kalerkantho

বন্ধুত্বের সম্পর্ক পারে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে

মিল্টন বিশ্বাস

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বন্ধুত্বের সম্পর্ক পারে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে

প্রাচীন মহাকাব্য ‘ইলিয়াডে’ মাইসিনির রাজা ও গ্রিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আগামেননের বন্ধু ও বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা ছিলেন নেলেউসের পুত্র ও পাইলসের রাজা নেস্টর। যিনি ট্রয় যুদ্ধে গ্রিক বীর অ্যাকিলিসের সঙ্গে আগামেননের দ্বন্দ্ব ও ক্রোধ প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন প্রকৃত বন্ধুর মতো। অন্যদিকে টেলেমেকাসের পিতার ভালো বন্ধুর কথা আরেক মহাকাব্য ‘ওদিসি’তে পাওয়া যায়। ট্রয় যুদ্ধ শেষে প্রত্যাবর্তনকালে নিরুদ্দিষ্ট ইথাকার সম্রাট ওদিসিউসের স্ত্রী পেনিলোপি একদল পাণিপ্রার্থীর দ্বারা সর্বদা বিব্রত হওয়ায় সেই অসহনীয় পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে পুত্র টেলেমেকাস পিতার সন্ধানে সমুদ্রযাত্রা করে। কিন্তু দেবী অ্যাথিনির কৃপায় সে জানতে পারে, তার মাতার পাণিপ্রার্থীরা তাকে হত্যার চক্রান্ত করেছে। সে লুকিয়ে স্বদেশে ফিরে আসে এবং পিতার বিশ্বস্ত বন্ধু ইউমেউসের ঘরে আশ্রয় নেয়। পরে পিতৃবন্ধুর সহায়তায় তার মাকে ব্রিবতকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারে সচেষ্ট হয়। অর্থাৎ আদি মহাকাব্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বন্ধু হচ্ছে সুপরামর্শদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মঙ্গলকারী। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে গোত্রভিত্তিক আরবে গোত্রীয় রীতিনীতিতে এই রকম প্রথা ছিল যে, গোত্রের চরম শত্রুকে যদি তাদের গোত্রের কোনো ব্যক্তি জীবন রক্ষায় নিরাপত্তা দান করত, তাহলে ওই গোত্রের কেউ-ই সেই শত্রুকে হত্যা বা অত্যাচার করতে পারত না। ফলে তাকে বন্ধু হিসেবে গণ্য করা হতো। ঈশপের গল্পে আমরা পেয়েছি, ‘বিপদেই বন্ধুর পরিচয়।’ তার দুই বন্ধুর গল্প থেকে আমরা প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয় পাই। ভালুকের ভয়ে এক বন্ধু নিজ জীবন রক্ষায় অন্য বন্ধুকে নিচে রেখে গাছে আরোহণ করে। বুদ্ধির জোরে নিচের বন্ধুটি বেঁচে গেলেও এখানে প্রকৃত বন্ধু কে হতে পারে সেই পরিচয় স্পষ্ট করে বিবৃত হয়েছে। সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়, অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়—এই যখন বাস্তবতা তখন ‘বিশ্ব বন্ধু দিবস’-এর আলাদা তাৎপর্য আছে নিঃসন্দেহে।

২.

চলতি বছরের আগস্টের প্রথম রবিবার অর্থাৎ ৪ তারিখ ‘বিশ্ব বন্ধু দিবস’। বন্ধু দিবসের ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু। ১৯৩৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস ঘোষণা করে যে আগস্ট মাসের প্রতি প্রথম রবিবার বন্ধু দিবস হিসেবে পালিত হবে। সেই থেকে সেখানে বন্ধু দিবস জাতীয়ভাবে উদ্যাপিত হচ্ছে। তবে শিগগিরই এটি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবসে রূপলাভ করে। বন্ধু দিবস বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন তারিখে পালন করা হয়। বলা হয়ে থাকে, ১৯১৮ সালে শেষ হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, হত্যাযজ্ঞ ও হিংস্রতা মানুষের মধ্যে অনেকটাই বন্ধুর অভাব তৈরি করেছিল। ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বন্ধু দিবস নির্ধারিত হয়েছিল সেই পরিস্থিতি অতিক্রমের প্রত্যাশায়। ইন্টারনেট সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক ব্যক্তি নিহত হন। দিনটি ছিল আগস্টের প্রথম শনিবার। বন্ধু বিয়োগের ঘটনায় আঘাত সহ্য করতে না পেরে সেই ব্যক্তির এক বন্ধু আত্মহত্যা করেন। বন্ধুর জন্য বন্ধুর এ আত্মত্যাগের ঘটনায় সেই সময় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক উত্তেজনা। ওই বছরই মার্কিন কংগ্রেস বন্ধুত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে আগস্টের প্রথম রবিবারকে বন্ধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবেও নির্ধারণ করা হয়। তখন থেকে প্রতিবছর দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে, বিশেষ করে প্যারাগুয়েতে ঘটা করে বন্ধু দিবস পালিত হতো। ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্যান্য দেশে এ দিনটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। কেউ কেউ মনে করে, ১৯১৯ সালে আগস্টের প্রথম রবিবার বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কার্ড, ফুল, উপহার বিনিময় করত। তবে ১৯১০ সালে জয়েস হলের প্রতিষ্ঠিত হলমার্ক কার্ড বন্ধু দিবস পালনের রীতিকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়েছিল। ১৯৫৮ সালে আন্তর্জাতিক নাগরিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড বিশ্বে শান্তির উদ্দেশ্যে প্যারাগুয়েতে ৩০ জুলাইকে ‘বিশ্ব বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেয়। ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেডের প্রতিষ্ঠাতা ডা. আর্তেমিও ব্রেঞ্চো বন্ধুদের সঙ্গে প্যারাগুয়ের পুয়ের্তো পিনাসকোতে এক নৈশভোজে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ওই রাতেই ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি ৩০ জুলাই বিশ্বব্যাপী বন্ধু দিবস পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব পাঠায়। প্রায় পাঁচ যুগ পর ২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৩০ জুলাইকে বিশ্ব বন্ধু দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। তার আগে ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ বিশ্বময় বন্ধুত্বের আলাদা অবস্থানে নিজেদের নিয়ে যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বপ্রথম ভারতে এই দিবসের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে বন্ধু দিবস পালন করা হচ্ছে। এরপর ইন্টারনেট ও টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে বন্ধু দিবস পালনের প্রসার ঘটে। বর্তমানে বেশ ঘটা করেই বন্ধু দিবস পালন করা হয়। আগস্টের প্রথম রবিবারই বন্ধু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এ দেশে। আবার কোনো কোনো দেশে ৮ এপ্রিল বন্ধু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শুধু আগস্টের প্রথম রবিবার নয়, বছরজুড়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের বন্ধু দিবস রয়েছে। যেমন—আগস্টের তৃতীয় রবিবার ‘নারী বন্ধু দিবস’, মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ‘বাল্যবন্ধু দিবস’ ও ‘নতুন বন্ধু সপ্তাহ’ রয়েছে। এ ছাড়া সম্পূর্ণ ফেব্রুয়ারি মাস ‘আন্তর্জাতিক বন্ধু মাস’ হিসেবে বিভিন্ন দেশে পালন করা হয়।

বিশ্বব্যাপী ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বন্ধুত্ব, ঐক্য ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে। কারণ বন্ধুত্বের ভেতর থাকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ‘হঠাৎ রাস্তায় অফিস অঞ্চলে/হারিয়ে যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে/বন্ধু কী খবর বল/কত দিন দেখা হয়নি।’ অর্থাৎ পৃথিবীর অন্যতম নিষ্পাপ সম্পর্কের একটি হলো ‘বন্ধুত্ব’। একে অন্যের সুখে লাফিয়ে ওঠা; একে অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এই সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রবণতা। মন খুলে কথা বলা, হেসে গড়াগড়ি খাওয়া আর চূড়ান্ত পাগলামি করার একমাত্র সম্পর্ক ‘বন্ধুত্ব’। বন্ধুত্ব কোনো বয়স মেনে হয় না, ছোট-বড় সবাই বন্ধু হতে পারে। সম্পর্ক বন্ধুত্বের হলেও বয়সের ব্যবধানের কারণে ছোটদের প্রতি স্নেহ আর বড়দের প্রতি সম্মানটা থাকা দরকার। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ‘ভালোবাসা’ ও আত্মার সঙ্গে আত্মার টান থাকতেই হবে। এ জন্য গানের কথায় আছে—‘পুরো পৃথিবী একদিকে, আর আমি অন্যদিক/সবাই বলে করছ ভুল, আর তোরা বলিস ঠিক/তোরা ছিলি, তোরা আছিস/জানি তোরাই থাকবি/বন্ধু বোঝে আমাকে, বন্ধু আছে আর কী লাগে?’ ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি গোষ্ঠীর হামলায় নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মতো বন্ধুও আছে এই দুনিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওই তরুণ বন্ধুত্বের অনুকরণীয় এক প্রমাণ রেখে গেছেন। দুই বন্ধু অবিন্তা কবীর ও তারিশি জৈনর সঙ্গে তিনি দেখা করতে গিয়েছিলেন ওই রেস্তোরাঁয়। সেদিনই জঙ্গিরা সেখানে আক্রমণ করে। জিম্মি করে সেখানকার উপস্থিত লোকজনকে। জঙ্গিরা ফারাজকে মুক্তিও দিয়েছিল, চলে যেতে বলেছিল। মুক্তি পাওয়া অন্য বাংলাদেশিরা সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ফারাজকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে। কিন্তু তিনি দুই বন্ধুকে বিপদে ফেলে সেখান থেকে চলে যেতে রাজি হননি। শেষে জীবন দিয়েই ফারাজ আইয়াজ হোসেন ‘বন্ধু’ শব্দটিকে মহিমান্বিত করে গেছেন। পাশ্চাত্যে বন্ধুত্বের প্রতীক ‘হলুদ গোলাপ’-এর ‘হলুদ’ রং হলো আনন্দের প্রতীক। হলুদ গোলাপ মানে যে শুধু আনন্দই তা কিন্তু নয়; এটি প্রতিশ্রুতিরও প্রতীক। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন ফারাজ।

৩.

নানাবিধ প্রতিকূলতার জন্য পৃথিবীর প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রদায়ের, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বন্ধুত্ব নেই বলে তারা পরস্পরের শত্রু হয়ে যায়। বন্ধুত্ব অনেক ধরনের হতে পারে—ব্যক্তিক, সামাজিক, ব্যাবসায়িক, পেশাভিত্তিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক। এখানে আমরা শুধু ব্যক্তিক বন্ধুত্বের কথা বললাম। কারণ ‘তুমি আমার পাশে বন্ধু হে বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো! আমি মেঘের দলে আছি, আমি ঘাসের দলে আছি, তুমিও থাকো বন্ধু হে, বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো!’ এই ব্যক্তিক আর্তি সমাজ সংস্কারে কার্যকর করে তুলতে হবে। বাংলাদেশের সমাজে এখন নৈতিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের নানামাত্রিক সংকট চলছে। লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতা মানুষে মানুষে বন্ধুত্বের ছেদ ঘটায়। এই সংকট উত্তরণের জন্য বন্ধুত্বের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধুরা একে অন্যের সঙ্গে মিলে আইনের সহায়তা নিয়ে আমাদের সমাজকে রক্ষা করতে পারে। ধর্ষণ, হত্যা, সন্ত্রাসীর কবলে পড়লে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর পাশে এসে দাঁড়াবে। কারণ সমাজের প্রত্যেক মানুষ প্রত্যেকের ওপর নির্ভরশীল। এ নির্ভরশীলতার জন্যই মানুষে মানুষে গড়ে ওঠে সম্প্রীতির বন্ধন। সজ্জনতা থেকে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। হীনতা, দীনতা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা উত্তীর্ণ হতে না পারলে প্রকৃত বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন হয় না। নিঃস্বার্থ আত্মিক ও পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধনে যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়, এমন বন্ধুত্বই প্রকৃত বন্ধুত্ব। সামাজিক জীবনের ক্ষত তথা দুঃখ, বিপদ, লাঞ্ছনা—এসব বিরুদ্ধাবস্থাকে মাড়িয়ে বন্ধুরা সম্মিলিতভাবে শুভ কাজে এগিয়ে এলে বিশ্ব বন্ধু দিবসের তাৎপর্য ফলপ্রসূ হবে।

লেখক : অধ্যাপক এবং পরিচালক, জনসংযোগ তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected] 

মন্তব্য