kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

বিভক্ত বাংলা : খণ্ডিত ঈদ

গোলাম কবির

৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিভক্ত বাংলা : খণ্ডিত ঈদ

‘হাঁরঘে বাড়ি নবগঞ্জ’। কী অবলীলায় আমরা একদা আত্মপরিচয় ঘোষণা করেছি। ধীরে ধীরে ৫০-৬০ বছরে পরিচয়ের এই সহজ বোধটি জটিল হতে থাকে। কে জানে, ভাষা প্রবাহের তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে? নাকি আমরা দিন দিন অতি অভিজাত হয়ে উঠছি, সে কারণে!

পাকিস্তানি শাসন শুরু হলে ভিন্ন সংস্কৃতির জজবায় বলা শুরু করলাম নওয়াবগঞ্জ ইংরেজি বানানে এখনো লেখা হয়। কিছুদিন বলার পর নবাবগঞ্জ বলা হলো। আদিতে নবাবগঞ্জই ছিল একটি ছোট্ট ফাঁড়ি থানা। এতে আমাদের মন ভরল না। যুক্তি দেখালাম, ঢাকা ও দিনাজপুরেও নবাবগঞ্জ নামের স্থান আছে। তাই পরিবর্তন চাই। নওগাঁ নামের জনবসতি ভিন্ন উচ্চারণে ভারতেও আছে। তাই বলে তো কেউ তার সংস্কারে নামেনি।

দিন দিন অতিসংক্ষেপে মানুষ আত্মপরিচয়ের বর্ণনা দিচ্ছে। আমরা সেদিকে না গিয়ে নবগঞ্জ না বলে নামের পরিধি বাড়িয়ে নামকরণ করলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ। নবাবগঞ্জ রেলস্টেশন এবং পোস্ট অফিসের নাম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। শহরের অদূরে চাঁপাই নামের একটি প্রাচীন জনপদ এখনো বিদ্যমান। যেখানে নবাবি শাসনামলের একটি মসজিদও আছে।

যাই হোক, আমরা সেই নবগঞ্জের ৬০-৭০ বছর আগের মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন-সংস্কৃতির প্রধান উৎসব ঈদের সন্ধান করব। যদিও তখন ঈদ পার্বণে উৎসবের ছোঁয়া লাগেনি। আর পাঁচটি দিনের মতো সাদামাটা হলেও ব্যতিক্রমী হিসেবে দিনটি অনায়াসেই চেনা যেত।

শৈশব-কৈশোরের সন্ধিক্ষণ পার হইনি। দেশভাগ হয়ে গেল। নবগঞ্জ থানা শহর হিন্দুপ্রধান হওয়ায় শহুরে ঈদ আমরা দেখিনি। আমাদের বাড়ি শহর-সংলগ্ন পোল্লাডাঙ্গা, মূল বাজার থেকে কয়েকটি ছোট ছোট আম বাগানের দূরত্বে। ফলে আমরা না শহরের না গ্রামের। তবুও গ্রাম্য সংস্কৃতিতে আমরা লালিত।

আমার আব্বা ও দুই ফুফু রেখে একেবারে তরুণ বয়সে আমার দাদা মকসুদ আলী বিশ্বাস মারা যান। আমার দাদির বয়স পঁচিশের কোঠা পার হয়নি। বহু কষ্টে, তবে সযত্নে সন্তানদের লালন করেছিলেন তিনি। আমার আব্বাকে ১৯১৪ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত পোল্লাডাঙ্গা মাইনর স্কুল নামে কথিত বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। তারপর সংসারী করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। দেশভাগের কথা আমার স্মরণে আছে। আমার দাদি সুস্থভাবে বেঁচেছিলেন। তখনকার দিনের আড়ম্বরহীন ঈদ দেখেছি; কিন্তু উপভোগ করার মতো তেমন উপযোগ আমাদের ছিল না। দেখেছি শুধু সংক্ষিপ্ত আয়োজন।

নবগঞ্জ ছোট্ট শহর হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় সেখানে কোনো ঈদগাহ ছিল না। পোল্লাডাঙ্গা বা শঙ্করবাটির ঈদগাহে শহরে বসবাসকারী প্রান্তিক মুসলমানরা নামাজ পড়তে আসত। অনেকের জানা বর্তমানে শহরের প্রধান ঈদগাহ দেশভাগের অব্যবহিত পরে তখনকার মহকুমা অফিসার আবদুর রাজ্জাক সাহেবের প্রবর্তনা। জায়গাটি ছিল প্রভাবশালী হিন্দুর আম বাগান।

নবগঞ্জ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমের অনেক মানুষ ধর্মাচরণের বিশ্বাসে আহলে হাদিস। বাকি সব হানাফি। তারা নিজ নিজ ঈদগাহে নামাজ আদায় করত। ছেলেবেলায় দেখেছি, পোল্লাডাঙ্গার মিয়ার বাগানের ঈদগাহের ধারে-কাছের কয়েকটি পাড়া, এমনকি শহর প্রান্তের অনেকে জায়নামাজ হাতে নিয়ে সমবেত হতো। সেই দৃশ্য ছিল আনন্দের। তবে উচ্ছ্বাসের নয়।

ব্রিটিশ পিরিয়ডের ঈদের দৃশ্য আমার স্মৃতিতে অস্পষ্ট চলচ্চিত্রের মতো হয়ে আছে, নতুন কাপড়চোপড়ের সমাহার তখন ছিল না বললেই চলে। পুরনো কাপড় পরিষ্কার করে ব্যবহার করত বেশির ভাগ প্রান্তিক মানুষ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলস্টেশন সংক্ষেপে কম্পানির ভাষায় CNBJ তার ব্যস্ততা হারায় দেশভাগের অভিশাপে। কর্মজীবী মানুষের দৈনিক কাঁচা পয়সার আয় কমে আসে। মোট বহনে ‘লইল্যা’পাড়ার মানুষ—যার দাপুটে সর্দার ছিলেন পোড়া দফাদার এবং মালামাল বহনকারী পোল্লাডাঙ্গার গরুর গাড়ির মালিকরা কিছুটা সচ্ছলতা হারায়। লেখাপড়ার ব্যাপক প্রচলন না হওয়ায় আজাইপুর শঙ্করবাটির বেশির ভাগ মানুষ কাঁসা-পিতলের কুটিরশিল্প থেকে প্রতিদিন যা রোজগার করত তা দিয়ে তারা বাবুয়ানা করেই চলত। গরুর গাড়ির চাকা (স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘পাঁইহ্যা’) ও আনুষঙ্গিক তৈরির মিস্ত্রিরা টাকা-পয়সার মুখ দেখত। সভ্যতার ক্রমবিকাশে তা বিলীয়মান। দেশভাগের অভিশাপে সব যেন হচপচ হয়ে গেল। সেই অভিশপ্ত সময়ে আমাদের ছেলেবেলার ঈদ ছিল অনেকটা ম্রিয়মাণ।

ঈদের কয়েক দিন আগে থেকে প্রস্তুতি পর্ব লক্ষ করা যেত নদী-খাল-বিল-পুকুরে মহিলাদের কাপড় কাচার ধুম থেকে। বেশির ভাগ বসতবাড়ি খড়-বাঁশ বা মাটির হওয়ায় ঘরদোর লেপেপুঁছে মা-বোনেরা দৃশ্যমান করে তুলত ঈদের দিনটি।

খাওয়াদাওয়ার রকমারি তখনো প্রান্তিক মানুষের গোচরে আসেনি। ভূস্বামীরা অনেকে পোলাও-কোর্মা-পায়েস খেত। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের সেসবের বিলাস মাথায় আসত না। বড়জোর গুড়ের ক্ষীর আর আন্ধাসা; বাড়িতে পালা মুরগি দিয়ে তাদের মহাভোজের আয়োজন হতো। আশ্চর্যের ব্যাপার, এসব নিয়ে অদৃষ্টকে দোষারোপ করা ছাড়া ব্যাপক অভিযোগ করত না।

আমরা বলছিলাম নতুন কাপড়চোপড়ের কথা। বিভাগ পূর্বকালে নবগঞ্জ অঞ্চলে কাপড়চোপড় সরবরাহ হতো কলকাতা থেকে। ধীরে ধীরে তা বন্ধ হতে থাকে। এদিকে পূর্ব বাংলায় তেমন কাপড়ের কল গড়ে ওঠেনি। স্মাগলিং শুরু হয়। অসাধু কিছু মানুষ যারা বেশির ভাগ ওপার থেকে আসা—এতে নেতৃত্ব দেয়। কারণ ওপারের পথঘাট তাদের চেনা ছিল। এখন বেশির ভাগ নবগঞ্জ শহরবাসী বহিরাগত। যাই হোক, সেই সমাজ পরিবর্তনের দিনগুলোতে আমাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে। আমরা ঈদের প্রকৃত আনন্দ থেকে মানবসৃষ্ট সংকটে বঞ্চিত হয়েছি।

যৌবনে এবং অদ্যাবধি সেই সংকট আমার পিছু ছাড়েনি। নবগঞ্জের পরিবর্তিত সামাজিক অবস্থার জন্য একদিন শেকড়চ্যুত হয়ে এলেও জন্মস্থানের প্রতিটি ধূলিকণা আমার কাছে মধুময় হয়ে আছে। সেই মধুময় দিনগুলো আর ফিরে পাব না। নবগঞ্জে থাকতে আমার আত্মপরিচয়ের সংকট ছিল। সবাই আমাকে চিনত হাসু মুলবির ছেলে (শোমুদ্দীন মাওলানা) অথবা হোদার ভাই হিসেবে (প্রখ্যাত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাংবাদিক, অধ্যাপক জি কে এম শামসুল হুদা)। রাজশাহীতে বেশির ভাগ ছাত্রই আমাকে চেনে কবির স্যার বলে। অথচ আমার পিতৃদত্ত আসল নাম গোলাম কবির মুহ. নূরুল হুদা; লেখক হিসেবে সংক্ষিপ্ত নাম গোলাম কবির, ছদ্মনাম ইবনে হিশাম অনেকেই জানে না। আর জানলেও বানানে ভুল করে। হোক ভুল, তবুও একদা আমি নবগঞ্জের মানুষ বলে যে গর্ব করতাম, তা যেন এই ঈদকে সামনে রেখে অক্ষুণ্ন থাকে। যদিও দেশভাগ-পরবর্তী বিষণ্ন স্মৃতিময় ঈদ আজও আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই বিহ্বল দিনগুলোতে, যা ছিল বিভক্ত বাংলার খণ্ডিত ঈদ। আর যাই হোক, আজ বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষ ঈদের পূর্ণ আনন্দ উপভোগ করছে সাধ্যমতো।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা