kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

সভ্যতার কতটুকু ধ্বংস হলে ‘বিবর্তন’ হয়!

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সভ্যতার কতটুকু ধ্বংস হলে ‘বিবর্তন’ হয়!

২০১৫ সালের ঘটনা। সুইডিশ ট্যাক্স বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন একটি বার্তা আসে। বার্তায় জানানো হয়, চীন সরকারের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় গোপন করে দীর্ঘদিন ধরে সুইডেনে বসবাস করছেন। অজ্ঞাত বার্তা প্রেরক ট্যাক্স বিভাগকে আরো জানিয়েছিল যে চীনের ওই সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন চীন সরকারের খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং তিনি প্রায় এক হাজার কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করে চীন থেকে পালিয়েছিলেন। চীন সরকার সাত বছর ধরে বিশ্বের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজছে। এই খবরে সুইডিশ ট্যাক্স বিভাগ নড়েচড়ে বসেছিল এবং অত্যন্ত গোপনে তদন্ত চালিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পর ২০১৮ সালের ২৫ জুন ‘ভয়ংকর প্রতারণা ও কর্তৃপক্ষের প্রতি অবজ্ঞাসুলভ আচরণের’ কারণ দেখিয়ে সুইডিশ পুলিশ চীনের সেই সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিয়াও জিয়াংজুনকে (Qiao Jianjun) গ্রেপ্তার করেছিল।

অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যখন জিয়াংজুন চীনের খাদ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ছিলেন এবং হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে একই বছরের শেষের দিকে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। সুইডিশ পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার খবরে চীন সরকার জিয়াংজুনকে ফেরত চাইলে মামলার মোড় ঘুরে গিয়েছিল এবং তাঁকে যে কারণে সুইডিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল তার ওপর শুনানি না হয়ে উচ্চ আদালতে শুনানি হয়েছিল মূলত ‘চীনের কাছে জিয়াংজুনকে হস্তান্তর করা হবে কি না’ সে ব্যাপারে। আধুনিক বিশ্বে সভ্য ও মানবিক দেশ হিসেবে সুইডেন অত্যন্ত সুপরিচিত একটি দেশ, যেখানে মানবাধিকার রক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ স্থান পায় সর্বোচ্চে। অন্যদিকে পশ্চিমাদের চোখে চীন একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী দেশ, যেখানে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয় প্রতিনিয়ত। চীনে বন্দিদের ওপর নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ডের অনুশীলন খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়, যার বিরোধিতা করে পশ্চিমা বিশ্ব! সুতরাং চীন যখন সুইডেন সরকারের কাছে কিয়াও জিয়াংজুনকে ফেরত চাইল তখন সুইডেনের কাছে অপরাধের চেয়ে মানবাধিকারের প্রশ্নটি সর্বাগ্রে বিবেচিত হলো! প্রায় এক বছর শুনানি চলার পর এ বছর জুনের মাঝামাঝি সময় সুইডেনের উচ্চ আদালত জিয়াংজুনকে চীনে ফেরত না পাঠিয়ে বরং কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে উচ্চ আদালত এই রায়ের পক্ষে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন।

দীর্ঘ তদন্তের পর সুইডিশ পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, কিয়াও জিয়াংজুন চীনের খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ২০১১ সালের শেষের দিকে তাঁর সাবেক স্ত্রীসহ পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে তাঁদের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে গেলে ‘জাল ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং মানি লন্ডারিংয়ের’ অভিযোগে তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার  এড়িয়ে জিয়াংজুন সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন এবং ‘স্বর্গদ্বীপ’ খ্যাত একটি দেশে নিজের নাম ও পরিচয় গোপন করে নতুন নামে সে দেশের নাগরিকত্ব লাভসহ পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। বিপুল অর্থের বিনিময়ে স্বর্গদ্বীপখ্যাত দেশটির নাগরিকত্ব ক্রয় করা যায় এবং সে সুযোগটিই জিয়াংজুন নিয়েছিলেন। স্বর্গদ্বীপের পাসপোর্ট নিয়ে ২০১৪ সালে তিনি সুইডেনে আসেন এবং বিয়ে করে সুইডেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ লাভ করেন।

ঘটনার যবনিকাপাত এখানেই ঘটা উচিত ছিল। অন্তত জিয়াংজুন ও তাঁর আইনজীবী তা-ই ভেবেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম! মুক্তি পাওয়ার ঠিক চার দিনের মাথায় আবারও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এবার তিনি জানতেও পারলেন না কেন তাঁকে এক বছর পর মুক্তি দিয়ে আবারও গ্রেপ্তার করা হলো। শেষ পর্যন্ত মিডিয়ার তৎপরতায় জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্র সরকার সুইডেনের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে, যাতে জিয়াংজুনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং তাদের কাছে হস্তান্তর করে। সুইডেনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো নথি থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় জিয়াংজুনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের একটি মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সুইডেন সরকারকে অনুরোধ করেছে জিয়াংজুনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে, যাতে চাওয়ামাত্রই তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা যায়। রাষ্ট্রের এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় জিয়াংজুনকে চীনও ফেরত চেয়েছিল; কিন্তু চীনে নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার কথা ভেবে সুইডেন সরকার ও আদালত সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অথচ একই ব্যক্তির মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের জন্য যাবতীয় আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সুইডেনের সরকার ও তার বিচার বিভাগ! তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রে কারা নির্যাতন বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না? অবশ্যই হয়। এ ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির ব্যাপারে দুই পরাশক্তি দেশের প্রতি দুই ধরনের মনোভাব শুধুই সুইডেন তথা পাশ্চাত্যের দ্বৈত নীতির স্বরূপকে উন্মোচন করেছে মাত্র। অত্যন্ত স্পর্শকাতর জেনেও সুইডেনের এহেন আচরণ ও দ্বিচারী রাষ্ট্রনীতির প্রয়োগ এটাই প্রথম নয়। এ ক্ষেত্রে সুইডেন না বলে ‘ইউরোপ’ বলাটাই শ্রেয় এ জন্য যে মার্কিনদের ব্যাপারে ইউরোপের অন্যান্য দেশের নীতিও কমবেশি একই রকম।

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স ফ্রান্সের ১২ জন নাগরিককে ইরাকের হাতে তুলে দেয়, যারা ইসলামিক স্টেট অব সিরিয়ার (আইএসএস) পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্র ‘আগনেস ফনদের মুল’ তখন তাঁর দেশের নাগরিকদের ফেরত না চেয়ে উল্টো ইরাক সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেছিলেন, তাঁর দেশের ১২ জন নাগরিকের বিচার ইরাকি আইনেই হবে এবং এ ব্যাপারে ফ্রান্সের কোনো আপত্তি নেই। এর চেয়ে স্ববিরোধী বক্তব্য আর কী হতে পারে? গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরাকি প্রেসিডেন্ট বারহাম সালেহ ফ্রান্সে তাঁর রাষ্ট্রীয় সফরকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ১২ জন ফ্রেঞ্চ নাগরিকের বিচার হবে ইরাকি আইনে এবং এ ব্যাপারে তিনি ফ্রান্স সরকারের সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেছিলেন তখন। আটককৃত ফ্রান্সের ১২ জন নাগরিকের সবাই বিদেশি বংশোদ্ভূত এবং ইরাকি আদালত এরই মধ্যে চারজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রেও ফ্রান্স তথা ইউরোপের দ্বৈত নীতির সুস্পষ্ট অনুশীলন দেখা গেল। অথচ একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারে যখন বাংলাদেশের আদালত বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দিচ্ছিলেন তখন ফ্রান্সসহ সারা ইউরোপ সরব হয়েছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তখন তারা বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কোনো সম্মান দেখানোর প্রয়োজনই বোধ করেনি!

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ আরো একটি উদাহরণ, যাঁর বিরুদ্ধে একই সঙ্গে মানবাধিকার ও বাক্স্বাধীনতা হরণ হয়েছে নির্লজ্জভাবে এবং তা ইউরোপের সীমারেখার ভেতরেই। অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এমন কিছু গোপন এবং চক্রান্তমূলক নথি বিশ্বের সামনে উন্মুক্ত করে সারা বিশ্বের মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। ২০১০ সালে সুইডেনে এক চক্রান্তমূলক ধর্ষণের মামলায় তাঁকে ফাঁসানো হয়, যা মার্কিনদের চক্রান্তেই হয়েছে বলে অনেকে মত দিয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল অ্যাসাঞ্জকে বিচারের নামে বন্দি করে শেষে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া। এর আগেই  লন্ডনস্থ ইকুয়েডর এমবাসিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ায় অ্যাসাঞ্জকে আর ধরা যায়নি। তবে তদন্তের জন্য সুইডিশ পুলিশ ইকুয়েডর এমবাসিতে গিয়ে জবানবন্দি সংগ্রহ করে তেমন কিছু না পেয়ে ২০১৭ সালে মামলাটি স্থগিতের ঘোষণা দেন আদালত। ইকুয়েডর অ্যাসাঞ্জের রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল ঘোষণা করার পর বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের দাগি আসামিদের এক কারাগারে বন্দি আছেন, যেখানে তাঁর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানোর কথা শোনা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় সুইডেন সরকার অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে বাতিল করা মামলাটি আবার শুরুর ঘোষণা দিয়ে সবাইকে অবাক করেছে। যুক্তরাজ্যে সাজা খাটার পর তাঁকে সুইডেনে ফেরত আনা হবে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই সুইডেনের কাছে অ্যাসাঞ্জকে ফেরত চেয়ে চিঠি দিয়ে রেখেছে। সেখানে ফেরত পাঠালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, যা বিশ্বের বিজ্ঞ আইনজীবীরা এরই মধ্যে একমত হয়েছেন।

চতুর ইউরোপের এই ‘দ্বিচারীতত্ত্বের’ অনুশীলন নতুন কিছু নয়! বিশ্বের কথিত ‘অসভ্য’ দেশগুলোর পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীলতা যে হারে কমছে, তাতে আগামী যুগে হয়তো ইউরোপকে প্রতি পদে তার মাসুল দিতে হতে পারে। পরিবর্তিত সময়ে আধুনিক সভ্যতার যে সংজ্ঞা, তার পরিবর্তনও দেখা যায় আজ খালি চোখে! তবে সে ‘পরিবর্তন’ কতটুকু ধ্বংসের বিনিময়ে হবে, সেটাই দেখার বিষয়!

 

লেখক : সুইডেনপ্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

[email protected]

মন্তব্য