kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

বাঙালিজীবন ও বাংলা নববর্ষ

ড. এম আবদুল আলীম

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাঙালিজীবন ও বাংলা নববর্ষ

বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক নানা উপলক্ষে তারা আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকে। ঈদ, পূজা-পার্বণ, মহররম—এসব ধর্মীয় উৎসব তো আছেই; এর বাইরে রাষ্ট্রীয় নানা দিবস, যেমন—শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস এবং বিজয় দিবসও পালিত হয় উৎসবের আমেজে। তবু ব্যতিক্রম বাংলা নববর্ষ। এর আবেদনই আলাদা। ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে পুরো জাতি পালন করে এই উৎসব। চিরায়ত বাঙালিত্বের অহংকার আর সংস্কৃতির উদার আহ্বানে জাগরূক হয়ে গল্পে-গানে, নাচে-আড্ডায়, আহারে-বিহারে চলে নতুন বছরকে বরণ করার পালা। মোদ্দা কথা, বাংলা নববর্ষ হলো বাঙালির সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এই উৎসবের মাধ্যমে বাঙালি তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন স্থাপন করে এবং জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে।

নববর্ষ শুধু বাহ্যিক অনুষ্ঠানাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মাধ্যমে জাতি তার স্বকীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় শক্তি সঞ্চয় করে। সচেষ্ট হয় নিজের আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে। শুধু তা-ই নয়, একদা নববর্ষ বাঙালিকে ইস্পাতকঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল এবং স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল আর শক্তি ও সাহস সঞ্চার করেছিল। বর্তমানে নববর্ষ পারিবারিক-সামাজিক জীবনকে তো নব-উদ্দীপনায় জাগ্রত করেই; পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও করে গতিসঞ্চার। নববর্ষ পুরনো বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালিজীবনে ওড়ায় নতুনের কেতন। চেতনায় বাজায় মহামিলনের সুর। সব ভেদাভেদ ভুলে সব বাঙালিকে মিলিত করে এক সম্প্রীতির মোহনায়। নববর্ষের আগমনী ধ্বনি শুনলেই পুরো জাতি নতুনের আবাহনে জেগে ওঠে। গ্রামের জীর্ণ কুটির থেকে শহরের বিলাসবহুল বহুতল ভবন কিংবা দূর প্রবাসের ম্যাগাসিটি, সর্বত্রই প্রবাহিত হয় আনন্দের ফল্গুধারা।

শুধু একাল নয়, সুদূর প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বাঙালি পালন করে এসেছে সাংস্কৃতিক নানা উৎসব ও অনুষ্ঠান। সেকালে কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানাদিতে নেচে-গেয়ে আনন্দ করত বাঙালি নর-নারী। ফসল রাজা ও ফসল রানি নির্বাচিত করা, বসন্তকালীন অনুষ্ঠান, ফসল লাগানো এবং নবান্ন অনুষ্ঠান, বলিদান ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নানা উপলক্ষে চলত নাচ-গান ও ভোজন। জীবনে যেমন, তেমনি প্রকৃতিতেও ফুটে উঠত নববর্ষের আমেজ। মধ্যযুগেও এর কমতি ছিল না। মৈমনসিংহ গীতিকার কবি তো নববর্ষের সাজ দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে লিখেছিলেন : ‘আইলো নতুন বছর লইয়া নবসাজ,/কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ।’ লোককবি নবসাজে নতুন বছরের যে রূপ দেখেছিলেন, তাতে বনে গন্ধরাজের প্রাণমাতানো গন্ধ আর কোকিল-কেকার কলরব ও নাচে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠেছিল।

বাংলা নববর্ষ কী করে পালন শুরু হলো? এ প্রশ্ন জাগা অসংগত নয়। সে উত্তর এককথায় দেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। এ জন্য আমাদের চোখ মেলতে হয় ইতিহাসের ঝরোকায়। ভারততত্ত্ববিদ আল বিরুনী ‘কিতাব উল হিন্দ’-এ (রচনাকাল আনুমানিক ১৩৩০ খ্রিস্টাব্দ) ভারতবর্ষে প্রচলিত যেসব অব্দের (শ্রীহর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, বলভাব্দ ও গুপ্তাব্দ) নাম উল্লেখ করেছেন, তাতে বঙ্গাব্দ নেই। বঙ্গাব্দ চালু হয় এর অনেক পরে, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে। ঐতিহাসিক আবুল ফজল ‘আইন ই আকবরী’তে সাক্ষ্য দিচ্ছেন : ‘আকবর বেশ কিছুদিন হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনগণনার সমস্যাকে সহজ করে তোলার জন্য একটি পদ্ধতি প্রবর্তন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছিলেন।...আমীর ফতেহ উল্লাহ শিরাজীর প্রচেষ্টায় এই নতুন অব্দের প্রচলন হলো। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের ২৫ দিন গত হলে, অর্থাৎ বুধবার, ২৮ রবিউস সানি (১১ মার্চ) তারিখে ভুবন আলোককারী ‘নতুন বর্ষের’ শুরু হয়েছিল। এই দিনটি ছিল পারসিক বছরের নওরোজ। বিশ্বাস অনুযায়ী ওই দিন (১১ মার্চ) সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করত। বাংলা নববর্ষ যেভাবেই আসুক না কেন, এখন তা বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ এলেই সব বাঙালির প্রাণ বাংলা নববর্ষ বরণের আনন্দে আপনা-আপনিই নেচে ওঠে।

সম্রাট আকবর বাংলা নববর্ষ প্রচলন করলেও নববর্ষ পালনের ইতিহাস বহু পুরনো। সর্বপ্রথম নববর্ষ পালিত হয় মেসোপটেমিয়ায়, ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। খ্রিস্টীয় নববর্ষ চালু হয় জুলিয়াস সিজারের সময় থেকে। রাশিয়া, চীন, ইরান ও স্পেনে নববর্ষ পালিত হতো ঘটা করে। মুসলিম শাসকদের হাত ধরে ইরানের নওরোজ ভারতবর্ষে আসে। মোগল আমলে খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে নওরোজ উৎসব পালন করা হতো। নওরোজ উৎসবেই জাহাঙ্গীরের সঙ্গে নূরজাহানের প্রথম মনবিনিময় হয়েছিল। সম্রাট আকবর বাংলা নববর্ষ চালু করেন বছরের নির্দিষ্ট সময় প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করার জন্য। ফসল তুলে আনন্দের সঙ্গে খাজনা দেওয়া এবং মিষ্টি খাওয়ানোর সঙ্গে কালে কালে যুক্ত হয় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক আচার-বিশ্বাস, রীতিনীতি ও আনন্দ-বিনোদনের উপাদান। ধীরে ধীরে দিনটি হয়ে ওঠে শুভ চিন্তা ও অনুভূতির দ্যোতক। লোকমেলা, পুণ্যাহ, হালখাতা, গাজনের গান, লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, পুতুলনাচ, জারি-সারি-বাউল গান; এসব যুক্ত হতে হতে নববর্ষ আজ অস্তিত্বের শক্তিদায়িনী উৎসবে পরিণত হয়েছে। নববর্ষের সঙ্গে অর্থনীতির গভীর যোগসূত্র থাকলেও এর সাংস্কৃতিক আবেদন সুদূরপ্রসারী। সামাজিক উৎসব হিসেবে নববর্ষ পালন শুরু হয় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করতে গিয়ে যতই বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির টুঁটি চেপে ধরেছে ততই বাংলা নববর্ষ পরিণত হয়েছে বাঙালির শক্তি-সাহস, প্রেরণা ও উদ্দীপনার মূলমন্ত্ররূপে।

বর্তমানে বাংলা নববর্ষ খুব উৎসবপূর্ণ ও ব্যাপক পরিসরে পালিত হলেও পঞ্চাশের দশকে সেটা তেমন ছিল না। তখন লেখক-শিল্পী মজলিস ও পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ নববর্ষ উপলক্ষে ঘরোয়াভাবে আবৃত্তি, সংগীতানুষ্ঠান ও সাহিত্যসভা আয়োজন করত। সন্জীদা খাতুনসহ অন্যদের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গান দিয়ে বছরের প্রথম দিন সকালে নববর্ষের আবাহন শুরু হয় রমনা অশ্বত্থতলায় এবং সেটা হয় ১৯৬৫ সালে। এরপর বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার পালে যতই হাওয়া লেগেছে ততই উৎসবমুখর হয়েছে নববর্ষের আয়োজন। পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধসহ সাংস্কৃতিক নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করায় নববর্ষে লাগে নিত্যনতুন উদ্দীপনা। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের মর্মমূলে গভীর প্রেরণা ও শক্তি জুগিয়েছে বাংলা নববর্ষ। দেশ স্বাধীন হলে নববর্ষ পালনে আরো ব্যাপকতা আসে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার পহেলা বৈশাখকে জাতীয় পার্বণ হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীকালে ছায়ানট ছাড়াও রাজধানীতে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলা একাডেমি, চারুকলা ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন বাংলা নববর্ষকে মহা-উৎসবে পরিণত করেছে। বর্তমানে পল্লীর নিভৃত কুটির থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ, জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ও রাজধানী শহরের সর্বত্র উছলে পড়ে বাংলা নববর্ষ পালনের আনন্দ। হাজারো শিল্পী নেচে-গেয়ে বর্ষবরণ করে। রাজধানীর শপিং মল এবং গ্রাম ও শহরের বিপণিবিতানগুলোতে ভিড় উপচে পড়ে। গণমাধ্যমগুলো প্রচার করে বিচিত্র অনুষ্ঠান। সংবাদপত্র বের করে বিশেষ ক্রোড়পত্র। দেশজুড়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়াও আয়োজন করা হয় বিচিত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নতুন পোশাক আর বিচিত্র সাজে রাস্তায় নেমে আসে সব বয়সী মানুষ। ঢাকঢোল আর তবলার তালে তালে গাওয়া হয় লোকসংগীত। আলপনার রঙে সাজানো হয় চারদিক। পান্তা-ইলিশ আর মুড়ি-মুড়কির ভোজ আর বাউলের একতারার সুরে মন-মাতানো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বর্তমান সরকার নববর্ষ ভাতা চালু করে এ উৎসবে আরো প্রাণসঞ্চার করেছে।

নববর্ষের সর্বজনীন, উদার ও অসাম্প্রদায়িক অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। পাকিস্তান সরকার নানা ফন্দি-ফিকির করে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনে বাধা সৃষ্টি করলেও একুশ শতকে এসে তাদের প্রেতাত্মারা ছদ্মবেশে আঘাত হেনেছে নববর্ষের অনুষ্ঠানে। ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখ রমনার বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা ও অগণিত মানুষকে আহত করা হয়। কিন্তু তাতেও থামানো যায়নি বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষের অগ্রযাত্রা। বরং গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে প্রবাস, যেখানে বাঙালি আছে, সেখানেই সাড়ম্বরে পালিত হয় বাংলা নববর্ষ। বাঙালিজীবনের সব ক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষ আনে নব-উদ্দীপনা।

বাংলা নববর্ষ আবারও এসেছে আমাদের মাঝে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করে নববর্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সাংস্কৃতিক সৌধের ভিত আরো দৃঢ় করুক। নববর্ষের উদার আলোয় এবং মঙ্গলবার্তায় জাতির ভাগ্যাকাশের সব অন্ধকার দূরীভূত হোক। জঙ্গিবাদী অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটুক। একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক—এটিই হোক এবারের নববর্ষের প্রত্যয়।

লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য