kalerkantho

সড়কপথের নৈরাজ্য : সমাধান কোন পথে

ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সড়কপথের নৈরাজ্য : সমাধান কোন পথে

আমাদের দেশের সড়কপথের নৈরাজ্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সড়কপথের নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান ইত্যাদি যথাযথভাবে মেনে না চলার কারণেই নৈরাজ্যজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে অহরহই ঘটছে মারাত্মক সব দুর্ঘটনা। আর এসব দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। ক্ষতি হচ্ছে বস্তুগত সম্পদের। দেশব্যাপী এমন দিন খুব কমই পাওয়া যাবে, যেদিন কম করে হলেও ডজনখানেক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে না। ঈদ-কোরবানির মতো জাতীয় উৎসবের সময় তো কথাই নেই। এসব সময়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন বেড়ে যায়, তেমনিভাবে মানুষের প্রাণও যায় অনেক—শত শত। বিগত ঈদুল ফিতরের সময় কম করে হলেও ৩০০ মানুষের প্রাণ গেছে এবং আহত হয়েছে হাজারখানেক। ঈদুল আজহা উৎসব অত্যাসন্ন। আমাদের আশঙ্কা, এ উৎসবেও ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটলে আবারও প্রাণ যাবে অসংখ্য নিরীহ মানবসন্তানের। আমাদের দেশের সড়কপথের এমন নৈরাজ্যজনক অবস্থার কারণগুলো খতিয়ে দেখা যাক।

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, সড়কপথগুলোর অপ্রশস্ততা। প্রায় শতভাগ সড়কপথই ধারণক্ষমতার বিচারে বেশ সরু বা অপ্রশস্ত। ফলে যানবাহনের গতি ধীর হতে বাধ্য এবং চালকদের অসহিষ্ণুতার কারণে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা, যা আসলে কারো কাম্য নয়।

দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, সড়কপথ নির্মাণে ত্রুটি ও দুর্নীতি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে মাটির সড়ক যথেষ্ট প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও পিচ ঢালাই করা হয় অনেক কম—অর্ধেকের মতো। ফুটপাত পৃথক করে করা তো হয়ই না, বরং ফেলে রাখা হয় এবড়োখেবড়ো অবস্থায়। ফলে বর্ষার সময় পিচ ঢালাইকৃত সড়কটুকুও কর্দমাক্ত হয়ে যায়। যথেষ্ট বালু ফেলা হয় না, পানি দেওয়া হয় না, মানসম্মত খোয়া-পাথর ও সুরকি দেওয়া হয় না, অত্যন্ত স্বল্প পরিমাণে পিচ দেওয়া ইত্যাদি কারণে সড়কপথের স্থায়িত্ব দীর্ঘ না হয়ে বরং স্বল্প হয়। বছর না গড়াতেই দেখা যায় যে সড়কের পেট ফুলে উঠেছে, চিড় ধরেছে, খোয়া-পাথর উঠে গেছে, ইট খুলে গেছে ইত্যাদি। অতএব আবশ্যক মেরামতি কাজ করা। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার মেরামতিতে তো দুর্নীতির মচ্ছব চলে। এত নিম্নমানের মেরামতিসামগ্রী ব্যবহার করা হয় এবং এত তড়িঘড়ি করে করা হয় যে কাজ শেষ হতে না হতেই তা উঠে গিয়ে আবার যেইসেই অর্থাৎ আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

তৃতীয় কারণটি হচ্ছে, অত্যন্ত ক্রটিপূর্ণ লাইসেন্স প্রদান ব্যবস্থা। বিআরটিএ যেভাবে এবং যে প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স, নিবন্ধন, ফিটনেস ইত্যাদি কাজ সম্পাদন করছে, তা মোটেও স্বচ্ছ নয়। আর এটা তো ওপেন সিক্রেট যে এই সেবাগুলো পেতে নিয়মিত টাকার লেনদেন হয়। ইদানীং বেশ কয়েকটি মারাত্মক দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে চালানো তদন্তে দেখা গেছে যে সংশ্লিষ্ট যানগুলোর ফিটনেস ছিল না, ছিল না রুট পারমিট, চালকের লাইসেন্স ছিল ভুয়া, যান চালাচ্ছিল হেলপার ইত্যাদি সব অনিয়ম।

চতুর্থ কারণটি হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আপেক্ষিক নির্লিপ্ততা। সড়কপথে চলাচলের আইন-কানুন ও বিধি-বিধান আছে। এগুলো মেনে চলতে চালকদের বাধ্য করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশের মহান দায়িত্ব। পুলিশ যথেষ্ট মাত্রায় তৎপর থাকলে অনেক দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব।

পঞ্চম কারণটি হচ্ছে, সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের আধিক্য। আমাদের দেশের সড়কগুলোতে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে সড়কগুলোর ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি যানবাহন সড়কে চলাচল করে থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই যানবাহনের গতি ধীর হতে বাধ্য। যানজটের এটি অন্যতম একটি প্রধান কারণ।

ষষ্ঠ কারণটি হচ্ছে, অদক্ষ ও বেআইনি চালকের উপস্থিতি। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যানবাহনের চালকরা অদক্ষ এবং বেআইনি পন্থায় প্রাপ্ত লাইসেন্সের অধিকারী। এরা সড়কপথের আইন-কানুন একেবারেই জানে না। কেউ কেউ জানলেও মানে না। ফলে যেখানে ওভারটেকিং নিষিদ্ধ, সেখানে ওভারটেক করে; যেখানে পার্কিং নিষিদ্ধ, সেখানে পার্ক করে; যেখানে থামা নিষিদ্ধ, সেখানে থামে—এমন সব বেআইনি কাজ করে থাকে তারা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাগুলো এদের ভুলের জন্যই ঘটে থাকে।

সপ্তম কারণটি হচ্ছে, দৈনিক চুক্তিতে যান চালানো, অর্থাৎ মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে সারা দিনের জন্য যানটি চালক ও হেলপার নিয়ে নেয়। ফলে তাদের মধ্যে অতিরিক্ত আয় করার প্রবণতাটি প্রবলভাবে কাজ করে এবং যাত্রী ধরার জন্য বা মালামাল ওঠানো-নামানোর জন্য এরা যানটি যত্রতত্র থামায়, যা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি কাজ। আর ঠিক একই কারণে তাড়াহুড়া করে বেআইনিভাবে ওভারটেক করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটায় দুর্ঘটনা—কখনো কখনো মারাত্মক।

সর্বশেষ কারণটি হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের স্বল্পতা। ১৭ কোটি মানুষের জন্য কম করে হলেও পুলিশের কাঙ্ক্ষিত সদস্যসংখ্যা ১০ লাখ হওয়া প্রয়োজন। সেখানে এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা কমবেশি দেড় লাখের মতো হবে হয়তো। আর ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা তো কাঙ্ক্ষিত সংখ্যার বহুগুণ নিচে আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তদুপরি রয়েছে তাদের বাড়তি দায়িত্ব—হাত উঁচিয়ে সিগন্যাল বাতির কাজ করা। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো পর্যন্ত আমাদের রাজধানী শহরে অত্যাধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়নি।

আমাদের দেশে জাতীয়, আঞ্চলিক, বাইপাস ইত্যাদি সব মিলে তিন লাখ কিলোমিটারের বেশি সড়কপথ রয়েছে। যদিও মানসম্পন্ন সড়কপথের দৈর্ঘ্য কয়েক শ কিলোমিটারের বেশি হবে না। বেশির ভাগ সড়কপথই অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং বছরের বেশির ভাগ সময়ই ভাঙাচোরা অবস্থায় থাকে। যথেষ্টসংখ্যক ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ না থাকার কারণে প্রায়ই কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় পুলিশের অনুপস্থিতিতে ঘটে যায় সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনসাধারণই আইন হাতে তুলে নেয়। ঘটে বহুমুখী সংঘর্ষের ঘটনা। ব্যাহত হয় যান চলাচল। এগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্মঘট, হরতালের মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। কখনো কখনো অনির্দিষ্টকালের জন্য। দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। অপূরণীয় ক্ষতি হয় অর্থনীতির। অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অত্যন্ত ক্ষতিকর এ ধরনের নৈরাজ্যজনক অবস্থা থেকে মুক্তির কি তাহলে কোনো উপায় নেই। নিশ্চয়ই আছে। নিম্নের বিষয়গুলোর দিকে যথাযথ দৃষ্টি দিলে এ রকম নৈরাজ্যজনক অবস্থা থেকে অবশ্যই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

১. সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি বেশি সতর্ক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্নীতিকে চিরতরে বিদায় জানাতে হবে। নির্মাণ ও মেরামতিকাজ মানসম্পন্ন হতে হবে। গোটা সড়ককে পিচ ঢালাইয়ের আওতায় আনতে হবে। সড়কের পাশে অবশ্যই ড্রেন ও ড্রেনের ওপরে অন্তত দুই ফুট উঁচু ফুটপাত নির্মাণ করতে হবে পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য। ধীরগতির যানবাহনের জন্য সড়কগুলোতে পৃথক লেন নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

২. যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ হতে হবে। উন্নত দেশে এ বিষয়গুলো কিভাবে সম্পন্ন করা হয়, তার আলোকে বিআরটিএর কর্মকাণ্ডকে ঢেলে সাজাতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া যেন কেউ টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স নিতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী বাস ও অন্যান্য যানবাহন দাঁড়ানোর জন্য সুদৃশ্য স্টেশন গড়ে দিতে হবে। কোনো যানবাহন স্টেশন ছাড়া অন্যত্র দাঁড়াবে না—এ রকম কঠিন নিয়ম করে দিতে হবে। আর পুলিশ এই নিয়মটি কঠিনভাবে বাস্তবায়ন করবে। এ নিয়মটি যে চালক মানবে না তার জন্য জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে। তিনবার এ নিয়ম ভঙ্গকারীর লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এ রকম কঠোরভাবে আইন ও নিয়ম-কানুন বাস্তবায়িত হলে অপরাধ, অনিয়ম অবশ্যই উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

৪. অপেক্ষাকৃত ধীরগতির যানবাহনের (সাইকেল, রিকশা, ভ্যান, অটো ইত্যাদি) জন্য পৃথক লেন থাকতে হবে সড়কগুলোতে। বাকি লেনগুলোও মোটরচালিত যানের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে। যেমন—বাসের জন্য একটি, কার-জিপের জন্য একটি, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের জন্য একটি করে লেন নির্ধারিত থাকবে।

৫. রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলো থেকে মিনিবাস, কোস্টার, ম্যাক্সি ইত্যাদি তুলে দিয়ে দোতলা ও আর্টিকুলেটেড বাস চালু করতে হবে। কাজটি করতে হবে পর্যায়ক্রমে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে। আর এ জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত শহর-নগরের জন্য এর কোনো বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না।

৬. দীর্ঘপথে যোগাযোগের তথা যাতায়াতের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে রেল ও নৌপথকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে হবে। রেল ও নৌপথের বিকাশে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশ এগোচ্ছে, মানুষের আয়-রোজগার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতএব সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিমান পরিবহনকেও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিকশিত করতে হবে।

৭. ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপন দিয়ে গোটা বিষয়টি সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। সরকার জনস্বার্থে তথা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বিনা পয়সায় বিজ্ঞাপন দিতে গণমাধ্যমগুলোকে বাধ্য বা অনুরোধ করতে পারে। এটা করতে পারলে জনগণের চিন্তা ও আচরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই আমার।

৮. সর্বোপরি ভাড়া ও জরিমানার পরিমাণ উল্লেখপূর্বক প্রস্তুতকৃত চার্ট প্রতিটি স্টেশনে সেঁটে দিতে হবে।

সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। ইদানীং পুলিশ বাহিনীর ঘুষমুক্ত নিয়োগে এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি। দুদকের কর্মকাণ্ডেও এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এক দিনে তো আর দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে না। তবে সরকারের সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পদক্ষেপে আমরা আশান্বিত। অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে দুর্নীতি। এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে সরকার দুর্নীতি ও অনিয়মবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণপূর্বক নৈরাজ্যমুক্ত সড়ক পরিবহনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা টেকসই করতে এর কোনো বিকল্প আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য