kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পুরুষের জাগরণ প্রয়োজন

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পুরুষের জাগরণ প্রয়োজন

সতীদাহ প্রথা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। সমাজ-সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রথাগত নারী নির্যাতনও কমেছে। উচ্চপদে অধিষ্ঠিত নারীরাও অধিক মর্যাদা ভোগ করছেন। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে সুযোগসন্ধানী পুরুষদের বর্বরতাও যেন মহামারির রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক নারী নির্যাতনের কিছু ঘটনা, চিত্র ও নির্যাতনকারীর যুক্তি, তত্ত্ব, দর্শন, আড়ম্বর, দম্ভ এতটাই ফুলেফেঁপে উঠছে যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর নিরাপদ জীবনযাপনের বৈধতা নিয়ে। সে কারণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জেন্ডার নিরপেক্ষ বা নারী অধিকার বাস্তবায়নের অগ্রণী পুরুষরা প্রথাগত জেন্ডার নিরপেক্ষ সভ্যতার প্রলেপ কি না।

এ কথাও ঠিক যে নারী নির্যাতনের বেশির ভাগ ঘটনার পেছনে পুরুষের যৌন চাহিদার বিষয়টি থাকে। বাংলাদেশের প্রথাগত সভ্যতায় যৌন সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন পরিবার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিকতা ইত্যাদি। যৌন ও প্রজননমূলক প্রয়োজনেই নারী-পুরুষের সম্মিলন এবং অব্যাহত অস্তিত্ব। সমাজ স্বীকৃত প্রক্রিয়ায় এ যাত্রা শুরু হয় বিয়ের মধ্য দিয়ে। পরিবারে একটি ছেলে বা মেয়ে যৌন ক্ষমতাসম্পন্ন হলেই তাদের বিয়ের প্রশ্ন ওঠে। গ্রাম এলাকায় সাধারণত লায়েক, ডাঙর, সাবালক ইত্যাদি যৌনসক্ষমতা নির্দেশ করে। অথচ যৌনক্রিয়া ও যৌন হয়রানি দুুটি ভিন্ন বিষয়। যৌন হয়রানি হচ্ছে অযাচিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত যৌনপ্রকৃতির কোনো আচরণ অথবা অন্য কোনো ধরনের যৌন আচরণ, যা পুরুষ বা নারীর মর্যাদাহানি করে।

ব্যাপকভাবে বলা যায়, যৌন ইঙ্গিত প্রচ্ছন্ন শারীরিক বা ভাষাগত আচরণ, যৌনকটূক্তি, শারীরিক স্পর্শ, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, ইভ টিজিং, স্পর্শকাতর অঙ্গে স্পর্শ, ধাক্কা দেওয়া, চিমটি কাটা, যৌনাঙ্গ প্রদর্শন, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা রসিকতা, চিঠি, ই-মেইল, ফেসবুক, টেলিফোন, মুঠোফোন, এসএমএস, পোস্টার-নোটিশ বোর্ড, দেয়াল লিখন, স্থিরচিত্র বা ভিডিও ইত্যাদির মাধ্যমে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ যৌন হয়রানির অন্তর্ভুক্ত। কোনো মানুষকে, বিশেষ করে কোনো নারী বা কিশোরীকে তার স্বাভাবিক চলাফেরা বা কাজকর্ম করা অবস্থায় অশালীন মন্তব্য করা, বিকৃত নামে ডাকা, কোনো কিছু ছুড়ে দেওয়া, চেহারা-সৌন্দর্য নিয়ে ব্যক্তিত্বে লাগে এমন মন্তব্য করা, ধিক্কার দেওয়া, যোগ্যতা নিয়ে টিটকারি করা, অহেতুক হাস্যরসের উদ্রেক করা, ধাক্কা দেওয়া, ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারা দেওয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, সিগারেটের ধোঁয়া গায়ে ছোড়া, উদ্দেশ্যমূলকভাবে পিছু নেওয়া, অশ্লীলভাবে প্রেম নিবেদন করা, মিথ্যা আশ্বাস, প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা, বিপরীত লিঙ্গের সদস্যকে বিপর্যস্ত ও উত্ত্যক্ত করতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে গান, ছড়া বা কবিতা আবৃত্তি করা, চিঠি লেখা, পথ রোধ করে দাঁড়ানো, গায়ে হাত দেওয়া, প্রেমে সাড়া না দিলে হুমকি দেওয়া ইত্যাদি যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে। 

বর্তমানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ফেসবুক, ভাইবার, টুইটার প্রভৃতির মাধ্যমেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। এই হয়রানি মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদের বেলায়ও, এমনকি সমলিঙ্গের ব্যক্তিদের মধ্যেও বিদ্যমান। এই নিপীড়নের বেশির ভাগই হয়ে থাকে নিজের ঘর, আত্মীয়, পরিচিতজন ও বন্ধুবান্ধবের দ্বারা। যৌন নির্যাতনের মতো যৌন হয়রানিতে বাহ্যিক কোনো লক্ষণ না থাকায় এতে আক্রান্ত মেয়েদের সমাজে বেশ বিপদে পড়তে হয়। যারা যৌন হয়রানির শিকার হয় তারা বা তাদের অভিভাবকরা সামাজিক দিকের কথা চিন্তা করে এ ধরনের হয়রানি নীরবে সয়ে যান।

বাংলাদেশে নারীকে প্রথাগত যৌন হয়রানি থেকে নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন আইন প্রণীত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। নির্যাতিতা নারীকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্যও সুযোগ-সুবিধা বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও রয়েছে। প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পরিবার সাধারণত পুত্র ও কন্যা সন্তানকে সমদৃষ্টিতে দেখে না, পুত্র ও কন্যা সন্তানের প্রতি সমান মূল্য আরোপ করে না। কন্যাসন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের নিয়ম-কানুন ও পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে সহজেই বুঝতে পারে যে সে ওই পরিবারের জন্য বোঝাস্বরূপ। ফলে কন্যাসন্তান সামাজিক দিক থেকে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বস্তুত তাদের পরনির্ভরশীলতা চলতে থাকে পর্যায়ক্রমে সারা জীবন ধরেই।

বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতি ও তার চর্চাও জেন্ডার নিরপেক্ষ নয়, সুস্থ বিনোদননির্ভরও নয়। অনেকাংশেই তা দেশীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের অযাচিত ব্যবহার এমন কিছু ঘটনা, শব্দ ও দৃশ্যচিত্রের জন্ম দেয়, যা থেকে নারী-নিপীড়নমূলক অপরাধের আবেদন-সংক্রমণ বাড়তে পারে—নষ্ট পুরুষের বেলায় তা বেশি প্ররোচনার। ফলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে গোপন-আড়ালের সঙ্গে প্রকাশ্যেই শুরু হয় পুরুষালি চর্চা, যা প্রকারান্তরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী নির্যাতনের প্রথাগত বৈধতা।

নারী-শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনায় আজ শঙ্কিত, স্তম্ভিত, লজ্জিত, আতঙ্কিত অনেক পুরুষ, অভিভাবক, মা-বাবা। কারণ পুরুষও মানুষ—মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। কিছু নষ্ট মানুষের পুরুষালি বর্বরতায় গোটা পুরুষসমাজ যেন নিন্দিত না হয় সেদিকে সোচ্চার হওয়া জরুরি। তাই নারী-পীড়নের এ বিধ্বংসী উৎসব থেকে জাতিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য নারীর সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পুরুষেরও জাগরণ প্রয়োজন। সব পুরুষই নির্যাতনকারী নয়, নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রনেতাও কোনো কোনো পুরুষ। অন্তত সেই দায়বদ্ধতা থেকে জেন্ডার বৈষম্যহীন মানবিক পুরুষের বেশি সোচ্চার হওয়া জরুরি।

লেখক : শিক্ষা ও জেন্ডার উন্নয়ন গবেষক

মন্তব্য