kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১         

বিশেষ সাক্ষাৎকার ► ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম

ভ্যাট আইন কার্যকর হলে বেশির ভাগ দ্রব্যমূল্য একই থাকবে

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



ভ্যাট আইন কার্যকর হলে বেশির ভাগ দ্রব্যমূল্য একই থাকবে

ভ্যাট আইন ২০১২ সংশোধিত হয়ে প্রায় বিদ্যমান আইনের মতো হয়ে গেছে। তাই আইনটি বাস্তবায়ন করা হলে সীমিত দুই-একটি খাত বাদে বেশির ভাগ খাতে দ্রব্যমূল্য একই থাকবে। আইনটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি না বাড়িয়েই ভ্যাট আদায় বহুগুণ বাড়বে।

 

‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ শিরোনামের খসড়া বাজেট প্রস্তাব আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেটের আকার আগের সব রেকর্ড ভাঙছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৮.২০ শতাংশ। আগামী বাজেট সামনে রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারজানা লাবনী

 

কালের কণ্ঠ : প্রতিবছরই বাজেটের আকার বাড়ছে। তার সঙ্গে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু প্রতি অর্থবছরই শেষ সময়ে দেখা যায়, এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থের অভাবে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প শেষ করা যায় না। অর্থবছরের শেষ সময়ে বাজেটের আকার, এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সংশোধনে বাধ্য হয় সরকার। এসব বিষয়ে আপনার মতামত কী?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : রাজনীতিতে বাহবা পাওয়ার জন্য বাজেট প্রণয়ন নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতিমালা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় বাজেট একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা। এক বছরের জন্য বাজেট প্রণয়ন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে একটি বাজেটের মাধ্যমে আগামীর পথচলা ঠিক করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের গতিধারার সঙ্গে অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড যুক্ত করা হয়। বর্তমান সরকার আকার বাড়ালেও বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। এ দেশে প্রতিবছর মূল বাজেটে যে অঙ্ক ধরা হয়, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে মূল বাজেটে যে পরিকল্পনা করা হয়, সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁট করা হয়। এসব পদক্ষেপ অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। এতে কাজের গুণগত মান কমে যায়। কাজের জন্য জবাবদিহি বাড়াতে হবে। অবশ্যই এসব বিষয়ে আগামী বাজেটে নজর দিতে হবে। তা না হলে এ ধারা চলতে থাকবে। আর এতে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে। এসব কিন্তু সফলতার মাপকাঠি না। আগামী বাজেট প্রণয়নে গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবায়নে গতি আনা না হলে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে। তাই হিসাব কষে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। আকার অবশ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে। 

কালের কণ্ঠ : আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, এনবিআরবহির্ভূত লক্ষ্যমাত্রা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ অন্যান্য খাতের লক্ষ্যমাত্রা কত হওয়া উচিত বলে মনে করছেন?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনের মাধ্যমে জেনেছি, আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। প্রতি অর্থবছরের মতো আগামী দিনেও এ লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি থাকবে বলে আমি মনে করি। লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে নির্ধারণ করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, বরং অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে। এ ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মরিয়া হয়ে ওঠে। নতুন নতুন কর বসায়। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। চলতিবার গত এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআরের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ আছে। ঘাটতি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরের জন্য দুই লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত নয়। অন্যদিকে এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকেও লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। এটিও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো সব লোকসানে আছে। আবার গত এপ্রিল পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। তাই চলতিবারের তুলনায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বেশি ধার্য করা উচিত নয়।    

কালের কণ্ঠ : বর্তমান সরকারকে কী কী চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ আগেই ছিল। এর সঙ্গে আরো কিছু চ্যালেঞ্জ যোগ হয়েছে। উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে আর্থিক খাতের সমস্যা সবচেয়ে বড়। বিশেষভাবে ব্যাংকিং খাতে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রেণীকৃত ঋণের মাত্রা ক্রমবর্ধমান। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি অনুযায়ী যে মাত্রা হওয়ার কথা, তার চেয়ে বেড়েছে। আগামী অর্থবছরে ঋণ কোথায় কিভাবে ব্যবহৃত হবে, তা কঠোর নজরদারিতে নির্দেশ থাকতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বজায় রাখতেও আগামী বাজেটে নজর দিতে হবে। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতের সমস্যা উত্তরণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে সে সম্পর্কে বাজেটে ঘোষণা থাকা উচিত। সরকারের উচিত করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, করপোরেট কর হার কমানো, গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে সুবিধা দেওয়া, দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্ব দেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানো।

কালের কণ্ঠ : আগামী বাজেটে কোন কোন খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। এসব খাতের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এ চারটি খাতে বরাদ্দ বেশি রেখে তার যথাযথ ব্যয় করা সম্ভব হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন হবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচনে গতি আসবে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে আগামী বাজেটে এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

কালের কণ্ঠ : দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানোর প্রয়োজন বলে অনেকে বলছে। অন্যদিকে এতে দেওয়া সুবিধাও সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। আপনার মতে, আগামী বাজেটে এ ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কী নির্দেশনা থাকা উচিত?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : সরকার বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে অনেক ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার আনুপাতিক হার কমেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় দারিদ্র্য হ্রাসের বার্ষিক গড় হার হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যা অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। দারিদ্র্য হ্রাসের গতি আরো ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর বরাদ্দ সার্বিক বাজেট ও জাতীয় উৎপাদনের আনুপাতিক হার হিসেবে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় যাদের উপকৃত হওয়ার প্রয়োজন, তারা বঞ্চিত হয়। যারা উপকার পাওয়ার যোগ্য নয় তারা উপকৃত হয় এবং বেশ কিছু অর্থ তছরুপ হয়। এ সমস্যাগুলো দূর করার দিকনির্দেশনা বাজেটে থাকা উচিত এবং বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।

কালের কণ্ঠ : দারিদ্র্য বিমোচনে এবং আয়বৈষম্য কমাতে কোন বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বরাদ্দকৃত অর্থের পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র মানুষকে দক্ষ, কর্মক্ষম শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। এসব বিষয়ে আগামী বাজেটে দৃঢ়প্রত্যয়ে ঘোষণা থাকা উচিত। বাজেট প্রণয়নের সময় মনে রাখতে হবে, দরিদ্র মানুষের নিজস্ব শ্রম ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। তারা যেন সুষ্ঠুভাবে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আয়-উপার্জন করতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। সরকারকে কঠোরভাবে রাজস্ব আহরণ করতে হবে। না হলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়তে থাকবে। বিশেভভাবে  আয়কর আদায়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

কালের কণ্ঠ : আগামী বাজেট সামনে রেখে এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, আগামী বাজেটে বিনিয়োগ বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষভাবে দেশি শিল্পে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?  

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : বাংলাদেশের বিনিয়োগ বেশ কিছু সময় থেকে নির্দিষ্ট হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রায় সবারই জানা। সুবিধামতো জমির প্রাপ্তি নেই, অবকাঠামো দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। এ সমস্যাগুলো দূর করার জন্য কিছু ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ এবং প্রকল্প আছে। কিন্তু সেসব বাস্তবায়নে গতি অত্যন্ত মন্থর। এ প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা বাজেটে থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে স্থিরতা আনতে হবে। করপোরেট কর হার কমাতে হবে। সহজ রাজস্বনীতি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।

কালের কণ্ঠ : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আনতে সরকারের ব্যয় এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানো প্রয়োজন। আগামী বাজেটে এ ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : অনেক পরিকল্পনা করেও সরকার আশানুরূপ ব্যয় বাড়াতে পারছে না। আমি মনে করি, সরকার এ বিষয়ে সফলতা অর্জন করতে পারছে না। সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে। সরকারি ব্যয় ও জাতীয় উৎপাদনের অনুপাতের হার স্থবির হয়ে আছে। অন্যদিকে অনেক দিন থেকেই রাজস্ব আহরণ ও জাতীয় উৎপাদনের অনুপাত ১০ শতাংশের ধারেকাছে ঘুরছে। বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় ও সরকারি ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বিশেষভাবে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বাজেটের আকার বড় করা হচ্ছে, সেই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষভাবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরের ওপর চাপ থাকছে। লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু ভেবে দেখা হচ্ছে না, এনবিআরের এ পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা আছে কি না। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ দেশে করদাতার সংখ্যা ঘুরেফিরে ২০ থেকে ৩০ লাখ। আবার কর দিচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৫ লাখ। এ সংখ্যা বাড়াতে না পারা সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা। শহরে বসে থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এনবিআরকে বিভাগীয়, জেলা শহরের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলায় যেতে হবে। এসব জায়গায় সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে হবে। এনবিআরের লোকবল ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আগামী বাজেটে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

কালের কণ্ঠ : দীর্ঘদিন থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার করুণ দশা। বড় অঙ্কের লোকসানে এসব প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও লোকসান থেকে বের হতে পারছে না।

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম :  রাষ্ট্রায়ত্ত প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অদক্ষতা অথবা দুর্নীতির কারণে লোকসানে আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে ভর্তুকি এবং তথাকথিত ঋণ দিতে হয়। এ ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করেছে—এমন নজির খুব একটা দেখা যায় না। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারীকরণ অথবা অন্য কোনো পন্থায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে কিভাবে রূপান্তর করা যায়, তার একটি রূপরেখা বাজেটে থাকা উচিত। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের বোঝা। এবারও পাটকলগুলো বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে সরকারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। এসব বোঝা কিভাবে কাঁধ থেকে নামানো যায়। শুধু কাঁধ থেকে নামালে হবে না, এসব বেসরকারি ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় কিভাবে মুনাফায় আনা যায় তার উদ্যোগ নিতে হবে।

কালের কণ্ঠ : এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে করজালের সম্প্রসারণ। অর্থাৎ আয়কর আদায়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাতে সরকারকে দক্ষতা দেখাতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে এবং শোনা যাচ্ছে আগামী দিনেও ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা বেশি। সরকারের সামনে এখন করজালের সম্প্রসারণের বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। সারা দেশে মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ মানুষও কর দিচ্ছে না। তাই করের আওতা বাড়ানোর অনেক সুযোগ আছে। করের আওতা বাড়লে করের পরিমাণও বাড়বে।

কালের কণ্ঠ :  ভিন্ন ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশের পরিবর্তে বহুস্তর হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। সংকুচিত ভিত্তিমূল্য এবং ট্যারিফ ভ্যালু থাকছে না। রেয়াত নেওয়ার সুবিধা রাখা হচ্ছে। নিত্যপণ্য ও বহু ব্যবহৃত পণ্যের ভ্যাট অব্যাহতি থাকছে। আগামী দিনে ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়িত হলে দ্রব্যমূল্যে কি প্রভাব পড়বে? দাম বাড়বে? 

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : আমি সব সময়ই সব পণ্যে ভিন্ন ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণের বিপক্ষে। ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়ে সরকার ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়নে যাচ্ছে। এটি ভালো খবর। কারণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দূরত্ব রেখে ভ্যাট আইন কেন, কোনো আইনই বাস্তবায়ন করলে সুফল আসবে না। ভ্যাট আইন ২০১২ সংশোধন করতে করতে প্রায় বিদ্যমান ভ্যাট আইনের মতো হয়ে গেছে। তাই আইনটি বাস্তবায়িত হলে সীমিত দু-একটি খাত বাদে বেশির ভাগ খাতে দ্রব্যমূল্য একই থাকবে। আইনটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি না বাড়িয়েই আদায় বহুগুণ বাড়বে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আগামী অর্থবছরে এনবিআর কি আইনটি বাস্তবায়নে সক্ষম হবে? সেই প্রশাসনিক কাঠামো কি প্রতিষ্ঠানটির আছে? আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আইনটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশ থাকতে হবে। দক্ষতার সঙ্গে ভ্যাটের জাল সম্প্রসারণ করতে হবে। এখনো অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় নেই। এসব প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনতে হবে। এতে ভ্যাট আদায় বাড়াতে থাকবে। এতে মোট রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আগামী বাজেটে শুধু আইনটি বাস্তবায়নে নির্দেশ দিলেই হবে না, তা বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশনা থাকতে হবে।

কালের কণ্ঠ :  দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদনে ও সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থপাচারের কথা বলা হয়। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে সরকারের করণীয় কী বলে আপনার মনে হয়? 

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : আমাদের দেশের অসাধু ব্যক্তিদের পাশাপাশি অনেক সৎ ব্যক্তিও হয়রানি থেকে বাঁচতে অর্থ পাচার করছে। অসাধু ব্যক্তি দেশের কথা না ভেবে নিজেদের সুখ-সুবিধার জন্য অর্থ পাচার করছে। অন্যদিকে কিছু সৎ ব্যক্তি আইন মেনে ব্যবসা করেও নিজেদের অর্থ প্রদর্শনে ভয় পায়। কিভাবে আয় করা হচ্ছে, কোথা থেকে এসব অর্থ আসছে—অনেক সময় এসব বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। বিভিন্ন ধরনের তদন্তও হয়। এভাবে তারা হয়রানিতে পড়ে। এ পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অর্থপাচার রোধে কাঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে নিশ্চিন্তে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সম্পদের মালিক হওয়া কোনো অপরাধ নয়, বরং সৎ সম্পদশালীদের দ্বারা বিভিন্নভাবে দেশের মানুষ, দেশের অর্থনীতি উপকৃত হয়। তাই অর্থ বিনিয়োগ করা হলে কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না—সরকারকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শোনা যাচ্ছে, আগামী বাজেটে প্রতিটি বন্দরে স্ক্যানিং মেশিন বসানো হবে। এ বিষয়ে সরকার সফল হলে আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থপাচার বন্ধ হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আগামী বাজেটে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এতে অর্থপাচার কমবে।

কালের কণ্ঠ : আপনি বলেছেন, বাজেট প্রণয়নের উদ্দেশ্য থাকবে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া। অনেকে দাবি করেছে, সাধারণ মানুষের স্বস্তিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো কতখানি যৌক্তিক বলে আপনি মনে করেন?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : আমি মনে করি, অবশ্যই করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো প্রয়োজন। গত কয়েক অর্থবছরে এ বিষয়ে সরকার কোনো পরিবর্তন আনেনি। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। সরকারের উচিত করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে এর হারেও পরিবর্তন আনা। সবচেয়ে কম আয়ের মানুষের জন্য হার ৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।

কালের কণ্ঠ : বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল করপোরেট কর হার কমানোর কথা বলেছেন। আপনি কি মনে করেন এতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : আমি মনে করি না আমাদের দেশে করপোরেট কর হার খুব বেশি। আগামী বাজেটে গড়ে সব খাতে করপোরেট কর হার কমানোর বিপক্ষে আমি। দু-একটি খাতে কমানো যেতে পারে। আমি মনে করি, তালিকাভুক্ত কম্পানির করপোরেট কর হার কমানো হলেও তালিকাভুক্ত নয়—এমন কম্পানির করপোরেট কর হার কমানো উচিত নয়। আরো বেশিসংখ্যক কম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন।

কালের কণ্ঠ :  বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে দেশি শিল্প লোকসানে পড়ছে। এ দুর্নীতি বন্ধে দেশি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছে। এনবিআর এ বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এ দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আগামী বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : বন্ড দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে লেনদেন ও কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে এ দুর্নীতি অনেক কমে যাবে। আগামী বাজেটে প্রতিটি বন্দরে স্ক্যানিং মেশিন বসানো হলে এবং অনলাইনে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে এ দুর্নীতি কমে যাবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হবে।

কালের কণ্ঠ :  সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম : আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা