kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

আমার ঈদস্মৃতি

হাশেম খান

৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমার ঈদস্মৃতি

আমার জীবনে অনেক ঈদ এসেছে। ঈদ এলে তো ভালোই লাগে। কাজেই অনেক ঈদই ভালো লেগেছে, খারাপ লেগেছে। আনন্দ করেছি, ঈদের আনন্দ উপভোগ করেছি। কারণ সময়, সমাজ ও দেশ—একেক সময় একেক রকম ঈদ আমাদের উপহার দিয়েছে। পাকিস্তান আমলে আমার জন্ম। সেই সময় বাবার হাত ধরে ঈদের জামা পরে, টুপি মাথায় ঈদগাহে গেছি। আবার বর্ষাকালের ঈদের নামাজ পড়েছি, তখন মসজিদে ঈদের নামাজ হতো। আমাদের ওই এলাকায় বর্ষাকালে বেশির ভাগ রাস্তা ও মাঠ পানিতে ডুবে যেত। সেটি ছিল এক ধরনের আনন্দ—তখন আমরা ছোট ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে খেলতাম, আনন্দ করতাম। একটি বয়স পর্যন্ত ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে খেলা যায়। ৮-৯ বছর পর্যন্ত মেয়েরা আমাদের সঙ্গে খেলত। জীবনের অনেক দিন পর্যন্ত বিষয়টি আমার মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে—গত ঈদেও মেয়েরা আমাদের সঙ্গে খেলা করেছে। পরের ঈদে তারা আর খেলতে এলো না। খেলা তো নয়ই, এখন আর কাছেও আসে না। কেন? এসব প্রশ্ন নিয়ে আমরা বড় হয়েছি।

আমার কৌতূহল অনেক। আমি মনে করি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ কৌতূহল। ছোটবেলায় নানা বিষয়ে কৌতূহল ছিল। এখনো আমার জীবনে কৌতূহলের শেষ বা কমতি নেই।

আমার বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো ঈদের কথা মনে পড়ে। চারুকলা থেকে পাস করে যখন বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরছি, তখন আমি ঢাকার গোপীবাগে থাকি; সেই বাড়িতে আমার বড় এক ভাই, ছোট ভাই এবং ছোট বোনের সঙ্গে থাকতাম। ঈদের সময় বন্ধুরা আমাদের বাসায় আসত। তাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উদ্‌যাপন করতাম। সেই সময় বাসায় রান্নাবান্নার কাজ আমি নিজেই করতাম। কারণ ঈদের ছুটিতে সবাই গ্রামের বাড়িতে চলে যেত। ফলে রান্না করার জন্য আলাদা কোনো লোক পাওয়া যেত না। আমার বন্ধুদের মধ্যে তখন ছিল শাহাদত চৌধুরী, বুলবন ওসমান, মাহবুব তালুকদার, রফিকুন নবী, শামসুজ্জামান খান প্রমুখ। মেয়ে বন্ধুও ছিল। কিন্তু মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সেভাবে আড্ডা দেওয়া হতো না। এমনিতে কোথাও দেখা হলে কথা হতো।

আমি খুব ভালো রান্না করতাম এমন নয়। কিন্তু যা পারি, নিজেই এক্সপেরিমেন্ট করে রান্না করতাম। সবাই আনন্দ নিয়ে খেত। শাহাদত চৌধুরী খুব মজা করতেন। বন্ধুদের মধ্যে যাদের নাম বলেছি, তারা সবাই বিখ্যাত মানুষ। শাহাদত চৌধুরী এখন আর নেই। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও ২০০০-এর সম্পাদক ছিলেন। বাকিরাও প্রত্যেকে নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। তাদের সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটি অবলম্বন হয়েছিল কচিকাঁচার আসর। আমরা কচিকাঁচার মেলার আন্দোলন করতাম, যেটার মধ্যমণি ছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। বন্ধুদের মধ্যে তারা ছাড়াও আরো অনেকেই আসত। কিন্তু তারা ছিল অত্যন্ত অন্তরঙ্গ বন্ধু।

একটি গল্প বলি। আমাদের মধ্যে বুলবন ওসমান ছিল খুব স্মার্ট। বলা যেতে পারে, ওভার স্মার্ট। একবার করলাম কী—আমি আর শাহাদত চৌধুরী আলাপ করলাম যে বুলবন যখন আসবে, তাকে এমনভাবে ঈদের শুভেচ্ছা জানাব, শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে তার পকেট মেরে দেব। এবং দুজনই আমরা সফল হয়েছিলাম পকেটমারে। যাই হোক, এটি ছিল আমাদের আনন্দের বিষয়।

বেশির ভাগ ঈদে দুপুরের দিকে খেয়েদেয়ে আড্ডা দিয়ে বিকেলের দিকে অন্তত দু-তিনটি বাসায় আমাদের যেতে হতো। এ রকম একটি বাসা ছিল সুফিয়া কামালের বাসা। সেখানে সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে, আমাদের অত্যন্ত স্নেহভাজন এবং বন্ধুর মতো ছিল। তাদের বড় ভাই শামীম, সেও বন্ধু ছিল। তাদের অন্যান্য ভাই, শাহেদ ভাই মাঝেমধ্যে থাকতেন। কিন্তু এই দুজন যেহেতু কচিকাঁচার মেলা করত, আমরা তাদের কাছে যেতাম। আর শাহেদ ভাই তো কবি ছিলেন। তাঁর সঙ্গেও আলাপ হতো। তিনি নানা বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। শাস্ত্রীয়সংগীত শুনতেন। আমাদের আড্ডাটি দারুণ জমে উঠত। সুফিয়া কামাল খালা আমাদের খুব আদর করতেন। খাওয়াতেন। গল্প করতেন। নানা ধরনের কথা বলতেন—কবিতার কথা, দেশের কথা, রাজনীতির কথা এবং শিল্প-সাহিত্য নিয়ে গল্প করতেন। রাজনীতি যারা করছে এবং রাজনীতির আড়ালে যারা সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছে, তাদের দিকে তিনি কখনো কখনো ভর্ৎসনা ছুড়ে দিতেন। তাঁর স্বামী কামাল উদ্দিন খান, তিনিও আমাদের নানা ধরনের গল্প বলতেন। অনেক সময় কেটে যেত। পরে আমরা বন্ধুরা সোজা চলে যেতাম জয়নুল আবেদিনের বাড়িতে। এই দুটি বাড়িতে আমাদের যেতেই হতো। মাঝেমধ্যে আমরা কবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতে গেছি, কখনো শওকত ওসমানের বাড়িতে গেছি। এভাবে আমাদের ষাটের দশক কেটেছে।

ষাটের দশকের সেই সময়ের ঈদের সঙ্গে নানা কথা ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ষাটের দশক ছিল আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের সময়। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা আন্দোলন দিলেন, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টি এবং আওয়ামী লীগ—সবাই মিলে যে আন্দোলন এবং আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলন সব মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের মতো স্বৈরাচার শাসককে আমরা আন্দোলন করে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলাম। আমরা বন্ধুরা মিলেই বলছি না, পুরো বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতিবান মানুষের সমন্বিত আন্দোলনের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়েছিল।

গোপীবাগের সেই বাসায় বসে আমরা বন্ধুরা আন্দোলনের নানা কাজ করেছি। কবিতা লিখেছি। সংকলন বের করেছি। পোস্টার করেছি। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সব পোস্টার আমি করেছি। সেই ছয় দফার পোস্টার, লোগো থেকে শুরু করে সব কিছু আমি ও আমার ছাত্ররা মিলে করেছি। এভাবে ঈদের উৎসব ও আনন্দের সঙ্গে আন্দোলনের বিষয়গুলো মিলেমিশে আছে। ঈদের দিন আমরা বেশি সময় পেতাম। সারাটা দিন সময় পেতাম। এভাবে নানা ঘটনা ও আনন্দময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের ঈদ কেটেছে।

১৯৭১ সালে আমাদের জীবনে একটি ঈদ এসেছিল। অন্য রকম একটি ঈদ। তারিখটি ছিল ২০ নভেম্বর। এই ঈদের দিনে আমার জীবনে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল। আমি এবং আমার বন্ধু রফিকুন নবী, আমরা চারুকলায় নিয়মিত যেতাম। এমনিতেই যেতাম। তখন আমরা দেশের মধ্যেই ছিলাম। দেশের মধ্যে থেকেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। তখন শাহাদত চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের দুই নম্বর সেক্টরে চলে গেছেন খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে। কিন্তু নানাভাবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর রাখতাম। ঢাকা শহরে কিছু বাড়ি ছিল, যেসব বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন। তখন বায়তুল মোকাররমে ঈদের জমজমাট মার্কেট। একদিন আমরা চিন্তা করলাম—বায়তুল মোকাররমে যাব। তখন সেখানে বিখ্যাত কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের স্বর্ণের দোকান ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় দোকান পাল্টে কসমেটিকসের দোকান করা হয়। সেই সময় রফিকুন নবী থাকত নারিন্দায়, আমি থাকতাম গোপীবাগে; আমরা একই সঙ্গে আসতাম। একই রিকশায় যাওয়া যেত। রফিকুন নবীকে বললাম, আমার ব্রাশ ও টুথপেস্ট কিনতে হবে। আর লেখক মাহমুদুল হকের সঙ্গেও একটু দেখা করে যাই। নবী বলল, হ্যাঁ, চল যাই। আমারও কিছু জিনিস কিনতে হবে। আমরা গিয়ে মাহমুদুল হককে দোকানে পেলাম না। জানা গেল, সেদিন তিনি আসেননি। পরে আমরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে স্টেডিয়ামের ওদিকটায় যাচ্ছি। যেতে যেতে কথা বলছি। এখন যেটা বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ছিল, তখন সেটা ছিল জিন্নাহ এভিনিউ। চারপাশে অনেক মানুষ। এত স্বাভাবিক সব কিছু, মুক্তিযোদ্ধারা কিছু করতে পারছেন না। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, কেউ কেউ ফিরে আসছেন। আমি বললাম, নবী, আমাদের বোধ হয় এই রকম একটি অবস্থায় এখানে থাকা উচিত নয়। কারণ এই স্বাভাবিকতা আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা মেনে নেবেন না; কথাটি শেষ করতে পারিনি, সঙ্গে সঙ্গে তখনই যেখানে আমরা গিয়েছিলাম মাহমুদুল হকের খোঁজে, ঠিক সেখানেই বিকট আওয়াজে সাত-আটটি বোমা আমাদের চোখের সামনে পড়ল এবং দুটি গাড়ি ওপর দিকে শাঁ করে উড়ে গেল। পার্ক করা বেশ কয়েকটি গাড়ি ছিল। আমরা আহত হইনি। তবে এই বোমা হামলা আমরা নিজ চোখে দেখলাম। ঈদের সময় এই ঘটনাটি ঘটেছিল। এর তিন দিন পরে ২০ নভেম্বর ঈদ ছিল।

এভাবে ঈদ নিয়ে আমার নানা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা জমা আছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের সেই ঘটনাটি মনের ভেতর গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। সেই স্মৃতি আমি এখনো ভুলতে পারিনি।

লেখক : চেয়ারম্যান, জাতীয় জাদুঘর

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য