kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার গল্প

হুসেইন হাক্কানি

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার গল্প

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আবারও পাকিস্তানকে অর্থ সহায়তা (বেইল আউট) দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি ১৩তম বেইল আউট। এই ঘোষণা আসার কয়েক দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন অর্থমন্ত্রী আসাদ ওমর। সহজেই অনুমান করা যায়, আইএমএফকে সঙ্গে নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা পাকিস্তানিদের পছন্দ হবে না। ইমরান খানের মন্ত্রিসভা থেকে ওমরের বিদায় সেনাবাহিনীকে পূর্ববর্তী প্রশাসন থেকে তাদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে এনে এই পদে বসানোর সুযোগ করে দিয়েছে।

অর্থনীতি ব্যবস্থাপনাসহ সব ব্যাপারেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতামত রয়েছে, যদিও সামরিক কর্মকর্তাদের অর্থনীতিবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। পাকিস্তান শাসনকারী জেনারেলরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না, দেশের অর্থনীতি প্রয়োজনের চেয়ে বড় সেনাবাহিনী বা সময়ে সময়ে তাদের শুরু করা যুদ্ধের বোঝা টানতে পারবে না। জিহাদি সন্ত্রাস এবং বিদেশিদের বিনিয়োগ বা বাণিজ্যে অনীহার মধ্যে কোনো যোগসূত্রও তাঁরা দেখতে পান না।

জেনারেলদের প্রভাবেই পাকিস্তান যুদ্ধবাজ জাতিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের অবমূল্যায়ন করা হয়। যদিও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বহু সমৃদ্ধ দেশের কাছে তারাই প্রধান চালিকাশক্তি। রাজনীতিবিদ ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মাঝেমধ্যে কারাগারে যেতে হয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য। চুক্তিগুলোও বাতিল হয়ে যায়।

কর আদায়ও সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কারণ জমিদার রাজনীতিক বা সেনা সদস্যরা কর দিতে আগ্রহী নন। লোকসানে থাকা সরকারি খাতগুলোতে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের জন্য লোভনীয় চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই বন্ধ বা বিক্রি করা হয় না, যদিও আইএমএফের কাছ থেকে টাকা আনার সময় প্রতি দফায়ই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাইভেটাইজেশনের প্রতিশ্রুতি দেয় পাকিস্তান।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, বাস্তবায়নযোগ্য চুক্তি এবং পুঁজি ও পুঁজিবাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনোটিই পাকিস্তানে নেই। বরং নীতি নির্ধারণ করা হয় কতগুলো কাল্পনিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে। যেমন বিদেশি ব্যাংকগুলোতে বহু পাকিস্তানির অবৈধ উপার্জনের কোটি কোটি ডলার অলস পড়ে আছে। এগুলোকে সৎ নেতৃত্ব (পড়ুন সেনাপন্থী) দেশে ফিরিয়ে আনবে। অথবা অবস্থাপন্ন পাকিস্তানিদের চাঁদায় শতকোটি ডলার ব্যয়ে সুবিশাল বাঁধ নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা।

পাকিস্তানের সেনা পরিচালিত অর্থনীতিতে জজবা (ধর্মীয় আবেগ) ও চাঁদার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অর্থনীতির বিষয়গুলোতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সেনাবাহিনীর এই সরল উদাহরণগুলোর একজন উচ্চকিত বেসামরিক সমর্থক। তিনি পাকিস্তানিদের আশ্বস্ত করেছেন, তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাঁর এই বাক্য (আপকো ঘাবরানা নেহি হ্যায়) দেশটিতে কৌতুকে পরিণত হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। ইমরান কেন সৌদি আরব, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এক হাজার কোটি ডলার চেয়ে এনেছেন, তা তাঁরা বোঝেন। ইমরানের ধারণা, তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এলে আর আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হবে না। সেই অর্থ এখন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।

একজন রোগীর নিবিড় পরিচর্চা কেন্দ্রে (আইসিইউ) যাওয়া আর একটি দেশের জন্য আইএমএফের দ্বারস্থ হওয়া একই অর্থ বহন করে। পাকিস্তান গত তিন দশকের মধ্যে ২২ বছরই কাটিয়েছে আইএমএফের আইসিইউতে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি গুরুতর অসুস্থ।

পাকিস্তান বাজেট ও বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ভুগছে বহু বছর ধরে। রপ্তানি ও কর আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না। কয়েক মাস ধরে প্রচুর অর্থ আগমনের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সেভাবে বাড়েনি। অপর্যাপ্ত রাজস্ব ও রপ্তানির ঘাটতি পূরণে পাকিস্তানকে প্রায়ই ঋণ করতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ভার বেড়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল হয়েছে রুপি।

যখনই দেশ অর্থসংকটে পড়েছে তখনই তারা আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে। ১৯৭২ সালের পর থেকে পাকিস্তান মোট ১৮ বার আইএমএফ থেকে অর্থ নিয়েছে। তুলনা করলে দেখা যাবে, একই সময় বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েছে ১০ বার। আর্থিক হিসাবে পাকিস্তানের ঋণগ্রহণের পরিমাণ এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের ২৭০ কোটি ডলার। রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে ২০১৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে আর আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়নি।

বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে পাঞ্জাবের অভিজাত শ্রেণি সব সময়ই দেশের পূর্বাঞ্চলীয় অংশকে নিচু চোখে দেখেছে। ১৯৭১ সালে বাঙালিরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা আদায় করা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় ছিল। স্বাধীনতা লাভের মুহূর্তে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। নিরক্ষরতা আর অভাবও বেশি ছিল। তুলনামূলক বিচারে এখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা কমেছে, বেড়েছে সাক্ষরতার হার। আর দারিদ্র্য কমেছে। দেশটির জিডিপি ১৯৭২ সালে ছিল ৬০০ কোটি ডলার। আজ তা বেড়ে ২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

পাকিস্তান যখন তার সেনা ও পরমাণু অস্ত্র খাতে বিনিয়োগ করেছে তখন বাংলাদেশ অর্থ লগ্নি করেছে জনগণের পেছনে। দেশটির সাক্ষরতার হার ১৯৭১ সালে ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ। ২০১৬ সালে গিয়ে ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ২০১৮ সালে পাকিস্তানের সাক্ষরতার হার ছিল (১৯৭১ সাল থেকে ২২ শতাংশ বেড়ে) ৫৮ শতাংশ। শিক্ষিত বাংলাদেশিরা দেশটিকে সমৃদ্ধ করছে।

পাকিস্তান এখনো বিশ্বে সুতা রপ্তানি করে চলেছে। আর বাংলাদেশ বেশি দামের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আরো বেশি অর্থ উপার্জন করছে। শিক্ষিত বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারীরা তাদের তৈরি পণ্য দিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি পাকিস্তানের সুতা রপ্তানিকে ছাড়িয়ে গেছে, যদিও পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সুতা রপ্তানিকারক দেশ।

এই মৌলিক বিষয়গুলো সমাধানের পরিবর্তে পাকিস্তানের জেনারেলরা বরাবরই ভালো যোগাযোগ রয়েছে—এমন আন্তর্জাতিক ব্যাংকার, বহুজাতিক কম্পানির নির্বাহী অথবা বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের খোঁজ করে গেছেন। জেনারেলদের চেষ্টা ছিল, এসব ব্যক্তিকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের ব্যালান্সশিটে আরো কয়েকটি ঋণ বা চাঁদার অন্তর্ভুক্তি ঘটানো। ফলে জজবা বা চাঁদার চাকা বরাবরই সচল ছিল। কখনোই স্বাস্থ্যকর অর্থনীতিতে ফেরার চেষ্টা করা হয়নি।

পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার আগে ইকোনমি সাময়িকীকে দেওয়া এক বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী ওমর পাকিস্তানের আইএমএফ আসক্তি কাটানোর প্রতিশ্রুতি দেন। মজার বিষয় হচ্ছে, ২০০১ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের অর্থমন্ত্রী শওকত আজিজও একই পত্রিকায় একই প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছিলেন। ওই বছর সেরা অর্থমন্ত্রীর পুরস্কারটি ইকোনমি শওকত আজিজকেই দিয়েছিল।

যদিও ইকোনমির বিরুদ্ধে ‘বিজ্ঞাপন নিয়ে নানা পুরস্কার দেওয়ার’ অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালেও পত্রিকাটি পাকিস্তানের ‘টেকসই উন্নয়নের উৎসাহব্যঞ্জক চিহ্ন’ খুঁজে পেয়েছিল। এর পরই ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সরিয়ে দেন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়া।

আইএমএফ থেকে সেনাবাহিনীর অতীত অর্থপ্রাপ্তি দেশকে টেকসই অর্থনীতি উপহার দিতে পারেনি। এবারও ভিন্ন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত, ওয়াশিংটনভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক পরিচালক

সূত্র : দ্য প্রিন্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য