তাঁরা আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁরা হিরোশিমা রিলিজিয়াস কো-অপারেশন অ্যান্ড পিস সেন্টারের কর্মকর্তা। একই সঙ্গে রিসসো কোসেই কাইয়ের সদস্য। স্টেশনসংলগ্ন এলাকা দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়। রাস্তায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই, সমান্তরাল পথে হেঁটে বাঁ দিকে বিশাল হোটেল গ্রেনভিয়া আর সামনে ঝকঝকে দোকানপাট, আর একটার পর একটা রেস্টুরেন্ট। স্বল্প সময়ের সফর। তাই রুম পর্যন্ত না উঠে গ্রেনভিয়া হোটেলের  লাগেজ রুমে ব্যাগ রেখে প্রথমেই গেলাম পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে। এখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন মিজ চিকাগে ওমোতো। জাদুঘরে ঢুকে বাঁ দিকে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি কাঠামোর ওপর একটি ঘড়ি। ঘড়িটি আপনাকে বর্তমান সময় বলছে না। এটি স্থির হয়ে আছে একটি বিশেষ সময়ে। সকাল ৮টা ১৫। ঘড়িটি ৭৪ বছর আগের  সেই দিনটিতে নিয়ে যায় জাদুঘরের দর্শকদের, যেই সময়টিতে এক ঘৃণ্যতম ঘটনার শিকার হয়েছিল পৃথিবীর নিরপরাধ একটি জনগোষ্ঠী। স্থিরচিত্র আর ভিডিওর সংমিশ্রণে এক অসামান্য উপস্থাপনায় এ জাদুঘরে দেখা যাচ্ছে, জানা যাচ্ছে প্রথম ও দ্বিতীয় অ্যাটম বোমার নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণ। একটি কর্নারে নিহতদের ব্যবহৃত কয়েকটি দ্রব্য রয়েছে। সেদিন তাদের শরীরে থাকা পুড়ে যাওয়া পোশাক, জুতো, টুপি, চশমা। এক দিনে পুরো জাদুঘর দেখে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের সময় তো সংক্ষিপ্ত। তাই লাফিয়ে লাফিয়ে দেখতে হচ্ছে। অর্থাৎ কিছু কিছু বাদ দিয়ে দেখা। আমাদের সঙ্গে রয়েছেন মিজ চিকাগে ওমোতো। কিছু প্রশ্নের জবাবে ইংরেজিতে বুঝিয়ে বলছেন মিজ মিতুওকা।

পিস মেমোরিয়াল পার্ক আরেকটি শ্রদ্ধার প্রতীক। এখানেই আছে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শিখা অনির্বাণ আর স্মৃতিসৌধ। প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি মানুষ এখানে ভিড় করে। ঘুরে ঘুরে দেখে। শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পরিচ্ছন্ন নান্দনিক একটা পরিবেশ। মনটা এক নিমেষেই পবিত্র হয়ে ওঠে। এই পার্ক যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে সেখানেই হাজার হাজার মানুষ মরে পড়ে ছিল। তাদের মাটিচাপা দেওয়া হয় সেখানেই। আমরা শিখা অনির্বাণ আর স্মৃতিবেদিতে ফুল দিয়ে আমাদের শ্রদ্ধা জানালাম।

হিরোশিমা নাগাসাকির ঘটনা শুধু মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। যেভাবে মানুষ মারা গেছে, আর যারা আহত হয়ে বেঁচে আছে, তাদের জীবনের গল্প আমাদের সামনে বারবার অ্যাটম বোমা কী যাতনা বয়ে এনেছে সে চিত্রটাই তুলে ধরে। দুর্ভোগ আর বেদনার এক মহাকাব্য যেন সেই স্মৃতি। মানুষের দুর্ভাগ্যের ইতিহাসে এতটা বেদনা, এতটা বিপর্যয় খুঁজে পাওয়া কঠিন। সময়ের বিবর্তনে হিবাকুশার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বোমায় আহত হয়ে বেঁচে যায় যারা তাদের বলা হয় হিবাকুশা। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে বসবাসরত পরমাণু বোমায় আহতরা এখন জীবনের শেষ সীমায় এসে গেছে। একদিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলার জন্য কেউ থাকবে না। সেটাই বাস্তবতা। তাই এই দুই শহরের কর্তৃপক্ষ একটি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে হিবাকুশাদের মতো করে যেন তারা সেসব দিনের ঘটনা বলতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে একই মহিমায় হিরোশিমা-নাগাসাকির বাণী জাপান ও বিশ্বের কাছে যথার্থভাবেই পৌঁছে দেওয়া যায়। আর মানুষের মনে সেই স্মৃতি জাগরূক থাকে।

জাদুঘর থেকে গন্তব্য পাশেই বোমায় নিহত-আহতদের স্মরণে তৈরি পিস মেমোরিয়াল হল। এখানেই একটি লেকচার রুমে আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন হাদা সুয়েকো। ৮২ বছরের হাদা আমাদের হাসিমুখে স্বাগত জানালেন, কিন্তু নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে সেদিনের স্মৃতিচারণা তাঁকে বেদনার্ত করে তুলল। একপর্যায়ে বোন, মা-বাবা আর খেলার সাথিদের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হাদা বাকরুদ্ধ হয়ে ওঠেন।  

আট বছরের শিশু হাদা সেদিন বুঝতে পারেননি কেন এমনটা হলো। এখনো হিসাব মেলাতে পারেন না। ধ্বংসস্তূপে ছেড়ে আসা তিন বোন হিসাকো, শিনোবু আর ফুজিকোর স্মৃতি তাঁকে এখনো কাঁদায়। সকালবেলা পৃথিবী এতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে পারে সেটা ছিল তাঁর ভাবনার অতীত। প্রায়ই মনে একটি প্রশ্ন জাগে, মানুষ কেন এত নিষ্ঠুর হয়? হাদার শেষ কথা ছিল, ‘যুদ্ধ নিষ্ঠুর ও বোকামি। জীবন মহামূল্যবান।’ যত দিন বেঁচে থাকবেন এ বার্তা তিনি দিয়ে যাবেন নিয়মিত।

লেখক : সাংবাদিক, মিডিয়া বিশ্লেষক

মন্তব্য