kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা, অন্যদের প্রতি কি অনাস্থা!

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা, অন্যদের প্রতি কি অনাস্থা!

আওয়ামী লীগ একটানা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। সংগত কারণে দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান বেশ মজবুত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকায়। এমনকি দলের প্রধান এবং সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। দেশে যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলায় শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেশের ছোট-বড় সব সমস্যা সমাধানেই তাঁর ভূমিকা সামনে আসছে। এমনকি আমরা এমনটাই মনে করছি, সব কিছুই তিনি করবেন। প্রায়ই ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেখে থাকি, সাংবাদিকদের সামনে ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে। এর অর্থ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ কিংবা তাদের প্রতি আস্থা নেই। আর যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ব্যতিরেকে কারো প্রতিই আস্থা রাখা যাচ্ছে না, সবাই মনে করছে ছোট-বড় সব সমস্যা তিনি (প্রধানমন্ত্রী) নিজ হাতেই সমাধান করবেন। এ কারণেই সবার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে। অথচ একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সমস্যা সমাধানের সংশ্লিষ্ট যথাযথ মাধ্যম রয়েছে। সব ছোট-বড় সমস্যার সমাধান এবং সমাধানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা কতটুকু যৌক্তিক সেই প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক ষড়যন্ত্র দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং দূরদর্শিতায় সেগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে সহজেই। আর সে কারণেই বিগত অনেকটা সময় ধরেই দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইস্যুটি সামনে এসেছে। এমনকি অনেকটা অস্থিতিশীল পরিবেশের সূত্রপাতও হয়েছে। বরগুনায় কুপিয়ে রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে সিভিল সোসাইটিসহ সবাই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করে। অবশ্য এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরগুনায় প্রকাশ্যে বলেন, রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাকে তিনি সার্বিকভাবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলে মনে করছেন না। তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে কেন, আমাদের পুলিশ বাহিনী তো সঙ্গে সঙ্গে কাজ করছে। এ ধরনের দু-একটি ঘটনা আগেও ঘটেছে। ফেনীতে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের পিবিআই তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে আসলে যারা জড়িত তাদের ধরে আদালতে সোপর্দ করেছে। আমাদের পুলিশ অনেক দক্ষ। তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে।’ রিফাত হত্যার পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি না, সেটি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। প্রকাশ্যে জনসাধারণের সম্মুখে রিফাত হত্যার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ বিষয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে কিছুটা গড়িমসি লক্ষ করা গেছে। পরবর্তী সময়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে সম্মান জানিয়েই বলতে চাই, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ নিজ দায়িত্বে কাজ করলে প্রতিটি ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে কেন সিদ্ধান্ত দিতে হয়? কেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ইস্যুতে তৎপরতা দেখা যায়? কেন অন্য বিষয়গুলোকে গুরুত্বসহকারে দেখা হয় না? কেন প্রধানমন্ত্রী তাগিদ না দেওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে ধীরগতি কাজ করে? এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জানা আছে।

অনেক ক্ষেত্রেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিতর্কিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সম্প্রতি সোনাগাজীর ওসির কর্মকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাঁকে রংপুরে পদায়ন, আবার সাধারণ জনগণের প্রতিবাদে তাঁকে প্রত্যাহার প্রভৃতি ঘটনা সবাইকে অবাক করেছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যথাযথ ভূমিকা নিয়ে। একজন অপরাধীকে বাঁচানো এবং তা নিয়ে পানি ঘোলা করার অপতৎপরতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক কোনোভাবেই মানানসই নয়।

গত ৩ জুন ঢাকার উত্তরায় আড়ংয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার অভিযান চালিয়ে পণ্যের দাম বেশি রাখার দায়ে জরিমানার পাশাপাশি আউটলেটটিকে এক দিনের জন্য বন্ধ করে দেন। ওই দিনই ওই কর্মকর্তাকে খুলনায় বদলির আদেশ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আদেশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতভর সমালোচনা হয়। সে সময় ফিনল্যান্ড সফররত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তাঁর বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। পরে মঞ্জুর শাহরিয়ারের বদলির আদেশের সমালোচনা করে এবং অভিযানের গুরুত্ব তুলে জাতীয় সংসদে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১২ জুন সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই রোজার সময়, তখনো আমি দেশের বাইরে ছিলাম। বেশ কিছু বড় জায়গায় একজন অফিসার হাত দিল বলে তার বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা হঠাৎ করে নেওয়া হলো, এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না; বরং আমি আজও বলে দিয়েছি যে তাকে আবার ওই দায়িত্বেই দিতে হবে।’

এ ক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হলো, যিনি বা যাঁরা এই বদলি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থা কি করা হয়েছে? দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে প্রতিটি স্পর্শকাতর বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বাধ্য হয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। তা না হলে পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

ইদানীং লক্ষ করা যায়, যেকোনো বিষয়ে ভুক্তভোগীরা গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে থাকে। যে কাজটির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই, সে ক্ষেত্রেও সাধারণ জনগণের একটিই আস্থার জায়গা, প্রধানমন্ত্রী। তাহলে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্য কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী? তাঁদের প্রতি জনসাধারণের আস্থা নেই কেন?

দেশে অহরহ নানা অন্যায়, অপকর্ম হচ্ছে। সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি বরগুনার হত্যাকাণ্ডেও রাজনৈতিক গডফাদারদের রহস্যময় বেড়াজাল লক্ষ করা গেছে। অবশ্য ওই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি নয়ন বন্ড ২ জুলাই ভোররাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে এ বিষয়ে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট সাধুবাদ পেয়েছে। কিন্তু রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য অপরাধী এবং গডফাদারদের বিষয়েও ত্বরিত পদক্ষেপ দেশবাসী দেখতে চায়। উল্লেখ্য, যে হত্যাকাণ্ড কিংবা ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোটেও তোলপাড় সৃষ্টি করতে পারে না এবং প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দেশনা আসে না, সেগুলোর বিষয়ে কি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ হয়?

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য