kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি

আবুল কাসেম ফজলুল হক

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি

বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলতে হলে এই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তি ও রাষ্ট্রীয় ভিত্তি সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা দরকার। এখানে সাংস্কৃতিক ভিত্তি সম্পর্কে কিছু বিষয় উল্লেখ করা হলো।

ইতিহাসবিদদের মতে, আজকের বাংলা ভাষার ভূভাগে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে। পশ্চিম ও উত্তর ভারত আর্য-উপনিবেশে পরিণত হতে থাকে খ্রিস্টপূর্ব অন্তত দেড় হাজার বছর আগে থেকে। আর্যরা ভারতে আসে পশ্চিমের গিরিপথ দিয়ে, স্থানীয় প্রতিরোধ মোকাবেলা করে, বিজয়ীরূপে। আর্যপ্রভাব পশ্চিম ও উত্তর ভারত থেকে ক্রমে পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে বিস্তৃত হয়েছে। আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল, মণিপুর, আগরতলা, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামে মধ্যযুগ পর্যন্ত আর্যপ্রভাব প্রায় বিস্তৃত হয়নি। বাংলাভাষী ভূভাগে জনগণের জীবনযাত্রা প্রণালী ও জীবনধারা স্পষ্ট রূপ নিয়েছে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ার আগেই। সংস্কৃত ভাষায় এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এর প্রমাণ আছে। আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ায় আগেই এই ভূভাগে কথা বলার ও লেখার ভাষা, কৃষিনির্ভর জীবনধারা, বিবাহ ও পরিবার-জীবন, খাওয়া-পরার রীতি, ভালো-মন্দ সম্পর্কে ধারণা, যোগসাধনা, কর্মবাদ, পরজীবনের ধারণা, দেব-দেবী ও পূজা-পার্বণ ইত্যাদির উদ্ভব ঘটেছিল। পরে সেগুলো বিকশিত হয়েছে নিজের ঐতিহ্যের মধ্যে আর্যভাষা, আর্য ভাবধারা, আর্য রীতিনীতি ও আর্য ধর্মকে গ্রহণ করে—সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। বহিরাগত আর্যরাও আদিবাসীর সংস্কৃতি থেকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে।

যুগ-যুগান্তর ধরে আমাদের সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে পর্যায়ক্রমে বহিরাগত আর্যপ্রভাব, বহিরাগত মুসলিম প্রভাব ও বহিরাগত ইউরোপীয় প্রভাব গ্রহণ করে। যুগে যুগে বৈদেশিক ধর্ম, আদর্শ, জ্ঞান, বিজ্ঞান, ভাষা ও আচরণকে নিজের মধ্যে সমন্বিত করে বাঙালি তার স্বকীয় সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার স্বাধীনতা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।

মানবজাতির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলে দেখা যায়, কালো মানুষ (প্রধানত আফ্রিকার), হলদে মানুষ (প্রধানত জাপান, চীন, কোরিয়া ও ইন্দোচীনের) ও সাদা মানুষ (প্রধানত ইউরোপের)—এই তিন বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর লোকদের নানা রকম মিলন-মিশ্রণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশের নানা জনগোষ্ঠী বা এথনিক গ্রুপ। বাংলাদেশের মানুষ পূর্বোক্ত তিন বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। স্মরণাতীতকাল থেকে এ দেশে মূলত দুটি বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর লোক বসবাস করে আসছে : কালো মানুষ ও হলদে মানুষ। রামায়ণ-মহাভারতে নিষাদ (কালো মানুষ) ও কিরাত (হলদে মানুষ) জনগোষ্ঠীর উল্লেখ আছে। বাংলার জনপ্রবাহে সাদা মানুষেরও সামান্য মিশ্রণ পরে ঘটেছে—যাকে বলা যায় সমুদ্রে বারিবিন্দুবৎ। বাংলার জনগণের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যাঁরা সন্ধান করছেন তাঁরা সবাই এই জনগোষ্ঠীকে মিশ্র বা সংকর বলে অভিহিত করেছেন। এই মিশ্রতা বাঙালি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার মধ্যেই আছে। এই মিশ্রতা বা সংকর্য নগণ্য প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো নিজেদের ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষাও গ্রহণ করছে এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসছে। তাদের চিরদিনের জন্য আদিবাসী করে রাখা অন্যায়। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিল এবং আছে। মুসলমান সমাজে আশরাফ-আতরাফ ব্যবধান ছিল, যদিও তা ধর্মের দ্বারা অনুমোদিত নয়। এসব পার্থক্যের প্রভাব এই ভূভাগের জনগণের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পাওয়া যায় না। এর কারণ হয়তো এই যে স্মরণাতীতকাল থেকে যে রক্তসাংকর্য ঘটে আসছে তাতে কেউই আর কোনো ধরনের রক্তবিশুদ্ধতা দাবি করতে পারেন না। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানে কোনো পার্থক্য নেই। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে আন্ত ধর্মীয় বিবাহের রীতি না থাকার ফলে হয়তো হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে তাদের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। তবে কালক্রমে আন্ত ধর্মীয় বিবাহের রীতি প্রচলিত হতে পারে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও প্রচলন হতে পারে আন্ত গোষ্ঠী বিবাহের এবং সংস্কার অতিক্রম করে তারাও শামিল হতে পারে জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদে।

এসব কিছুর বিবেচনাই আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিবেচনার সময় সামনে আসে। আমরা এসবের কোনোটিকেই বিবেচনা থেকে বাদ দিতে পারি না। পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণতা, গোঁড়ামি ও জেদাজেদির ফল জনগণের জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে। নীতি বাস্তবায়িত করতে হলে নীতির সঙ্গে নমনীয়তা দরকার হয়। প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি যেভাবে ঘটেছে, সেভাবে সেগুলোকে ধরে নিয়েই আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার স্থির করতে হবে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও সর্বজনীন কল্যাণের বোধ কাম্য। ইংরেজিতে লোকমুখে চালু আছে : 'Live and let others live', 'Love and be loved', 'Honesty is the best policy'. জনগণের মধ্যে প্রচলিত এসব উক্তি অবশ্যই উন্নততর জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে।

পৃথিবীর যেকোনো উন্নত জাতির মতোই আমাদেরও আছে প্রাক-ইতিহাস (prehistory), আদি ইতিহাস (protohistory) ও ইতিহাস। তাতে বিধৃত আছে আমাদের প্রবহমান সংস্কৃতির ধারা-উপধারা, জনজীবনের গতিময় উত্থান-পতন। সেই ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত কালের ঘটনাবলি নিয়ে কিংবা শুধু পাকিস্তান-আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতাযুক্ত পর্যন্ত কালের ঘটনাবলি নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অসহিষ্ণু বিতর্কে মত্ত থাকা, প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া, ইতিহাসকে বিকৃত করা, গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনে এবং সব কিছুকে নির্মম দলীয়করণে সীমাবদ্ধ করে দলবাজি ও দুর্নীতিতে মত্ত থাকা, গণতন্ত্রের নামে বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব ও পরিবারতন্ত্রকে মেনে নেওয়া, হুজুগ সৃষ্টি করে জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণামূলক আচরণ করা ইত্যাদি দ্বারা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে জাতীয় অপসংস্কৃতিতে পর্যবসিত করে রাখা হয়েছে।

মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় গত তিন দশক ধরে পুরনো পরাজিত সংস্কার-বিশ্বাস ও প্রথা-পদ্ধতির উত্থান যেভাবে ঘটে চলছে, তা দেখে বলা যায় ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে। শুধু ধর্মনিরপেক্ষতা দিয়েই কি প্রগতি প্রমাণিত হয়? বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার চলমান কর্মনীতি কি সফল হবে?

সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল অবস্থা সৃষ্টি ও উন্নততর সংস্কৃতিতে উত্তীর্ণ হওয়াই জাতীয় জীবনে এখন আমাদের মূল কাজ। এ কাজে সবচেয়ে সহায়ক হবে ব্রিটিশশাসিত বাংলার হিন্দু-মুসলমান শ্রেষ্ঠ মনীষীদের এবং ইউরোপের চৌদ্দ শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত কালের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের প্রগতিশীল চিন্তাধারা। তাঁদের চিন্তাধারা আমাদের উন্নততর নতুন চিন্তা অর্জনে ও সৃষ্টির কাজে অনুপ্রাণিত করবে। সার্বিক উত্থান যাঁরা কামনা করেন তাঁদের অবলম্বন করতে হবে অতীতের ও বর্তমানের ভালো সব কিছুর প্রতি সংশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। ক্লাসিকের চর্চার মধ্য দিয়ে প্রয়াসপর হতে হবে নতুন রেনেসাঁস ও নতুন ক্লাসিক সৃষ্টিতে, তারপর নতুন গণজাগরণ। গণজাগরণ সৃষ্টির জন্য দূরদর্শী প্রচেষ্টা দরকার হয়। কোনো অভিসন্ধি সফল করার জন্য হঠাৎ করে হুজুগ তৈরি করা যায়, জাগরণ সৃষ্টি করা যায় না। অতীতের রেনেসাঁস ও ক্লাসিকের চর্চা নতুন রেনেসাঁস ও ক্লাসিক সৃষ্টির জন্য প্রেরণাদায়ক হবে। master discourse I grand narrative বলে যেসব বিষয়কে খারিজ করে দেওয়া হয়, সেগুলোকে খারিজ না করে পরিপূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। জনগণের ভেতর থেকে বিবেকবান চিন্তাশীল সাহসী ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে অগ্রযাত্রীর ভূমিকা পালন করতে হবে। সাহস হচ্ছে সেই মানবিক গুণ যা অন্য সব মানবিক গুণকে রক্ষা করে। সাহসের মূলে থাকে সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও সত্যনিষ্ঠা। পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, কণ্টকাকীর্ণ। সাধনা ও সংগ্রাম দুইই লাগবে। বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে গিয়ে ঘুমন্ত জনসাধারণকে জাগাতে হবে। জাতীয় জীবনে যথার্থ সাধনা ও সংগ্রাম দেখা দিলে উজ্জ্বল উত্থান অবশ্যই সম্ভব হবে। সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতির সঙ্গে বিরোধের মধ্য দিয়েই চলতে হবে, কোনো স্থায়ী মীমাংসার উপায় পাওয়া যায় না, সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতির ওপর জয়ী রাখতে হবে। মানবপ্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে সংকটের উৎসব। মানবস্বভাবকে উন্নত করার উপায় সন্ধান করতে হবে।

লেখক : প্রগতিশীল চিন্তাবিদ

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য