kalerkantho

অসামান্য উদ্যোগ ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’

শামীম আল আমিন

১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অসামান্য উদ্যোগ ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’

অনেকে জানেন, আবার অনেকে জানেন না। বরং এই কথাটি খুব বেশি উচ্চারিত হয়—‘মহান মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না।’ যখন এভাবে বলা হয়, তখন গোটা আমেরিকাকেই বোঝায়। দেশটির সাধারণ মানুষও পড়ে যায় এর মধ্যে। অথচ এখানে অন্য গল্পও রয়েছে। রয়েছে পাশে দাঁড়ানোর অন্য ইতিহাসও। কোনো রাজার নীতিই যে আসল নীতি না, সাধারণ মানুষের নীতিই যে সব সময় জোরালো হয়ে ওঠে, তার উদাহরণ কিন্তু পৃথিবীতে অনেক। তেমনি একটি উদাহরণ ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।

রাজা আসে, রাজা যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ একই থেকে যায়। তাই বলা হয়, সাধারণ মানুষের শক্তিই আসল শক্তি। যে কারণে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের মতো একেকটি অমর সৃষ্টি তৈরি হয়। বলতে পারেন, কনসার্ট ফর বাংলাদেশের উদ্যোক্তা, তাঁরা তো সাধারণ মানুষ নন। কিন্তু আমি বলব, তাঁরা সাধারণে অসাধারণ, আমজনতারই লোক। ফলে বুঝতেই পারছেন, কোনো দেশের শাসনতন্ত্র যদিও কোনো একটি নীতি নিয়ে থাকে, সাধারণ মানুষ সেই নীতি উল্টে দিতে পারে। পৃথিবীর দেশে দেশে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। সেদিন আমেরিকার অসংখ্য বিবেকবান মানুষ ঠিকই বাড়িয়েছিলেন ভালোবাসার হাত। বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না।

মুক্তিকামী মানুষ যখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুদ্ধে; পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখন গোটা দেশকে করে তোলে বিভীষিকাময় এক মৃত্যুপুরী। দেশজুড়ে হত্যা, নির্যাতন আর রক্তের নদী। বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয় অনেকে। মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেওয়া বাংলার সর্বস্তরের জনতা বিপুল বিক্রমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিভিন্ন দেশ এসে পাশে দাঁড়ায়। আসে বিরোধিতাও। তবে দিনে দিনে গড়ে ওঠে বিশ্বজনমত। বাঙালির ন্যায়সংগত দাবির প্রতি সমর্থন জানায় অগণিত বিবেকবান মানুষ। নানাভাবে তারা বাড়িয়ে দেয় সহায়তার হাত। পাশে দাঁড়ানোর, তেমনি একটি অসাধারণ ও অসামান্য উদ্যোগের নাম ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।

দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের পহেলা আগস্ট, রবিবার। প্রথমে বলা হয়েছিল; কনসার্ট হবে একটি। কিন্তু মানুষের চাপে শেষ পর্যন্ত দুপুর আড়াইটায় এবং রাত ৮টায় দুটি শো করতে বাধ্য হয়েছিলেন আয়োজকরা। একদিকে মানবতা; অন্যদিকে বিশ্বের তখনকার সংগীত মহাতারকারা জড়ো হয়েছিলেন এক ছাদের নিচে। পৃথিবীর মানুষ তাকিয়ে দেখেছিল, অনন্য মহিমায় কিভাবে একটি আবেগমাখা ইতিহাস রচিত হয়েছিল।

কিন্তু কী ছিল সেই আয়োজনের প্রেক্ষাপট! তখন বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা আর মানবতার বিপর্যয় দেখে অনেকের মতো কেঁদে উঠেছিল এক মানবতাবাদী মানুষের হৃদয়। তিনি পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ভারতীয় এই বাঙালি সেতারবাদকের তখন জগেজাড়া খ্যাতি। তিনি তখন বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে কথা বলেন। শরণার্থী মানুষগুলোকে সহায়তা করতে একটি কনসার্ট আয়োজনের কথা বলা হয়। সেই প্রস্তাবে সাড়া দিতে খুব বেশি সময় নেননি জর্জ হ্যারিসন। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে এই আয়োজনটি করে ফেলেন।

জর্জ হ্যারিসন তখন তাঁর অন্য বন্ধুদের, নিউ ইয়র্কের জগদ্বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সেই কনসার্টে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। তাঁর সাবেক দল দ্য বিটলসের সদস্যদেরও তিনি সেই কনসার্টে অংশ নেওয়ার অনুরোধ করেন। পল ম্যাকার্টনি যোগ দিতে চাননি। জন লেনন বলেছিলেন যোগ দেবেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁরও। মিক জ্যাগার ছিলেন ফ্রান্সে। শেষ পর্যন্ত বিটলস ব্যান্ডের শুধু রিঙ্গো স্টার যোগ দেন ঐতিহাসিক সেই কনসার্টে।

তবে এখানেই থেমে থাকেননি জর্জ হ্যারিসন। অন্যদেরও আহ্বান জানান। তাতে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেল আর হ্যারিসনের নতুন দল ব্যাড ফিঙ্গারের যন্ত্রীদলসহ অনেকে। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর এটিই ছিল হ্যারিসনের সরাসরি অংশগ্রহণ করা প্রথম কোনো অনুষ্ঠান। এরিক ক্ল্যাপটনও এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ মাস পর কোনো সরাসরি অনুষ্ঠানে গান গাইলেন। আর ১৯৬৯ সালের পর বব ডিলানও প্রথমবারের মতো শ্রোতা-দর্শকদের সামনে এলেন।

রবিশঙ্করের সঙ্গে উপমহাদেশের কিংবদন্তি সরোদবাদক আলি আকবর খানও ছিলেন অগ্রভাগে। তবলায় ছিলেন আল্লা রাখা আর তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানের শুরুতেই তাঁদের মিলিত প্রয়াস, বাংলা ধুন, সবাইকে মুগ্ধ করে।

জর্জ হ্যারিসন আর পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে আয়োজিত সেই উদ্যোগ ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামে। সেদিনের জগদ্বিখ্যাত তারকাদের অংশগ্রহণে কনসার্টটির প্রভাব ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে সেই কনসার্টের প্রতিক্রিয়া হয়েছে অনেক। যাতে করে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ জেনেছিল বাংলাদেশের নাম। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে গোটা বিশ্ব সেদিন আরো ভালো করে জেনেছিল পাকিস্তানি হায়েনারা কী তাণ্ডবই না চালাচ্ছে বাংলার সবুজ জমিনে। মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, মনে দাগ কেটেছে সেই আয়োজন।

দুটি বেনিফিট কনসার্ট ও অন্যান্য অনুষঙ্গ থেকে পাওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় আড়াই লাখ ডলার। এই অর্থ পরে ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ব্যবহৃত হয়। প্রকাশিত হয় কনসার্টের লাইভ অ্যালবাম; যা রীতিমতো বিক্রির রেকর্ড গড়ে। একটি বক্স থ্রি রেকর্ড সেট এবং অ্যাপল ফিল্মসের তথ্যচিত্র ১৯৭২ সালে চলচ্চিত্র আকারে প্রকাশিত হয়।

এই চলচ্চিত্রটি শুরু হয় রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসনের, কনসার্টটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার, সংবাদ সম্মেলনের দৃশ্য দেখানোর মধ্য দিয়ে। এরপর একে একে কনসার্টের প্রেক্ষাপট, আয়োজন আর মানুষের অংশগ্রহণ উঠে আসে এই চলচ্চিত্রে। জর্জ হ্যারিসন মঞ্চে উঠে তাঁর জনপ্রিয় অ্যালবাম All Things Must Pass থেকে প্রথমে গান শোনান। এরপর একটু একটু করে কানসার্টটি এগিয়ে চলে। গান করেন বিলি প্রিস্টন, রিঙ্গো স্টার, লিয়ন রাসেল ও বব ডিলানের মতো জগেসরা শিল্পীরা। জর্জ হ্যারিসন এই মঞ্চেই গেয়ে শোনান তাঁর লেখা ও সুর করা সেই ঐতিহাসিক গানটি। আর এভাবেই একটি স্বাধীন দেশের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে যায় পৃথিবীর অগণিত মানুষের প্রিয় শিল্পীদের নাম। জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং অন্যদের প্রতি তাই অতল শ্রদ্ধা।

লেখক : কালের কণ্ঠ’র উত্তর আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য