kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৩ আগস্ট ২০২০ । ২২ জিলহজ ১৪৪১

সাক্ষাৎকার

পুঁজিবাদের অতিভোগবাদী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন

জোসেফ স্টিগলিৎস

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পুঁজিবাদের অতিভোগবাদী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন

বিশ্বায়ন মাত্র গুটিকয়েক লোকের অনুকূলে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে সরকারের যা করণীয় তা হচ্ছে, পুনর্বণ্টন ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে জাহির করা; কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। ক্ষোভের সঙ্গে এ মন্তব্য করেছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিশ্লেষক এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ স্টিগলিৎস। তাঁর ক্ষোভের কারণে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়েছে। সম্পদের বৈষম্য এখন গরম রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘পিপল, পাওয়ার অ্যান্ড প্রফিটস : প্রগ্রেসিভ ক্যাপিটালিজম ফর অ্যান এজ অব ডিসকনটেন্ট’-এ তিনি তাঁর মধ্যবাম অর্থনৈতিক ধারণার, নীতি-প্রস্তাবের ব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পুঁজিবাদের অতিভোগবাদী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। বাজার যখন বেকায়দা অবস্থায় পড়ে, তখন স্বাস্থ্যসেবা, মর্টগেজ প্রভৃতি বিষয়ে ‘সুযোগ সৃষ্টি’ করে রাষ্ট্র সেটা করতে পারে। সম্প্রতি নতুন বইটিকে কেন্দ্র করে দি ইকোনমিস্ট জোসেফ স্টিগলিেসর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। সেটি কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো

 

প্রশ্ন : ডানপন্থী জনপ্রিয়তাবাদীরা ভুল নয়; আর পুঁজিবাদ কার্যত নানা কারিকুরির শিকার হয়েছে—এ কথা বলতে চাচ্ছেন আপনি। বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন।

স্টিগলিৎস : আক্ষরিক অর্থেই পুঁজিবাদ কারিকুরির শিকার হয়েছে। কিছু লোক ধনী ও প্রভাবশালী এবং তাদের সন্তানরা অন্যদের চেয়ে ভালো মানের ও বেশি সুবিধা পাচ্ছে। তাদের জন্য বাড়তি সুবিধার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত প্রতিযোগিতামূলক ও সম-সুবিধার ক্ষেত্র নেই। প্রায় প্রতিটি খাতে গুটিকয়েক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান প্রায় অলঙ্ঘনীয় বাধা সৃষ্টি করছে। প্রচুর লোক সম্পদশালী হয় জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে নয়; বরং শোষণের মাধ্যমে অন্যদের কাছ থেকে বড় অংশ ছিনিয়ে নিয়ে। তারা এটা করে বাজার-শক্তি, তথ্য-সুবিধা বা অন্যদের নাজুকতা-দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে।

প্রশ্ন : এ পরিস্থিতি কিভাবে সৃষ্টি হলো? এর সবটাই কি রিপাবলিকানদের দোষে হয়েছে? এতে ডেমোক্র্যাটদের কোনো ভূমিকা আছে কি?

স্টিগলিৎস : এ নিয়ে বরাবর একটা লড়াই চলছে। ধনী ও ক্ষমতাধররা সব সময় এ অবস্থা বজায় রাখতে চায় এবং সুবিধা বাড়াতে চায়, যখন অন্যদের জীবন বিপন্ন হয় তখনো। অসংগতি দূর করার উদ্যোগেও তারা বাধা দিয়েছে—অ্যান্টিট্রাস্ট আইন, প্রগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন ও ব্যয় নীতি অথবা শ্রমবিনিয়োগের বিষয়ে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। কিন্তু উনবিংশ শতকের শেষ থেকে প্রেসিডেন্ট জনসন পর্যন্ত একগাদা প্রগতিশীল সংস্কারের মাধ্যমে এসব বিষয়ে অগ্রগতি সাধন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টি করেছে।

এরপর প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের সঙ্গে নতুন মতবাদ হাজির হলো—সব বাজারের ওপর ছেড়ে দাও; এতে অর্থনীতি বিকশিত হবে, সবার অবস্থার উন্নতি হবে। এটাই ট্রিকল-ডাউন ইকোনমিকস হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাস্তবে প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেল, অধিকংশের আয় স্থবির হয়ে পড়ল। কিছু ডেমোক্র্যাটকেও এমন মতবাদের পক্ষে আনা হলো, এ মতবাদের অনুষঙ্গী হলো অনিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়ন ও আর্থিকায়ন (ফিন্যানশিয়ালাইজেশন)।

ট্রাম্প আসার পর পক্ষগুলোর মধ্যে বিভাজন সর্বোচ্চ মাত্রায় বেড়েছে। রিপাবলিকানরা এমন সব নীতির কথা বলছে, যার ফলে একদিকে বৈষম্য আরো বাড়বে, প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হবে; অন্যদিকে করপোরেশনগুলোর মুনাফা ও ক্ষমতা বাড়বে এবং শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের বঞ্চনা আরো বাড়বে।

ব্যাংকগুলোকে সংযত করার এবং পরিবেশ সুরক্ষার চিন্তাভাবনা ছেঁটে দেওয়া হচ্ছে, পাশে ঠেলে রাখা হচ্ছে; সাধারণ মার্কিনিদের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হচ্ছে; করপোরেশন ও ধনীদের ওপর কর কমানো হচ্ছে; ওষুধ ও স্বাস্থ্যবীমা কম্পানির মুনাফা বাড়ছে—অথচ লাখ লাখ মার্কিনি স্বাস্থ্যবীমা-সুবিধা থেকে ছিটকে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং সমাজের নিচের তলার লোকদের বেতন-মজুরি মূল্যস্ফীতির অনুপাতে সমন্বিত হওয়ার পরও ৬০ বছর আগে যে পর্যায়ে ছিল সে পর্যায়েই আছে।

প্রশ্ন : আপনি অনেক সমাধানের কথা বলেছেন। সেসবের মধ্যে কোনগুলোকে (একটি বা দুটি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

স্টিগলিৎস : আমার সমাধান-ভাবনার মূলে রয়েছে নতুন সামাজিক চুক্তি। আমি যাকে ‘প্রগতিশীল পুঁজিবাদ’ বলি তার ভিত্তিতে বাজার, রাষ্ট্র ও সুধীসমাজের মধ্যে নতুন করে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ ভারসাম্য সামাজিক অবস্থাকে আরো সমতাপূর্ণভাবে ভালো করার জন্য বাজার ও সৃজনশীল উদ্যোগের সক্ষমতা নিশ্চিত করে। এটা করতে হলে অর্থনীতির বিধি-বিধান পুনর্লিখন করতে হবে। যেমন—একুশ শতকের প্রযুক্তি-বাজারের ক্ষমতা এবং দানবাকৃতির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা খর্ব করতে হলে; বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়াকে শুধু করপোরেশনগুলোর জন্য নয়, সাধারণ মার্কিনিদের জন্যও কাজ করাতে হলে; আর্থিক খাতকে অন্যদের জন্য নয়, অর্থনীতির সেবায় নিয়োজিত করাতে হলে বিধি-বিধান নতুন করেই লিখতে হবে।

নতুন সামাজিক চুক্তি প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে বর্ধিত বিনিয়োগের কথা বলে। এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আমাদের সহযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলে। প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল বলেই আমাদের জীবনমান ও প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল দুই শ বছর আগে যা ছিল এখন তার চেয়ে বেশি।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন অস্তিত্বের সংকটের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই সব রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ও বিধি-বিধানকে ‘গ্রিন ইকোনমি’ সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিচালিত করতে হবে। মধ্যবিত্তের জীবনমান বেশির ভাগ নাগরিকের জন্যই অর্জনযোগ্য—এটা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে ‘পাবলিক অপশন’ হতে হবে, অর্থাৎ মর্টগেজ, অবসরকালীন নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এসব ক্ষেত্রে এটি হবে বিকল্প সরকারি ব্যবস্থা।

প্রশ্ন : আপনার সংস্কার প্রস্তাবের ব্যাপারে সরকারের আরো ভূমিকা পালন করার বিষয় রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রকে আরো অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারে সরকার যদি অক্ষম হয়, তাহলে সেটা হবে শিশুর হাতে ড্রিল-মেশিন তুলে দেওয়ার মতো বিষয়। কে জানে তাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে! আপনার মধ্যে কি উদ্বেগ কাজ করে না? বিপর্যয়ের জন্য যে ব্যবস্থা দায়ী, সেটি যদি বিপর্যয় মোকাবেলায় অক্ষম হয় তাহলে আপনার সমাধান-প্রস্তাব মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

স্টিগলিৎস : সব মানুষ এবং মানবসৃষ্ট সব ব্যবস্থাই ব্যর্থ হতে পারে। সরকারি খাত ও ব্যক্তি খাত—সব খাতের জন্যই এ কথা সত্য। ২০০৮ সালে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো কী বিপর্যয় ডেকে এনেছিল সেদিকে খেয়াল করুন। জিডিপির ক্ষতি হয়েছিল; এখন হিসাব করে দেখা গেছে, ইউরোপ ও আমেরিকায় সম্মিলিতভাবে এর পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।

কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সরকার ভালো করতে পারে এবং করেছে—আমেরিকাতেও। সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা উভয় খাতে একই ধরনের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যয় বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারি খাতে কম। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে প্রণোদনা দেওয়ার ব্যাপারে আধুনিক অর্থনীতি দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উপকরণ সরবরাহ করে আমাদের বিবেচক করেছে, বুদ্ধিমান করেছে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স ব্যবস্থা ও মুক্ত গণমাধ্যমের সক্রিয়তার বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই।

প্রশ্ন : রাজনীতির ক্ষেত্রে আপনার মতের সপক্ষে প্রচুর সাক্ষী-সাবুদ হাজির করেছেন আপনি। রাজনীতির ক্ষেত্রে এসব যদি আমলে নেওয়া না হয় তাহলে তো এসবের কোনো অর্থই হয় না। তাহলে আপনার সংস্কার-প্রস্তাবের গৃহীত হওয়ার কী সম্ভাবনা রয়েছে? কিভাবেই বা গৃহীত হবে যদি না আপনি নিজেই লড়াই করতে নামেন?

স্টিগলিৎস : আমি একজন ‘মিডওয়েস্টার্ন’ আশাবাদী লোক। যা কিছু ঘটছে তার নিরিখে এ মতাদর্শিক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন কাজই বটে। যা-ই হোক, আমি বিশ্বাস করি, বেশির ভাগ মার্কিনিকে যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে পরিবর্তনমুখী করা, সক্রিয় করা সম্ভব হবে। আমি এটাও বিশ্বাস করি, মানুষের আবেগের বিষয়টিও প্রগতিশীল পক্ষেই আছে। কিছু একটা অ-মার্কিন বিষয় রয়েছে আমাদের বাস্তবতায়; ২০ শতাংশ মার্কিন শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হচ্ছে, এটা মার্কিন বৈশিষ্ট্য নয়। গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তারা এ ক্ষমতার পুনঃপৌনিক অপব্যবহার করে।

জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ আমার বইয়ের উল্লিখিত নীতি-প্রস্তাব সমর্থন করে এবং তারা সত্যিকারের গণতন্ত্রের পুনর্বহাল চায়। রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব ও ভূমিকা খর্ব করতে হবে এবং সুবিধাবঞ্চিত করার প্রয়াসের অবসান ঘটাতে হবে আমাদের। আমরা ২০১৮ সালে রাজনীতির যে চর্চা দেখেছি এবং ঝুঁকির বিষয়ে তরুণসমাজের যে বর্ধমান সচেতনতা দেখেছি, তাতে আশা করা যায়, প্রগতিশীল মূল্যবোধের দিকে দেশের প্রত্যাবর্তনের জন্য পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করছে এসব বিষয়।

অনুবাদ : সাইফুর রহমান তারেক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা