kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

ইরান-মার্কিন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ও তার পরিণতি

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইরান-মার্কিন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ও তার পরিণতি

তেলে-জলে কখনো মেশে না। বাংলায় প্রচলিত এই কথাটি ইরান-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিবার্য হয়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হওয়া সাপে-নেউলে সম্পর্কের একটা জোড়াতালি দিতে পেরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অব্যবহিত আগের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর আমেরিকার সব প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন ইরানের খোমিনিপন্থী সরকারকে উৎখাত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেটি যত দিন না হচ্ছে তত দিন নিদেনপক্ষে ঠেকিয়ে রাখতে চাইছে যাতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে। রিজিম পরিবর্তনের সব পুরনো ফন্দি-ফিকির চালিয়ে যখন ইরানের বেলায় সেটা অসম্ভব মনে হয়েছে, তখন সমসাময়িককালের শান্তিপ্রিয় প্রেসিডেন্ট বলে পরিচিত বারাক ওবামাও ২০১২ সালে হুমকি দিয়েছিলেন প্রয়োজনে সামরিক অভিযান চালানো হবে, যেমনটি এখন দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার  বিরুদ্ধে। তখন খবর বেরিয়েছিল ইরান অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে যাচ্ছে। সুতরাং  আমেরিকা এবারের মতো তখনো যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে বাহরাইনে অবস্থিত পঞ্চম নৌবহরের অতিরিক্ত আরেকটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ হরমুজ প্রণালির দিকে পাঠায়। তবে বারাক ওবামা অনেক সতর্ক ছিলেন, ইরাক আক্রমণের মতো মিথ্যা অজুহাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে যেন দ্বিতীয়বার নাস্তানাবুদ না হতে হয়।

মার্কিন সমরনায়কদের লক্ষ্য ছিল যেকোনো উসকানিমূলক পন্থায় ইরানকে একবার আগ্রাসী ভূমিকায় নিতে পারলেই আমেরিকা তার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়াসহ অনেক পাল্টা হুমকি দেওয়া হলেও আগ বাড়িয়ে কোনো আগ্রাসী ভূমিকায় তারা যায়নি। তাই সেই সময়ে বারাক ওবামা ও তাঁর প্রশাসন হয়তো বুঝেছে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে যত সহজে উৎখাত করা সম্ভব হয়েছে সে রকম কিছু ইরানের বেলায় সম্ভব হবে না। ইরাক আর ইরান এক কথা নয়, আকাশ-জমিন ফারাক। ইরাক থেকে প্রায় চার গুণ লোকসংখ্যা ইরানে। জাতীয়ভাবে ইরাকের জনগণ ছিল শিয়া, সুন্নি, কুর্দি—এই তিন ভাগে বিভক্ত। ইরানের বেলায় ঠিক এর বিপরীত, জাতীয় বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী। তারপর ২০০৩ সালে ইরাক ছিল বন্ধুহীন একটা রাষ্ট্র। তাই ২০০৩ সালে অন্যায়ভাবে ও মিথ্যা অজুহাতে মার্কিন সেনারা ইরাকে সামরিক অভিযান চালালে ইরাকের পক্ষে কেউ এগিয়ে আসেনি। কিন্তু ইরানের বেলায় সে রকম হবে না। প্রথমত ইরান নিজেই প্রত্যাঘাত করার যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে। আক্রান্ত হলে ইরান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইলের আঘাতে ইসরায়েল একটা ধ্বংস্তূপে পরিণত হবে। একই সঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং গাজার হামাস সমানতালে ইসরায়েলের ওপর রকেট মারতে থাকবে। তারপর চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের বহুমাত্রিক সম্পর্কের কারণে সামরিক অভিযান পরিচালনায় জাতিসংঘের ম্যান্ডেট নেওয়া আমেরিকার পক্ষে কখনো সম্ভব হবে না।

ইরাকের বেলায় সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে এনিমি উইদিন (Enemy within) ছিল শক্তিশালী, সে রকম ফোর্স ইরানের অভ্যন্তরে আমেরিকা তৈরি করতে পারেনি। বহু বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও ইরানের ভেতর থেকে ভেনিজুয়েলার মতো একজন জুয়ান গোয়াইডো আমেরিকা খুঁজে পায়নি। সুতরাং সব ভেবেচিন্তে বারাক ওবামা প্রশাসন ২০১২ সালের পর থেকে প্রায় দুই-তিন বছর ব্যাপকভিত্তিক আলাপ-আলোচনা এবং মাল্টি ট্র্যাক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানিকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের সঙ্গে এই মর্মে সমঝোতায় পৌঁছায় যে, আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং তার বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো  আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিদর্শনের জন্য সব সময় খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরান ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কার্যক্রম একটা পর্যায়ের পরে আর চালাবে না। তাতে সব পক্ষ মোটামুটি নিশ্চিত হয় এই চুক্তি মেনে চললে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। ২০১৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য প্লাস জার্মানি ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে, সেটি এখন জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) নামে পরিচিত। আমেরিকাসহ অন্যান্য স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো চুক্তিতে অঙ্গীকার করে ইরান শর্ত মেনে চললে তারাও সবাই ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে সরে আসবে। চুক্তিতে উল্লেখ আছে, এর দ্বারা ইরানের কনভেনশনাল অস্ত্রের উন্নতি ও আধুনিকায়নে কোনো বিধি-নিষেধ থাকবে না। এটা নিয়েই গোল বাধায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং আমেরিকা ডিপ স্টেটখ্যাত শক্তিশালী ইহুদি লবিস্ট গোষ্ঠী। আমেরিকার ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে রিপাবলিকানদের ওপর কট্টর ইহুদিবাদীদের প্রভাব অনেক বেশি।

বারাক ওবামা কর্তৃক চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ই রিপাবলিকান দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ২০১৬ সালের নির্বাচনে তাঁদের দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে চুক্তি বাতিল করা হবে। যে কথা সেই কাজ। রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় চুক্তি থেকে আমেরিকা নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়। যদিও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি কমিশন স্পষ্টভাবে বলেছে, ইরান ২০১৫ সালের চুক্তি সম্পূর্ণভাবেই মেনে চলছে, কোনো ব্যত্যয় নেই এবং শর্ত ভঙ্গও করেনি। রাশিয়া, চীন তো আছেই, তার সঙ্গে ইউরোপের তিন রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি সবাই আমেরিকার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং ঘোষণা দেয় তারা চুক্তিতে বহাল থাকবে এবং প্রত্যাশা করে ইরান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখবে। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের পক্ষ থেকে পারমাণবিক চুক্তি বহাল রাখার কথা এখনো বলা হলেও ওই সব দেশের কম্পানিগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছে না। চীন, ভারত ও ইউরোপের অনেক দেশই ইরান থেকে তেল রপ্তানি কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে ইরান ঘোষণা দিয়েছে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো যদি তেল রপ্তানিসহ পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য বহাল না রাখে, তাহলে ইরানও আংশিকভাবে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ নতুন করে শুরু করবে। এটাকে কেন্দ্র করেই আবার চরম বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীকে আমেরিকা সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ায় বেজায় খেপেছে ইরানের কট্টরপন্থী অংশ। ইরান পাল্টা হুমকি দিয়েছে তাদের তেল রপ্তানি যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে। এর বিপরীতে আমেরিকার যুদ্ধংদেহি নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বিশাল রণতরি আব্রাহাম লিংকনকে হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া এলিট ফোর্স মেরিন কোরের জন্য উভচর যানসহ বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়ে আরেকটি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ আর্লিংটন যোগ দেবে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে। পেন্টাগন সূত্রে খবর বেরিয়েছে, তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, ইরান কোনো না কোনোভাবে একটা ত্বরিত সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক বোমারু বিমান বি-৫২সহ সব শক্তি নিয়ে প্রস্তুত। উভয় পক্ষে টানটান উত্তেজনা। তাই ভেনিজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া ছেড়ে বিশ্বের দৃষ্টি এখন হরমুজ প্রণালির দিকে। যুদ্ধ নিশ্চিত এ কথা কেউ এখনো বলছে না। আবার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না।

যুদ্ধ হবে কি হবে না তার বিশ্লেষণে বহুমাত্রিক ফ্যাক্টর আছে। ইরান আগ বাড়িয়ে আগ্রাসী ভূমিকায় যাবে বলে মনে হয় না। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ শুরু করবে পুরোদমে। তাতে আমেরিকার ইহুদি লবি কী করবে সেটাই দেখার বিষয়। বেশির ভাগ বিশ্লেষকের ধারণা, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে যদি মনে হয় জনসমর্থন কমে যাওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না, তাহলে যুদ্ধের আশঙ্কা বহুলাংশে বেড়ে যাবে। ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার কৃত্বিতের কারণে মার্কিনবাসী জর্জ ডাব্লিউ বুশকে বিপুল ভোটে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল, যেখানে ২০০০ সালে প্রথমবার বুশ জিতেছিলেন কোনোভাবে টেনেটুনে। তবে হরমুজ প্রণালি যুদ্ধক্ষেত্র হলে সারা বিশ্বে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে। হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মোহনা বা সংযোগস্থল, যার পূর্ব পারে ইরানের বন্দর আব্বাস, আর পশ্চিম পারে ওমানের ডোবা বন্দর। মোহনা পয়েন্টে প্রণালি ১২ মাইল চওড়া, যার মধ্যে শিপিং করিডর মাত্র ছয় মাইল এবং যার বেশির ভাগই আবার ইরানের পার ঘেঁষে প্রবাহিত। হরমুজ প্রণালির মোহনা পেরিয়ে পারস্য উপসাগর পড়েছে আরব সাগরে। হরমুজ প্রণালির উত্তরে প্রায় ৬০০ মাইল দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে বিস্তৃত পারস্য উপসাগর ইরানকে আরব বিশ্ব থেকে আলাদা করেছে।

পারস্য উপসাগরের পূর্ব পারে ইরান, আর পশ্চিম পার ঘেঁষে আছে ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব এবং সর্ব উত্তরে ইরাক। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রয়োজনের ১৭ শতাংশ জ্বালানি তেলের সরবরাহ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দৈনিক প্রায় ১৭ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। তাই বিশ্বের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বাধাহীন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। বিশ্ব রিজার্ভের ৫৭ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৪৫ শতাংশ গ্যাস রয়েছে এই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে। শুধু ইরানেই বিশ্ব রিজার্ভের ১১.১ শতাংশ তেল ও ১৫.৩ শতাংশ গ্যাস মজুদ আছে। তাই স্বল্প সময়ের জন্যও যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে আসবে এক মহাবিপর্যয়।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা