kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

রংপুর অঞ্চলে শিক্ষায় নজরদারি প্রয়োজন

ড. শফিক আশরাফ

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রংপুর অঞ্চলে শিক্ষায় নজরদারি প্রয়োজন

একসময় শিক্ষা-সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল উত্তরাঞ্চল। বিশেষ করে উপমহাদেশে নারীশিক্ষা ও জাগরণের প্রথম মশাল প্রজ্বালিত হয়েছিল উত্তরাঞ্চলে। সরোজনলিনী, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছাড়াও ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা প্রিসিলা চ্যাপম্যান, মেরি অ্যানকুকের কথা জানা যায়, যাঁরা রংপুর থেকে নারীশিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯১৬ সালে এখানে লর্ড ব্যারেন কারমাইকেলের নামে ‘কারমাইকেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু রংপুরে নয়, সারা দেশে অসংখ্য জ্ঞানী-গুণীর জন্ম দিয়েছে। দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির এই সূতিকাগার উত্তরোত্তর যেখানে আরো দীপ্তিমান হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, সেটা না হয়ে ক্রম অন্ধকারের পথে যাত্রা শুরু করেছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে কারমাইকেল কলেজের ছাত্র-শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কারমাইকেল কলেজের ছাত্রনেতা মুখতার ইলাহীর বীরত্বের কথা এখনো লোকমুখে শোনা যায়। পঁচাত্তর-পরবর্তী বেশ দীর্ঘ সময় স্বাধীনতাবিরোধী ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের ত্রাসের শাসন চলেছে এই ক্যাম্পাসে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির স্বাভাবিক চর্চা হয়নি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কারমাইকেল কলেজের কিছু জায়গা অধিগ্রহণ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকে তিনজন উপাচার্যের সময়কাল পার করে চতুর্থ উপাচার্যের যাত্রা চলছে। প্রথম উপাচার্যের সময়কাল পূর্ণ হওয়ার অনেক আগেই বিদায় করে দ্বিতীয় উপাচার্য জলিল মিয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির অভিযোগে আন্দোলন হলে তাঁকেও সময়ের আগেই অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন-সংগ্রাম দেখে হয়তো নীতিনির্ধারণী মহলের ধারণা হয়, এটি একটি সমস্যাসংকুল বিশ্ববিদ্যালয়! ফলে তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দাপুটে প্রক্টর, স্বনামে খ্যাত প্রফেসর ড. এ কে এম নূর-উন-নবীকে। তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজসহ আরো অনেক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার মতো সময় তাঁর ছিল না। তাঁর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে না থাকা নিয়ে আন্দোলন হয়। তবে তিনি সময়কাল পূর্ণ করেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নেন। এরপর চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে এসেছেন বাংলাদেশের আরেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, ক্যাপ্টেন বিএনসিসি! তিনি জানিপপ নামে বাংলাদেশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংগঠনটির চেয়ারম্যান। টেলিভিশনের টক শোর মাধ্যমে দেশব্যাপী তাঁর পরিচিতি। এরই মধ্যে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ৬২৫ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি ৪৬৫ দিনই ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত! প্রবলিমেটিক বিশ্ববিদ্যালয় মনে করে, সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল যেসব বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক করার জন্য পাঠিয়েছে; অনেকে মনে করেন, সমস্যা সমাধানের চেয়ে তাঁরা নিজেরাই সমস্যা হয়ে উঠেছেন। ফলে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভূমিকা রাখার কথা, সেই ভূমিকা রাখতে পারছে না! শিক্ষার্থীদের সেশনজট, আবাসন সমস্যা, ক্লাসরুম সংকট, শিক্ষক সংকট ইত্যাদি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখানে পরবর্তী উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়তো সরকারকে ভাবতে হবে, সুপিরিয়র কাউকে উপাচার্য করে পাঠাবে, নাকি উত্তরাঞ্চলের মাটি-মানুষকে ভালোবেসে বিশ্ববিদ্যালকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এ রকম কাউকে পাঠাবে। রংপুরে শিশু-কিশোরদের জন্য বেশ কিছু শিক্ষালয় আছে। সরকারি জিলা স্কুল, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় তার মধ্যে অন্যতম। তবে  জেএসসি, পিইসি, এসএসসি, এইচএসসি ইত্যাদি পরীক্ষার কেন্দ্র হওয়া ছাড়াও শীতকালীন-গ্রীষ্মকালীন অবকাশে বছরের বেশির  ভাগ সময় স্কুল দুটি বন্ধ থাকে। আমার সন্তান এখানকার একটি সরকারি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনেককে পেছনে ফেলে সেখানে ভর্তি হয়েছে। সকাল ১১টায় স্কুলে ঢুকে সাড়ে ৩টা নাগাদ ক্লান্ত-ক্ষুধার্থ অবস্থায় বেরিয়ে আসে। আজ কয়টা ক্লাস হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে প্রায়ই বিষণ্ন গলায় উত্তর দেয়, সারা দিনে শুধু হাজিরা হয়েছে বাবা, কোনো ক্লাস হয়নি! ক্লাস থেকে বের হতে দেয় না, খেলতেও দেয় না! কাল থেকে আমি আর স্কুলে যাব না বাবা। মনে হয় কোনো স্কুল নয়, চার ঘণ্টা জেল খেটে বের হলো! বিপন্ন আমি মেয়েকে শুধু বোঝাই, নিজের পড়া নিজেই পড়তে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি! পাশাপাশি মিলিটারি কর্তৃক পরিচালিত ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে ক্লাস ওয়ানেই ১২টি সেকশনে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। অভিভাবকরা জানায়, ভর্তি ও অন্যান্য ফি বাবদ প্রতি শিক্ষার্থীকে প্রথম শ্রেণিতেই প্রায় ১৮ হাজার টাকা দিতে হয়, যা বহন করা নিম্নবিত্তের কথা বাদ দিলেও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য। এগুলো ছাড়াও রংপুর ও এর আশপাশে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তাদের লক্ষ্য কোনো শিক্ষাসেবা নয়, শিক্ষা বাণিজ্য। আর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কোচিং ব্যবসা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়েও উচ্চমূল্যের ভর্তি ফি ও মাসিক বেতন দিয়ে শিক্ষার্থীরা এসব কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কোচিং সেন্টারে ভর্তি করায় এই আশায় যে এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসম্পূর্ণ পড়াশোনা পূর্ণ করে দেওয়া হবে। কোচিং সেন্টার নিয়ে তাদের অভাব-অভিযোগও খুব বেশি নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার সময়কালে কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে এক ধরনের জিহাদ ঘোষণা করে। ঢাকঢোলের শব্দে মনে হয় আগামীকাল থেকে দেশের সব কোচিং সেন্টার উঠে যাচ্ছে। এর কারণটা মনে হয় বিভিন্ন সময়ে কোচিং সেন্টার ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসসংক্রান্ত অভিযোগ। বিষয়টা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়! কোচিং সেন্টার প্রশ্নপত্র তৈরি করে না, যেখানে প্রশ্নপত্র তৈরি হয়, সেখানে প্রবেশাধিকার তাদের জন্য সহজগম্য নয়। তাহলে কেউ না কেউ তাদের হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দেয়! কোচিং সেন্টার বন্ধ করে এই সমস্যার সমাধান খুঁজলে দাঁড়ায় রোগীর মাথায় সমস্যা হলে হাতের চিকিৎসা করার মতো। যারা প্রশ্নপত্র কোচিং সেন্টারের কাছে পৌঁছে দিত, তারা তাদের আপন পথ খুঁজে নেবে। কাজেই কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে জেহাদ না করে জেহাদ করা উচিত দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে, যাঁরা চক্রের হোতা! জেহাদ করা উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ মানসম্পন্ন পড়ালেখা নিশ্চিত করার জন্য, যাতে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারমুখী না হয়। বিশেষ করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি করে শিক্ষার মান নিশ্চিত করলেই এ অঞ্চলে শিক্ষা সমস্যা সমাধানের অগ্রগতির জন্য সেটা হবে বড় একটি পদক্ষেপ।

লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

মন্তব্য