kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

পরিকল্পিত শহর গড়ে তুলতে হবে

ড. হারুন রশীদ

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পরিকল্পিত শহর গড়ে তুলতে হবে

একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে আগুনের শহর হিসেবে খ্যাতি জুটতে যাচ্ছে কি ঢাকার? বাস অনুপযোগী শহর হিসেবে রাজধানী ঢাকা এরই মধ্যে খ্যাতি কুড়িয়েছে। এবার নিমতলী ট্র্যাজেডির পর চুড়িহাট্টায় এত প্রাণ গেল। সেই শোক মিলিয়ে না যেতেই ঘটল বনানীর এফআর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। সেখানে ২৬ জন মানুষ প্রাণ হারাল। এর এক দিন না যেতেই আবার আগুন লাগল গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচা ও সুপার মার্কেটে। প্রশ্ন হচ্ছে, আর কত প্রাণ গেলে থামবে এই অগ্নিকাণ্ড নামক হত্যাযজ্ঞ?

আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ঢাকা মহানগরীর অন্তত সাড়ে ১১ হাজার বহুতল ভবন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভবনে অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত ফায়ার সার্ভিসের কোনো ছাড়পত্র বা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার (ফায়ার সেফটি প্ল্যান) অনুমোদন নেই। যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে আরো ভয়াবহ ঘটনা। গুলশানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, শুধু গুলশান-বনানী নয়, ঢাকা শহরের যেকোনো স্থানে যদি অপরিকল্পিতভাবে ইমারত নির্মিত হয়ে থাকে, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা না থাকে—সেই বিষয়ে রাজউক পরিদর্শন শুরু করবে। তিনি বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে মালিক হোক, ডেভেলপার হোক, এমনকি রাজউকের কেউ জড়িত থাকলে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গৃহায়ণমন্ত্রী বলেন, ‘এটি কিন্তু দীর্ঘদিনের জঞ্জাল। আমরা চেষ্টা করছি, পূর্বাচল ঝিলমিলসহ নতুন যে শহরগুলো হচ্ছে সেখানে পরিকল্পনার বাইরে কোনো স্থাপনা হতে দিচ্ছি না। এখানে স্থানীয় কিছু বিরোধ আছে, আপনারা জানেন। আমরা চেষ্টা করছি তা দূর করে পরিকল্পিতভাবে সমন্বয় করার। কোথাও কোনো অনিয়ম থাকলে আমাকে জানান। অ্যাকশনে যাব।’

রাজউক অ্যাকশনে নেমেছে। তবে তা কতটা ফলদায়ক হবে সেটি নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে। এর আগেও নানা রকম প্রতিশ্রুতি এলেও কাজের কাজ খুব একটা হয়নি। না হলে দিনের পর দিন অনিয়ম করে কিভাবে পার পেয়ে যায় ভবন মালিকরা। রাজধানীর বেশির ভাগ ভবনই নকশা মেনে করা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কম।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছুই অনুপস্থিত। এক জরিপে প্রকাশ পেয়েছে ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থায়ই এই জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। এ ছাড়া যানজট, যানবাহন এবং কলকারখানার কালো ধোঁয়া, খাদ্যে ভেজাল, সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিম্নমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এই শহরে নেই পয়োনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন। কিন্তু সব কিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এ জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এই শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। এতে নগরী তার বিশিষ্টতা হারাচ্ছে।

বাংলাদেশ ভূকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত।  ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস এখনো বিজ্ঞানীরা দিতে পারছেন না। তবে নানা গবেষণায় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের কথা উঠে এসেছে বারবার। বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশ এখন কোনোমতেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ গত ৮০-৮১ বছরে কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান প্লেট যাচ্ছে উত্তর দিকে, আর উত্তর দিকে আমাদের ইউরেশিয়ান প্লেট। দুটি প্লেট ধাক্কা দিচ্ছে, আর তাতে এর বাউন্ডারিতে এনার্জি স্টোর হচ্ছে। বেশ কিছুদিন পর পর প্রেসারটি রিলিজ করার জন্য জায়গাটি নড়ে যায় আর তখন ভূমিকম্প হয়।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা লক্ষাধিক। একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ভূকম্পনেও বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। এ ক্ষেত্রে নতুন ভবন নির্মাণে সরকারি তদারকি আরো বাড়ানো প্রয়োজন। বারবার ভূমিকম্প এ কথাই যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা আসলে কতটা প্রস্তুত। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্পে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ থেকে তিন লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।

ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাকে আটকানোর কোনো পথ নেই। এ অবস্থায় সচেতনতা এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ অনেক দূর অগ্রসর হলেও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভূমিকম্প মোকাবেলা করার মতো প্রস্তুতিতে আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়, আর এ জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। জাতীয় উদ্যোগ নিতে হবে ভূমিকম্পের সময় ও তারপর কী কী করণীয় সে সম্পর্কে মানুষকে সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে। ভূমিকম্প মোকাবেলায় প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারাভিযান। সরকারি উদ্যোগে ফায়ার সার্ভিস, ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সব সময় প্রস্তুত রাখতে হবে। ভূমিকম্পের সময় দালান ভেঙে পড়ে বেশি মানুষের ক্ষতি হয়। তাই নির্মাণাধীন বাড়িগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হচ্ছে কি না কর্তৃপক্ষের সে ব্যাপারে তদারকি জোরদার করতে হবে।

উপকূলীয় এলাকা, যেখানে সুনামি, ভূমিকম্প—সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে, সেখানে তৈরি করতে হবে অনেক আশ্রয়কেন্দ্র, যাতে মানুষ বিপদের সংকেত পাওয়ামাত্রই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে ভূমিকম্প হলে উত্তেজিত না হয়ে সাবধানে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।  তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে মিডিয়ায় আরো প্রচার চালাতে হবে। শুধু জনসচেতনতাই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি এ দেশের বিশেষজ্ঞরা যেন ভূমিকম্পের ওপর গবেষণা করার সুযোগ পান এবং ভূমিকম্পের পরিমাণ নির্ণয় করার উপযুক্ত প্রযুক্তি পান, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে মনোযোগ দিতে হবে। ভূমিকম্প রোধের ক্ষমতা যেহেতু আমাদের হাতে নেই, সেহেতু বিপর্যয় মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়িয়ে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে হবে।

দুই.

একটি নগরে সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। সে জন্য নগরজীবনকে স্বচ্ছন্দ, পরিবেশবান্ধব, টেকসই, উন্নয়নমুখী এবং পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কেননা দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে। আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি, যার সব কিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। কোথায় স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল হবে, অফিস-আদালত কোথায়, কোথায় বসবাসের জায়গা—সব কিছুই হবে পরিকল্পনামাফিক। পরিকল্পনামাফিক সব কিছু হলে প্রতিটি নগরেই মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এতে তার নগরজীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফস্বলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এ নগরই আবার পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না।

দুঃখজনক হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় বারবার ঢাকার নাম উঠে আসছে বিভিন্ন জরিপে। আমাদের রাজধানী শহর বসবাসের অনুপযোগী—এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! এ অবস্থা যে আমাদের জন্য গৌরবজনক নয়, সেটি কি বলার অপেক্ষা রাখে? একটি শহরের মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যে নিয়ামকগুলো কাজ করে সেগুলো বিবেচনা করলে ঢাকাসহ আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য শহরকেও পরিকল্পনামাফিক গড়ে তুলতে হবে। সুষম উন্নয়ন করতে হবে গ্রামেও। শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

[email protected]

মন্তব্য