kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

মানুষ যাবে কোথায়

ড. হারুন রশীদ

১৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মানুষ যাবে কোথায়

হত্যা-ধর্ষণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। যেকোনো মূল্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে জননিরাপত্তা।

এবার কুমিল্লার দেবীদ্বারে দিনদুপুরে মা-ছেলেসহ চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে মোখলেসুর রহমান (৩৪) নামে এক যুবক। গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ঘাতক। গত বুধবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

পূর্বশত্রুতার জের ধরে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ঘাতক মোখলেসুর রহমান প্রতিবেশী আনোয়ারা বেগম, হানিফ, নাজমা বেগম, মাজেদা বেগমসহ ছয়-সাতজনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। এতে আনোয়ারা বেগম, হানিফ ও নাজমা বেগম ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত মাজেদা বেগমসহ অন্যদের কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাজেদা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্য আহতরা চিকিৎসাধীন।

বরগুনায় কুপিয়ে রিফাত হত্যার জের না কাটতেই আবারও ঘটল এমন পৈশাচিক ঘটনা। জননিরাপত্তা এখন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেটি ভাবনার বিষয়। সমাজে কেন মানুষজন এতটা হিংস্র ও পাশবিক হয়ে উঠছে সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। কুমিল্লার হত্যাকারী মোখলেসুর রহমান মাদকাসক্ত ছিল, এমনটি বলছে পুলিশ। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা খুনি হয়ে উঠছে, সেটিও অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার।

মাদক তার বিষাক্ত ছোবলে শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও অমিত সম্ভাবনা। শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্য, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণ সমাজের প্রতি। বেকারত্বও মাদকের বিস্তারে সহায়ক, এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা। এই মরণ নেশার বিস্তারে সমাজে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, তেমনিভাবে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শৃঙ্খলা।

মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে মাদকদ্রব্যের প্রাপ্তি সহজলভ্য যাতে না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে মাদকের অনুপ্রবেশ। দুঃখজনক হচ্ছে, মাঝেমধ্যে ছোটখাটো মাদক কারবারি ও মাদকের চালান ধরা পড়লেও মূল কুশীলবরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, সমাজের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

দুই.

এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে রাজধানীতে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। গত ১ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ছয় দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৭৪৬ জন, অর্থাৎ বর্তমানে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচজনের বেশি ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিগার নাহিদ দিপু (৪২) নামে এক চিকিৎসকের মৃত্যু হয়। মাত্র দুই দিনের জ্বরে একজন চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনায় ডেঙ্গু নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা সর্বমোট দুই হাজার ৬৬৪ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এপ্রিলে দুজন ও জুলাই মাসে একজনসহ মোট তিনজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গত দুই দশকে ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশার কামড়ে ২৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু সরকারি হিসাবেই এ সময়কালে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শয্যাশায়ী হয়েছে ৫২ হাজার ৮৪০ জন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এডিস মশা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণত প্রতিবছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। ডেঙ্গুতে আক্রান্তরা নাক ও দাঁত দিয়ে এবং কাশির সময় রক্তক্ষরণে ভুগে থাকে। এ ছাড়া আক্রান্তরা পিঠ, দাঁত, মাথা ও চোখের পেছনে ব্যথা অনুভব করে। চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে আক্রান্তদের অবস্থার উন্নতি না হলে তাদের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার আগে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ারও দরকার নেই। চিকিৎসকরা এ ক্ষেত্রে সচেতনতার কথাও বলেন। বিশেষ করে রোগীকে বেশি মাত্রায় পানি কিংবা শরবত খাওয়ানো যেতে পারে। দিনের বেলায়ও ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা উচিত।

বাসায় খোলা পাত্রে জমে থামা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। এ ছাড়া ফুলের টবে জমে থাকা পানি, টায়ারের খোল, ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দা অথবা পানির চৌবাচ্চায় এই মশা নির্বিচারে বংশ বিস্তার করে। আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত কারণেও ডেঙ্গুর বিস্তার হচ্ছে। ছেড়ে ছেড়ে আসা বৃষ্টির কারণেও এডিস মশার বংশ বিস্তার ঘটছে এবং সে কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ছে।

প্রাথমিক অবস্থায় ১০২ ডিগ্রি ও এর চেয়ে বেশি জ্বর, সঙ্গে তীব্র মাথা ও শরীর ব্যথা, বিশেষ করে হাড়ে, তীব্র পেট ব্যথা, স্কিন র‌্যাশ ইত্যাদির সঙ্গে বমিভাব ও ক্ষুদামন্দা থাকলে তার ডেঙ্গু হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। এ অবস্থায় অনেকে আতঙ্কিত হয়ে অ্যান্টিবায়োটিকসহ নানা ধরনের ওষুধ খেয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর প্রশমনে শুধু প্যারাসিটামল ও প্রচুর পানি খেলেই চলে। তবে অবস্থার অবনতি হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ ও শিশুদের ক্ষেত্রে।

বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত এক দশকে প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে বলা হয়েছে। বিশ্ব জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের দুই ভাগই অর্থাৎ ২৫০ কোটি লোক ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ৭০ শতাংশই এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে বাস করে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে হলে মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে আরো সক্রিয় হতে হবে, যাতে এডিস মশার সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। এ লক্ষ্যে সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মানুষজনকে সচেতন করে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।

তিন.

হঠাৎ করেই দাম বৃদ্ধির হিড়িক পড়েছে। নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধেরও দাম বাড়ছে হু হু করে। এসব দেখার যেন কেউ নেই। মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষজন দুর্ভোগে পড়বে আর কর্তৃপক্ষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে, এটি হতে পারে না। জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কয়েক দিন আগে থেকেই বেড়েছে গ্যাসের দাম। এখন নিত্যপণ্যের বাজারেও আগুন। বেড়েছে পেঁয়াজ, ডিমসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম। ৯৫ টাকা ডজন ডিমের দাম হয়েছে ১২০ টাকা। অন্যদিকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দামও বেড়েছে। উচ্চ রক্তচাপের জন্য ব্যবহৃত বাইজোরান ট্যাবলেটের এক পাতার দাম ছিল ১৪০ টাকা। এখন তা বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। একইভাবে বেড়েছে অন্য ওষুধের দামও।

মূল্যবৃদ্ধির জন্য নানা অজুহাত দেখানো হচ্ছে। কিন্তু পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদও রয়েছে। তাই দাম বাড়ার বিষয়টি কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য নাগালের বাইরে, তার ওপর নতুন করে দাম বাড়ায় যেন বাজ পড়ছে ভোক্তাদের মাথায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলো দেখার কি কেউ নেই?

কথায় আছে, দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। এক শ্রেণির মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর লাভ ও লোভের কারণেই যে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। মুনাফালোভী এই মানসিকতা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সরকারের হাতে খুব একটা নেই। তার পরও টিসিবিকে কার্যকর করে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা যায়।

যেকোনো অসিলায় দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই নেই এখানে। বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং সিন্ডিকেটধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। অবিলম্বে নিত্যপণ্য ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল্য জনসাধারণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে যার যা করণীয় রয়েছে সেটি করতে হবে। সরকার-ব্যবসায়ী সব পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

[email protected]

মন্তব্য