kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়েও পরিবেশ বিপর্যয় মারাত্মক

গাজীউল হাসান খান

১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়েও পরিবেশ বিপর্যয় মারাত্মক

নদীর স্রোতধারা, আলোক রশ্মি কিংবা বায়ুপ্রবাহকে কোনো সীমান্ত দিয়ে ঠেকানো যায় না। এদের গতি অবাধ। এদের ওপর বিশ্বের সব মানুষের রয়েছে সমান অধিকার। পানি, বায়ু কিংবা আলো ছাড়া কোনো মানুষ কিংবা প্রাণী শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে না। সে কারণেই বিশ্বপরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতি রক্ষা করার দাবিতে আজ এত কর্মকাণ্ড চলছে। মানুষ তার স্বার্থরক্ষা কিংবা অবহেলা ও অবজ্ঞার কারণে অনেকটা বিশ্বব্যাপীই পানি, বায়ু ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করেছে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই। তাই কোথাও পানীয় জল কিংবা ফসলের জন্য সেচের পানির অভাব দেখা দিয়েছে, কোথাও অনাবৃষ্টি কিংবা খরা, কোথাও আবার অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং তার পাশাপাশি বনাঞ্চলে দাবানলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সবুজ প্রকৃতি ও জনপদ। মানুষের অবহেলা, সরকারের অবজ্ঞা কিংবা বিশ্বসমাজের ঐক্যবদ্ধ বা যৌথ উদ্যোগের অভাবে এখন পানি ও বায়ুদূষণের গুরুতর অভিযোগ শোনা যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। নদীর স্রোতধারা কিংবা বায়ুপ্রবাহ আমাদের ভাবতে শিখিয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের বিপর্যয় ঘটানোর পরিণাম কতটা মারাত্মক হতে পারে। তা ছাড়া পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতি বিশ্বসমাজকে ক্রমে ক্রমে আরো সচেতন করে তুলেছে যে মানুষ প্রকৃতিগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করতে পারবে না। এক অঞ্চলে পানি কিংবা বায়ুদূষণের মারাত্মক প্রভাব অতি দ্রুত পার্শ্ববর্তী অন্যান্য অঞ্চলেও অনুভূত হতে পারে। এক অঞ্চলের সৃষ্ট পরিবেশদূষণ অন্য অঞ্চলের মানুষের সমূহ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পৃথিবীর বিভিন্ন শিল্পসমৃদ্ধ দেশ পানি, বায়ু কিংবা বৃহত্তরভাবে পরিবেশদূষণের কাজটি শুরু করেছে অনেক আগে, যা অনুভূত হতে সময় লেগেছে অনেক। তবে দুঃখের বিষয় এই যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পসমৃদ্ধ দেশ তাদের কৃতকর্মের ফলাফল জানতে পারলেও তার বিরুদ্ধে তেমনভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, এসব জেনেশুনেও প্যারিসে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বর্তমান হোয়াইট হাউস প্রশাসন। অথচ বিশ্বের পরিবেশদূষণ কিংবা কলকারখানা থেকে নিঃসৃত কার্বনের পরিমাণ এখনো যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশি।

অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একজন নিরাপত্তাবিষয়ক সামরিক কর্মকর্তা যখন ট্রাম্প প্রশাসনকে পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতির বিপর্যয়ের জন্য দুষছিলেন তখন যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টে চলছিল পরিবেশবিষয়ক এক বিশেষ শুনানি। এতে সংসদ সদস্যদের এক বিশেষ কমিটির সামনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন ব্রিটেনের ৯৩ বছর বয়স্ক প্রকৃতিবিষয়ক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও টিভি উপস্থাপক স্যার ডেভিড এটেনবরা। সেই বিশেষ শুনানিতে তিনি বলেছিলেন, বর্তমান বিশ্বের পরিবেশদূষণ বা বিপর্যয়ের জন্য প্রথম দোষারোপ করতে হবে যুক্তরাজ্যকে। কারণ আঠারো ও উনিশ শতকে সে দেশে সংগঠিত হয়েছিল প্রথম শিল্প বিপ্লব। এতে যুক্তরাজ্যের শিল্প বিপ্লবের একটি উল্লেখযোগ্য জ---ালানি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল খনিজ কয়লা। সে জীবাশ্ম জ---ালানি কয়েক শ বছর ধরে পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতির যে ক্ষতিসাধন বা বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে যুক্তরাজ্যকেই প্রথমে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতির বিপর্যয়ের কারণে দেশে দেশে যে সামাজিক অস্থিরতা শুরু হবে তার দায়ভার কোনোভাবেই কোনো সরকার পাশ কাটিয়ে যেতে পারবে না। সে জন্য তিনি অবিলম্বে একটি বিশেষ তহবিল গঠন এবং যুক্তরাজ্যবাসীকে তাদের খাদ্যাভ্যাস এবং এমনকি আকাশপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। এতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হলেও সেখান থেকে পিছিয়ে যাওয়া চলবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে নিত্যনতুন উদ্ভাবনী থেকে যুক্তরাজ্যের জ---ালানি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত অত্যন্ত উপকৃত হবে এবং বিশ্ববাসীকে পথ দেখাবে। এতে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষ্যমাত্রা এবং পরিচ্ছন্ন প্রবৃদ্ধি অর্জন অনেকটা সম্ভব হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘আমরাই প্রথম পরিবেশ বিপর্যয়ের সূচনা করেছি। জ---ালানি হিসেবে খনিজ কয়লার ব্যবহার থেকে আমরা শিল্প বিপ্লবের সূচনা করেছি। এতে আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতির যথেষ্ট ক্ষতিসাধিত হয়েছে। আমাদের সৃষ্ট সমস্যার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমাদেরই প্রথমে উদ্যোগ নিতে হবে।’

যুক্তরাজ্যের শিল্প-কারখানায় স্যার ডেভিড পরিবেশবান্ধব নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর যথেষ্ট জোর দিয়েছেন। ২০২৫ সালের মধ্যে ব্রিটেনকে একটি ‘কার্বন নিয়োট্রাল’ বা কার্বনশূন্য দেশে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বিদায়ি প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে। কিন্তু তা কতটুকু সফল হতে পারে—এমন একটি প্রশ্নের জবাবে স্যার ডেভিড বলেছেন, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর এই সমস্যা বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট সামাজিক অসন্তোষ ও পরিবর্তনের জন্ম দেবে। সুতরাং বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষকে লক্ষ রাখতে হবে তারা কী খায় এবং কেমনভাবে জীবন যাপন করে। এবং সর্বোপরি তা পরিবেশবান্ধব কি না? বিশ্বের সর্বোচ্চ শিল্পোৎপাদনের জন্য বর্তমানে পরিবেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত। এই অভিযোগ বিশ্বের পরিবেশবাদীদের। তাঁদের অভিযোগ হলো, উল্লিখিত এই তিনটি শিল্পসমৃদ্ধ দেশ যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কিংবা পরিবেশের ক্ষতিসাধন করছে, সে পরিমাণ ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা প্রতিকারের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃশ্যত মনে হয় উল্টো পরিবেশবাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

পরিবেশবিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীদের বক্তব্য হচ্ছে, বর্তমানে যে পরিমাণে বা যেভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে, তা অব্যাহত থাকলে আফ্রিকা মহাদেশের একটি বিশাল অঞ্চল শিগগিরই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। অন্য সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণে অবিলম্বে যথাযথ অর্থাৎ কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এশিয়া মহাদেশের, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্র উপকূলবর্তী বিরাট নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাবে। এসব অঞ্চলে দেখা দেবে নিত্যনতুন রোগব্যাধিসহ নানা জটিল উপসর্গ, যার প্রতিকারের ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের হাতে থাকবে না। দূষিত পানি ও বায়ুর কারণে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের সুস্থ জীবনযাপন হয়ে উঠবে কঠিনতর। কারণ অব্যাহত পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। তা সহ্যসীমার মধ্যে আনতে হলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোয় জীবাশ্ম জ---ালানির ব্যবহার কমিয়ে সবুজ জ---ালানি ব্যবহার যতটা ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন, অর্থনৈতিক বিনিয়োগের অভাবে তা কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোচ্ছে না। তবে প্যারিসে আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিভিন্ন শিল্পসমৃদ্ধ এবং উন্নয়নশীল দেশও এ ক্ষেত্রে কিছুটা উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে বর্ধিত কার্বন নিঃসরণ ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়সহ বিভিন্ন সুউচ্চ পর্বতমালা এবং উত্তর গোলার্ধে বরফ গলার পরিমাণ ক্রমে ক্রমেই বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণ ঠেকাতে কিংবা বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু গাছ লাগানো কিংবা সবুজায়নই একমাত্র উপায় নয়। সেটি অবশ্যই একটি নির্ভরযোগ্য উপায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে জীবাশ্ম জ---ালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কিংবা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বর্তমানে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ওপরে পৌঁছে গেছে। এ অবস্থায় তাকে প্রায় দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড নামিয়ে আনা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে রয়েছে। সে কারণে জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে সম্প্রতি এর প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বসম্প্রদায়কে আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদি বর্তমান হারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, তাহলে সমুদ্রের পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যেতে পারে। পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে বিপন্ন হতে পারে বিশ্বখ্যাত সুন্দরবনের এক বিশাল অঞ্চল। জানা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে জলাশয় সংরক্ষণ, সেচের পানি জোগানো এবং কাঙ্ক্ষিতভাবে ফসল ফলানোর ব্যাপারে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (জিডিপি) ২ শতাংশ কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকারও বেশ কিছু দেশে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে অভূতপূর্ব ক্ষতিসাধিত হতে পারে, যা আগে কল্পনাও করা যায়নি।

কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণজনিত কিংবা চেরনোবিল পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বের একাংশের মানুষের বিশাল ক্ষতিসাধিত হতে পারে। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাব বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত নীরবে যে ক্ষতিসাধন করছে, তা আরো অনেক মারাত্মক। এর ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা একটি দুঃসাধ্য ব্যাপার। অথচ যে শিল্পসমৃদ্ধ বিশ্বের কারণে এই বিপর্যয় ঘটছে তারা কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা অন্যান্য মহাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে কোনো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। বিশ্বের সমুদ্র উপকূলবর্তী অনেক নিম্নাঞ্চল বর্তমান পরিবেশ বিপর্যয়ের ধারায় একদিন বিলীন হয়ে যাবে; কিন্তু মুক্তবাজার দখল করার প্রতিযোগিতায় বিশ্বের শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর হয়তো সেদিকে তাকিয়ে দুঃখ প্রকাশ করারও সময় হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাংলাদেশে এরই মধ্যে ৬০ লাখ জলবায়ু অভিবাসী রয়েছে। এবং ২০৫০ সালের মধ্যে সে সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, ঘন ঘন বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ---াস, সমুদ্রতলের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের চালের উৎপাদন ৮ শতাংশ, গমের উৎপাদন ৩২ শতাংশ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে বিশ্বের অনেক দেশ। কারো কারো বর্ধিত শিল্পসমাগ্রী উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিশ্বের অনেক দেশ ও নিরীহ জনগণকে যে চরম মূল্য দিতে হবে, তা যুক্তিগ্রাহ্য সহ্যসীমার বাইরে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে উন্নয়নশীল দেশের অনেক অর্জন এখন হুমকির সম্মুখীন বলে মন্তব্য করেছেন অনেক পরিবেশবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ। এর বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের লোভ-লালসা কিংবা স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না। সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পরিবেশ সম্মেলনে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, জলবায়ু মোকাবেলায় বাংলাদেশ শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান কর্মকর্তা ক্রিস্টালিনা জার্জিভা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশের সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু নিজের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পাদ দিয়ে একটি উন্নয়নশীল দেশ কয় দিন সে ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে? কয় দিন শিল্পসমৃদ্ধ বিত্তশালী দেশের সৃষ্ট ভয়াবহ সমস্যার বোঝা বইবে উন্নয়নশীল দেশগুলো।

যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ট্রাম্প প্রশাসনের জ---ালানি ব্যবহার সংক্রান্ত সরকারি নীতি বিশ্বপরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে যে ব্যাহত করছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো জ---ালানি ক্ষেত্রে খনিজ কয়লা ব্যবহারকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি নির্ভরযোগ্য উপায় হতে পারে বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, সস্তায় জ---ালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ---ালানি একটি অন্যতম প্রধান সূত্র। কিন্তু তিনি এ কথা মোটেও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবেন না যে জীবাশ্ম জ---ালানি ব্যবহারের যুগ শেষ হয়ে গেছে। এবং এখন বিশ্বপরিবেশ কিংবা ভূ-প্রকৃতি রক্ষার্থে সবুজ জ---ালানি সৃষ্টির যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাকে তিনি কখনোই বিশেষভাবে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেননি। বিভিন্ন উদ্যোগ ও চেষ্টার পর এখনো তিনি প্যারিসে সম্পাদিত আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তিতে ফিরে আসার মনোভাব দেখাননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য সরকার পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতিগত বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। তা ছাড়া বিশ্বপরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো ব্যাপক শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলো যদি কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে আরো দ্রুত ও ব্যাপকতর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে কোনোভাবেই লক্ষণীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। এ ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান নির্ভরশীল ক্ষেত্র হচ্ছে বিভিন্ন শিল্পসমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটিকে জাগিয়ে তোলা এবং প্রতিবাদমুখর করে তোলা। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসব পরিবেশবাদী অত্যন্ত আন্দোলনমুখর হয়ে উঠেছে। তাদের সে আন্দোলন এবং গণমাধ্যমের যাবতীয় সাহায্য-সমর্থনই পারে বর্তমান বিপর্যয়ের হাত থেকে এই সমস্যাসংকুল বিশ্বকে বাঁচাতে। সৃষ্টিশীলভাবে নতুন পথ দেখাতে।

লন্ডন, ১২ জুন ২০১৯

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

[email protected]

মন্তব্য