kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

সমাজের বোঝা শিশুর কাঁধে

মো. তৌহিদ হোসেন

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সমাজের বোঝা শিশুর কাঁধে

তরুণ বয়সে খুব অলস ছিলাম বলা যাবে না। ক্যাডেট কলেজে পড়তাম। কাজেই প্যারেড পিটি তো ছিলই। সেই সঙ্গে ৮০০ আর এক হাজার ৫০০ মিটার দৌড়াতাম এবং বাস্কেটবল খেলতাম। বিশ্ববিদ্যালয়েও এটা অনিয়মিতভাবে বহাল ছিল। আন্ত হল প্রতিযোগিতায় এসএম হলের হয়ে বাস্কেটবল খেলেছি, দৌড়াতাম এক হাজার ৫০০ আর পাঁচ হাজার মিটার। অর্থাভাব এবং অন্যান্য কারণে হাঁটতামও প্রচুর। চাকরিতে থিতু হওয়ার পর আস্তে আস্তে আলসেমি ধরল, নিয়ম ধরে আর কোনো শরীরচর্চায় রত থাকিনি। খেতাম বেশ, তার মাঝে মিষ্টিও প্রচুর। জেনেটিক কারণে কি না, জানি না। মোটা হয়ে যাইনি তবু। ২০১০ সালে ডাক্তার বললেন, বর্ডারলাইন ডায়াবেটিস, নিয়মিত এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে প্রতিদিন। সেই থেকে আবারও নিয়ম ধরে হাঁটা শুরু।

বেইলি রোডে কাহকাশান নামের সরকারি বাসায় থাকি, রমনা পার্ক খুবই কাছে। রোদ-বৃষ্টির পরোয়া না করে প্রতি সকালে হাঁটতে যাই। গেটের কাছে ফলমূল নিয়ে কিছু ফেরিওয়ালা থাকে, থাকে কিছু ভিক্ষুকও। সেদিন হাঁটা শেষে গেটের ভিড় ছাড়িয়ে মাত্র এগিয়েছি, ঊরুর কাছে প্যান্টের পেছনে কেউ হালকা টান দিল টের পেলাম। ভিক্ষা চাইছে নিশ্চয়ই কেউ, খুব বিরক্তিসহকারে মাথা ঘুরিয়ে ধমক দিলাম। ‘এই!’ মুখ নামিয়ে নিচে তাকাতে হলো। কারণ যে মানুষটি প্যান্ট ধরে টান দিয়েছে, তার উচ্চতা বড়জোর আড়াই ফুট। বছর পাঁচেকের একটি মেয়ে, খালি পা, গায়ে অতি মলিন একটি জামা, ধমক খেয়ে ঘুরে চলে যাচ্ছে। তার হাতে ছোট্ট একটি কাঠি আর তাতে ঝুলছে তার মতোই মলিন দুটি বকুল ফুলের মালা। মালা দুটি বিক্রির আশায় তার শীর্ণ ছোট্ট হাতে সে আমার প্যান্ট ধরে টেনেছিল।

বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। ‘শোন, এদিকে আয়’ মৃদু স্বরে ডাক দিলাম, সে ফিরে এলো। মায়াভরা নিষ্পাপ দুটি চোখ তুলে তাকাল আমার দিকে। একটু কী বিষণ্নতাও মিশে আছে তাতে। মালার দাম জিজ্ঞেস করলাম, ১০ টাকা করে একেকটা। ২০ টাকায় মালা দুটি কিনলাম। কোনো কথা না বলে টাকাটা নিয়ে সে চলে গেল। একবার ভাবলাম, ওকে ডেকে আরো ৫০টি টাকা দিয়ে দিই। কী ভেবে সেটা আর করলাম না। ৫০ টাকায় তার ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। যে পাঁচ বছরের শিশুকে জীবিকার জন্য মালা বেচতে বেরোতে হয়েছে, তাকে দয়া দেখিয়ে আর অপমান না-ই বা করলাম।  

আমার একটি নাতনি আছে, কমবেশি একই বয়সের। খাবার কিভাবে জোগাড় হবে, সেটা তাকে ভাবতে হয় না। অফিসে যাওয়ার আগে বাবা তাকে গাড়ি করে স্কুলে পৌঁছে দেয়, ছুটির আগে মা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলের গেটে। রিকশায় উঠে হুড তুলে দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখে পুরো পথ।

শনিবারে সে ছবি আঁকা শিখতে যায়। আমাদের বাসায় যেদিন আসে, কোথাও খেতে যাই তাকে নিয়ে। ফেরার পথে চকোলেট কিনে দিই কোনো সুপারমার্কেটে ঢুকে। আদর আর নিরাপত্তার চাদরে ওকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করি সবাই।

আদর আর নিরাপত্তা তো দরকার আমার সেই মালা বিক্রেতা শিশুটিরও। এই সমাজের দায়িত্বজ্ঞানহীন কোনো মা-বাবা তাকে প্রাকৃতিক নিয়মে জন্ম দিয়েছে। এমনও হতে পারে, বাবা হয়তো তার জন্মের আগেই অন্য কোনো বস্তিতে অন্য কোনো রমণীর সঙ্গে ঘর বেঁধেছে। যত দুর্দশাই হোক, মা তো আর সেটা করতে পারে না। তাই হাঁটতে শেখার পরেই তাকে পথে নামিয়ে দিয়েছে রোজগার করে খেতে।

অনেক বছর তো হয়ে গেল, আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, এখন কী করে সেই মেয়েটি। সে তো এখন বয়ঃসন্ধি পার করছে। এখনো কি সে মালা বেচছে ঢাকার পথে, নাকি কোনো বাসায় ঝিয়ের কাজ করে? সে বাসার গৃহকর্ত্রী কি সদয় আচরণ করেন ওর সঙ্গে, নাকি কথায় কথায় চড়-থাপ্পড় মারেন? এর চেয়েও আরো অন্ধকার কোনো পথে ওকে ঠেলে দেয়নি তো কেউ?

২.

১৪ বছরের কিশোর শাহীন এনজিওর ঋণে কেনা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়েছিল জীবিকা অর্জনে। শাহীনের বাবা জটিল রোগে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী। পরিবারে কর্মক্ষম আর কেউ নেই। এই কিশোরের কাঁধে তাই দায়িত্ব পড়েছে পরিবারের সবার অন্ন সংস্থান করার। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো সেই দায়িত্ব সে পালনও করছিল। কেশবপুর থেকে পাটকেলঘাটা যাওয়ার জন্য তার অটোরিকশা ভাড়া করেছিল চার-পাঁচজন লোক। যাত্রীবেশী দুর্বৃত্তরা এক পাটক্ষেতের পাশে শাহীনকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে তার গাড়িটি নিয়ে চলে যায়। তাকে আর না মারতে অনেক অনুরোধ করেছিল শাহীন। দুর্বৃত্তরা তাতে কান দেয়নি। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর তার কান্না শুনে লোকজন এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার রক্তাক্ত ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। শাহীন এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, অবস্থা এখনো শঙ্কামুক্ত নয়। সেরে উঠলেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে সে আবার ফিরে যেতে পারবে, এমন সম্ভাবনা কম।

দুর্বৃত্তদের তিনজন এরই মধ্যে ধরা পড়েছে। পরিচয় দেখে মনে হয় এরা বড় কোনো চক্রের অংশ নয়, শক্তিধর কেউ বোধ হয় তাদের পেছনেও নেই। বিচারে হয়তো তাদের শাস্তি হবে। কিছুদিন পর বিষয়টি আমরা ভুলে যাব। ভুলে থাকব যত দিন না আরেকজন শাহীন এরূপ আরেকটি পাশবিকতার শিকার হয়।

কিশোর শাহীনের এখন স্কুলে থাকার কথা, জীবিকার অন্বেষণে এই বিপজ্জনক পেশায় লিপ্ত হওয়ার কথা নয়। একই কথা আমার সেই মালা বিক্রেতা মেয়েটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাজেটে দেখলাম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঘাটতি পূরণের জন্য এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘাটতি হয়েছে কারণ মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষমতাবান মানুষ ওই ব্যাংকগুলো থেকে এর চেয়ে বেশি অর্থ দিনে-দুপুরে চুরি করে নিয়ে গেছেন। শাহীনদের আর মালা বিক্রেতা শিশুদের অতল কৃষ্ণগহ্বর থেকে তুলে আনতে কত টাকা বরাদ্দ করেছে রাষ্ট্র?

একটি সমাজ সভ্য কি না, তার পরিচয় অনেকটাই দুটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরে প্রতিফলিত হয় : ১। শহরের পথে একা একটি মেয়ে রাত ১০টায় হেঁটে নিরাপদে তার বাসস্থানে ফিরতে পারে কি না; ২। সমাজ তার শিশুদের সুরক্ষা দেয় কি না। পদ্মা সেতু হবে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ হবে, মধ্যম আয়ের দেশ হবে, তবে সভ্য হতে আরো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে আমাদের।

লেখক : সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

মন্তব্য