kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

ঈদের অর্থনীতি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঈদের অর্থনীতি

১৭ কোটি মানুষের দেশে যেখানে মাথাপিছু জিডিপি বর্তমানে এক হাজার ৮২৭ মার্কিন ডলার, সে দেশে প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপনে লাখোকোটি টাকার নগদ লেনদেন হয় শুধু নতুন পোশাক ও বিশেষ খাদ্যসামগ্রী ক্রয়ে, এক-অষ্টমাংশ মানুষের স্বজনদের সঙ্গে যোগ দিতে যাতায়াতে, গরিব ও অসহায়দের মধ্যে জাকাত বিতরণে এবং বেতনের সমপরিমাণ বোনাস বিতরণে। বাজারে একসঙ্গে নগদ টাকার এত চাহিদা বাড়ে যে গ্রাহকের দাবি মেটাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কল মার্কেট থেকে কঠিন সুদে টাকা জোগাড়ে নামতে হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার নগদ নতুন নোটের খাজাঞ্চিখানার দুয়ার খুলে দিতে হয়।

মূলত ঈদকে ঘিরে চাঙ্গা হয় দেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাব মতে, সারা দেশে প্রায় ২৫ লাখ দোকান (মুদি দোকান থেকে কাপড়ের দোকান) রয়েছে। এসব দোকানে বছরের অন্য সময় প্রতিদিন তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও রোজার মাসে সেটা তিন গুণ বেড়ে হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে রোজার এক মাসে এই ২৫ লাখ দোকানে ঈদের পোশাক থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য বিক্রি হবে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার। ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বেশি টাকা লেনদেন হয় পোশাকের বাজারে। পোশাকের দোকানেই ঈদের কেনাকাটা এবার ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে বলে জানান দোকান মালিক সমিতির নেতারা। ঈদকে ঘিরে অর্থনীতির সব খাতেই গতি ফিরে আসে। চাকরিজীবীরা এবার ১২ হাজার কোটি টাকার ঈদ বোনাস তুলেছে। এর প্রায় পুরোটাই গেছে ঈদের বাজারে। জাকাতকে ঘিরে গরিব-অসহায় মানুষের মধ্যেও ঈদ অর্থনীতির ছোঁয়া লেগেছে। সারা বছরের মধ্যে রমজান ও ঈদকে ঘিরে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসে সবচেয়ে বেশি। যার বেশির ভাগই চলে যায় গ্রামীণ মানুষের হাতে। ঈদের মাসে যেমন সারা দেশের শপিং মল বা মার্কেটগুলো গতিশীল হয়, তেমনি কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, দেশীয় বুটিক হাউসগুলোয় বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য, বাড়ে আর্থিক লেনদেন। বড় উৎসব, তাই সবার বিরাট আয়োজন।

বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসে। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বাড়ে ব্যাপক হারে। ঈদ উপলক্ষে রেকর্ড গতিতে দেশের অর্থনীতিতে জমা হচ্ছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স। শুধু মে মাসে ১২৬ কোটি ৭৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর চলতি মে মাসের ১৬ তারিখ পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৭২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। আশা করা হচ্ছে এবার জুন মাসে রেমিট্যান্স ১৫০ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে।

ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বেড়েছে ব্যাপক হারে। ঈদের কেনাকাটায় এটিএম বুথে প্রতিদিন ১৫ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করছে গ্রাহকরা। এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বেশি। মোবাইলে লেনদেন প্রতিদিনই বাড়ছে। এদিকে মানুষের চাহিদা পূরণে বাজারে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা ও যানজটের ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের অনলাইন বাজার। নিত্যনতুন পণ্যের সমাহার, বিভিন্ন ছাড় ও উপহারের কমতি নেই ভার্চুয়াল এই বাজারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ঈদ সামনে রেখে জমজমাট অনলাইনের ঈদের বাজারও।

রোজার আগে অর্থনীতিতে এক ধরনের প্রভাব থাকে। আর রোজা শুরুর পর থাকে আরেক ধরনের। রোজার আগে অর্থনীতি সচল থাকে ভোগপণ্যকেন্দ্রিক। এ মাসে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। রোজা শুরুর প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই মূলত শুরু হয় রোজাকেন্দ্রিক অর্থনীতি। কেননা রোজার মাসের জন্য পণ্য আমদানি কার্যক্রম অনেক আগেই শুরু করতে হয় ব্যবসায়ীদের। এমনকি সরকারি পর্যায়েও অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। আর রোজার এক সপ্তাহ আগে থেকে মূলত শুরু হয় ভোগ্যপণ্যের বেশি বেচাকেনা। এরপর শুরু হয় পোশাকের কেনাবেচা। আর এর প্রভাব একেবারে শহর থেকে গ্রামপর্যায়ে চলে যায়। ঈদের বাজারে সবচেয়ে বড় অংশজুড়েই রয়েছে বস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী। বস্ত্রের মধ্যে পায়জামা, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, শাড়ি, লুঙ্গি ও টুপি প্রধান। এরপর রয়েছে জুতা, প্রসাধনী, স্বর্ণালংকার। আর উচ্চবিত্তের জন্য রয়েছে সোনা, ডায়মন্ডের অলংকার ও গাড়ি। সবার জন্য অপরিহার্য হিসেবে রয়েছে সেমাই, চিনি, ছোলা, ডালসহ অনেক পণ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত এবং ঋণের অংশ হিসেবে গ্রামের অংশ শহরের তুলনায় অনেক কম। গ্রাম থেকে যতটুকু আমানত নেওয়া হচ্ছে, তার অর্ধেক বিনিয়োগ হচ্ছে শহরে। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে এ চিত্র একেবারে উল্টে যায়। শহরের মানুষ হয় গ্রামমুখী। আর সারা বছর স্তিমিত হয়ে থাকা গ্রামের হাট-বাজার কয়েক দিনের জন্য দারুণ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক তথ্য মতে, ঈদে পোশাকসহ যাবতীয় পরিধেয় খাতে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার কোটি, জুতা-কসমেটিকস তিন হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্য সাত হাজার কোটি, জাকাত-ফিতরা ও দান-খয়রাত ৩৮ হাজার কোটি, যাতায়াত বা যোগাযোগ খাতে ১০ হাজার কোটি, সোনা-ডায়মন্ড পাঁচ হাজার কোটি, ভ্রমণ খাতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি, ইলেকট্রনিকস চার হাজার কোটি, স্থায়ী সম্পদ ক্রয় এক হাজার কোটি, পবিত্র ওমরাহ পালন তিন হাজার কোটি ও আইন-শৃঙ্খলাসহ অন্যান্য খাতে লেনদেন হয় এক হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া অর্থনীতির আরো অনেক খাত রয়েছে যেখানে ঈদকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বাণিজ্য হয়ে থাকে। বিশেষ করে ফার্নিচার, গাড়ি ও আবাসন শিল্পে বড় ধরনের কেনাকাটা হয়ে থাকে। অনেকে ঈদের কেনাকাটা করতে ভারতে যাচ্ছে। এর প্রভাব রয়েছে বাজারে। ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে বিত্তশালীরা ১৫ হাজার কোটি টাকা জাকাত প্রদান করবে। যার পুরোটাই ব্যয় হবে ঈদ উৎসবে। এ ছাড়া উচ্চবিত্তের প্রায় এক লাখ মানুষ দেশের বাইরে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেনাকাটার জন্য পাড়ি জমাবে। গড়ে এদের ৫০ হাজার টাকা খরচ হলেও তাতে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়ানো, বিভিন্ন আনন্দ-বিনোদন বাবদ আরো দেড় হাজার কোটি থেকে দুই হাজার কোটি টাকা খরচ হবে এই ঈদে।

অন্য সাধারণ মাসগুলোর তুলনায় সেবা ও রেগুলেটরি সংস্থাগুলোর এ সময় কর্মতৎপরতা চোখে পড়ার মতো। সেখানে ইনফরমাল আর্নিং বেড়ে যায় নানা উপায়ে, এমনকি ফর্মাল বকশিশের পরিমাণও যৎসামান্য নয়। ঈদ আসবে বলে রোজা শুরুর আগে থেকে ইলেকট্রনিক প্রিন্ট মিডিয়ায় তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় স্পন্সর খোঁজাখুঁজিতে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ আর বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজনে। এই মৌসুমে সব মহলে সৃজনশীল হওয়ার ধুম পড়ে যায়।

এমনকি নগদ টাটকা কাগজি নোটের সরবরাহ বাড়াতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নকল নোটের জোয়ার ঠেকাতে। গোটা অর্থনীতি যেন জেগে ওঠে। শুধু জেগে ওঠা নয়, রীতিমতো দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। মূল্যস্ফীতির মাত্রা পরিসংখ্যান ব্যুরোর ফিতায় মাপা না গেলেও, তবুও সচল, সজাগ, সজীব থাকে কেনাকাটা, যাতায়াত যোগাযোগের।

এটি প্রণিধানযোগ্য যে অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রসারই অর্থনীতির জন্য আয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুদ্রা সরবরাহ গতিশীলতা আনয়ন। ঘূর্ণমান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যেকোনো ব্যয় অর্থনীতির জন্য আয়। দেশজ উৎপাদনে এর থাকে অনিবার্য অবদান। যেকোনো উৎসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন করে, মানুষ জেগে ওঠে নানা কর্মকাণ্ডে, সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় একটি স্বতঃপ্রণোদিত আবহ সৃষ্টি হয়। এই আবহকে দেখভাল করতে পারলে অর্থাৎ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে পারলে এই কর্মকাণ্ড, এই মুদ্রা সরবরাহ, ব্যাংকের এই তারল্য তারতম্য, পরিবহন খাতের এই ব্যয়প্রবাহ, একে স্বাভাবিক গতিতে ধরে রাখতে পারলে অর্থনীতির জন্য তা পুষ্টিকর প্রতিভাত হতে পারে। এখানে বিচ্যুতি, বিভ্রান্তি ও বিপত্তি সৃষ্টি হলে একটি স্বাভাবিক সিস্টেম লসের সাফল্যকে ম্লান করে দিতে পারে। বর্ডার ট্রেডে বাঞ্ছিত নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ জোরদার করে, ঘাটে ঘাটে চাঁদা, দুর্নীতি ও দালালি—সব ধরনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে, কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে ঈদের অর্থনীতিকে জিডিপিতে যোগ্য অবদান রাখার অবকাশ নিশ্চিত হতে পারে।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য