kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

বাংলার স্বকীয়তা নষ্ট করা যাবে না

হাশেম খান

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলার স্বকীয়তা নষ্ট করা যাবে না

নববর্ষ বলতে এখন আমরা পহেলা বৈশাখকেই মনে করি। কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ একটা বিশাল অর্জন। আর এই অর্জন সম্ভব হয়েছে আমাদের যে দীর্ঘকালের সংগ্রাম—সেই ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলন, তারপর রাজনৈতিক অধিকার আন্দোলন, আমাদের সাংস্কৃতিক অধিকার আন্দোলন এবং সর্বোপরি স্বাধীনতাযুদ্ধ; এর মধ্য দিয়েই কিন্তু আমরা আমাদের মূল পরিচয় বাংলা—এই অঞ্চলের সমগ্র বাংলা, আমাদের ষড়ঋতু, আমাদের সংস্কৃতি; সব মিলিয়েই কিন্তু আমাদের জীবনযাপন আবর্তিত হয়। আমাদের পোশাক, জীবনচর্চা, সংস্কৃতি, পালাপার্বণ—হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী—সবার হয়তো ধর্ম আলাদা; কিন্তু সব কিছুর মধ্য দিয়ে আমাদের ভাষাটা হচ্ছে বাংলা এবং এই ষড়ঋতু দ্বারা আমরা সবাই আবর্তিত হই। ষড়ঋতু আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সবাই প্রায় একই গান গাই এবং অন্যের গানও আমরা পছন্দ করি। এভাবে ধর্ম ও জাতিতে বৈচিত্র্য থাকলেও আমরা মিলেমিশে বসবাস করি। আমাদের আবহাওয়া ও জলবায়ু, নদী ও আকাশ, সবুজ গ্রাম, গাছপালা, বিশাল প্রান্তর, ছোট-বড় পাহাড়—সব মিলিয়েই আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি।

আমাদের সংস্কৃতি বলতে অনেকে মনে করে, গান-বাজনা কিংবা নৃত্যানুষ্ঠান ও নাটক। এগুলো সংস্কৃতির অনুষঙ্গ; কিন্তু এগুলোই যে সংস্কৃতি, তা নয়। গান ও নাটক একেকটা বিষয় বা অনুষঙ্গ। কিন্তু সব মিলিয়ে আমাদের যে ভাবনা, আমি যে বারবার ষড়ঋতুর কথা বলছি, এই ষড়ঋতুই কিন্তু আমাদের তৈরি করে দিয়েছে মন ও মননে। শীতকালে কিভাবে চলব, গরমকালে আমাদের জীবনযাপন কেমন হবে—এর সবই কিন্তু তৈরি করে দিয়েছে ষড়ঋতু। আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে কৃষি, মাটি ও জলবায়ু। কৃষি আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি। আমাদের কৃষকরা জানে বর্ষায় কিভাবে জমি ও ফসলের যত্ন নিতে হবে, শীতকালে কী করতে হবে। আমরা এখন যতই নিজেদের শহরের বাসিন্দা বা অভিজাত নাগরিক হিসেবে মনে করি বা পরিচয় দিই না কেন, ঈদের অনুষ্ঠান বা আমাদের স্বাধীনতা দিবসে বা অন্য বিভিন্ন উপলক্ষে যখন ছুটি হয় তখন কিন্তু শহর ফাঁকা হয়ে যায়। সবাই আমরা গ্রামের দিকে ফিরে যাই। আমরা এখনো সেই বহুকালের গ্রামীণ কৃষির ওপর নির্ভর করে চলছি এবং ভবিষ্যতেও চলব। কারণ বাংলাদেশের মাটি হচ্ছে আমাদের সম্পদ। সুতরাং এসব মিলিয়েই কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি।

আজকে আমরা যে পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতি পালন করি, এ ছাড়া আমাদের যে পালা কিংবা বিভিন্ন ধর্মের যে সংস্কৃতিগুলো আছে এবং সব ধর্ম মিলিয়ে যে জাতীয় অনুষ্ঠান—একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ—এগুলো কিন্তু আমরা সবাই মিলে করছি। এই যে বড় বড় অনুষ্ঠান আমরা পালন করি, একসঙ্গে অনেক আনন্দ করি, এখানে একটি বড় ব্যাপার হচ্ছে, এগুলো কিন্তু আমরা গভীরভাবে অনুভব করি। কারণ আমরা বাঙালি। আমরা যে নানা উৎসব পালন করি, উৎসবের মধ্য দিয়েই কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি বা অনুভূতিগুলো শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। অনেকের কাছে হয়তো উৎসবটাই বড়। কিন্তু এটা হওয়া ঠিক নয়। আমরা তাদের বলব, প্রতিবছর যে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়—মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হয়, ছায়ানট থেকে গানের অনুষ্ঠান করা হয়। এভাবে শহরে-নগরে-বন্দরে সবাই কোনো না কোনো অনুষ্ঠান করছে—এটা যেমন আমাদের অনুভূতির বিষয়, তেমনি এটা এক দিন পালন করা হবে তা নয়। এটা আমাদের চেতনা ও জীবনযাপনেরই অংশ। প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে মনে করি। অনুভব করি। ধারণ করি।

এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যে আলবদর তৈরি হয়েছিল, রাজাকার ও অন্যান্য বিরুদ্ধ দল তৈরি হয়েছিল—পরবর্তীকালে আমরা কী দেখেছি, তারা বাংলাদেশকে, বঙ্গবন্ধুকে এবং বাংলা ভাষাকে অপমান করেছিল। যারা প্রগতিশীল চিন্তা করত, দেশের স্বাধীনতার জন্য চিন্তাভাবনা ও লড়াই করেছিল, তাদের তারা অপমান করেছিল। এমনকি সব কিছু বন্ধ করে দেওয়ারও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা তো অনুধাবন করতে পারেনি—স্বাধীনতার চেতনাটা বাঙালির চেতনা, বাঙালি সংস্কৃতির চেতনা, এটাকে কিছুতেই রোখা যাবে না। আমাদের চেতনাকে ধ্বংস করা যাবে না। কারণ এটা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে মিশে আছে। পৃথিবীতে এমন দেশ কমই আছে, যেখানে সব মানুষ এক ভাষায় কথা বলে। আমাদের বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ বাংলায় কথা বলে। ১৬ কোটি মানুষ এখানে, সবাই বাংলায় কথা বলতে পারে, বুঝতে পারে—এটা আমাদের এক ধরনের শক্তি। তখন বাংলাদেশের ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, তবু পশ্চিম পাকিস্তান এ দেশের মানুষের প্রাণের ভাষাকে গুরুত্ব দিতে চায়নি, বরং অস্বীকার করেছে। অন্য ভাষাকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। আমরা বলেছি, কেন বাংলা নয়? তোমরা উর্দু রাখতে চাও, রাখো। কিন্তু উর্দু আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নয়। বিষয়টা অনেকে বোঝেনি। এখনো অনেকে বলে, আমরা উর্দু চাইনি, এটা ঠিক নয়। আমরা কিন্তু উর্দুর বিরোধিতা করিনি। উল্টো তাদের মনোভাবের, তাদের একপেশে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আমরা দাবি করেছিলাম, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে। এবং আমরা এই দাবি আদায় করে নিয়েছিলাম সেই সময়।

এটি এ জন্য বলছি যে এখন আমরা বাংলা ভাষায় গান গাই, গানের চর্চা করি, আমরা আমাদের জীবনযাপন ও পোশাকে বাংলাটা চর্চা করছি; পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাচ্ছি—এগুলো আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা যোগ হয়েছে। এখন মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু ঢাকার চারুকলায় নয়, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে গানের আয়োজন ছায়ানটে সীমাবদ্ধ নেই। সুরের ধারা কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রপত্রিকা এবং সব ধরনের গণমাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান ও আয়োজন ছড়িয়ে যাচ্ছে। এসব আয়োজন যেমন আনুষ্ঠানিকভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে, আমাদের মন ও মানসিকতায়ও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আমরা শ্রদ্ধাভাজন হচ্ছি। নিজেরা বাঙালি হওয়ার চেষ্টা ও প্রেরণা পাচ্ছি প্রতিটি পহেলা বৈশাখ পালন করে।

আমাদের সাহিত্যে পহেলা বৈশাখ এসেছে, আমাদের সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ এসেছে। আমাদের যে ষড়ঋতু ও পার্বণ—আমাদের শিকড়ের অন্তর্নিহিত যে শক্তি, বাঙালি সংস্কৃতি হচ্ছে এর প্রাণ। এগুলোই আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি ছবি আঁকার সময় বলেছিলাম, আপনি আমাদের ষড়ঋতুকে এত বেশি শ্রদ্ধার সঙ্গে রাজনীতির মাধ্যমে পালন করেছেন। তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘কিভাবে? ছয় দফা তো আমি দিয়েছি দাবি আদায়ের জন্য, এটা আমাদের রাজনৈতিক অধিকার।’ তখন আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ। কিন্তু ছয় দফার সঙ্গে ছয় ঋতুও মিলে যাচ্ছে। আমাদের যে দাবি স্বাধীনতার, সেটার সঙ্গে এটা মিলে যায়।

কিন্তু ১৯৬৪ সালে যে আমার দাবিটি তিনি মেনে নিয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু আমি বুঝিনি। পরে সংবিধান আঁকতে গিয়ে তিনি জয়নুল আবেদিনকে বলেছিলেন, ‘এই হাশেমকে কিভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন আমাকে? আমার ছয় দফা আন্দোলনকে সে ষড়ঋতুর সঙ্গে যেভাবে মিলিয়েছে, এটা তো একেবারে সত্যি।’

এটা আমার নিজের কথা বলে বলছি না। এটা আমার অর্জন যে তিনি এটা মনে রেখেছিলেন। এই যে আমাদের ষড়ঋতু, এই ছয় ঋতু আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। কখনো অবচেতনে, কখনো প্রকাশ্যে। একটা গাছ যেমন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, আর আমাদের এত উর্বরা ভূমি, বীজ রোপণ করলেই গাছ হয়ে যায়। এত উর্বরা মাটি পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। এত উর্বরা কৃষিভূমি, আমাদের কৃষি ও ভূমির ফসল এবং মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি। এ জন্য আমাদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ আমাদের সংস্কৃতি নানাভাবে নষ্ট হচ্ছে। আমাদের ভাষা নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। আমাদের এখানে একসময় জামায়াত ও রাজাকার-আলবদররা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা কিন্তু নানাভাবে সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তারাও কিন্তু পহেলা বৈশাখ করে, তারাও পান্তা-ইলিশ খায়। বরং তারা বেশি করে। বেশি খায়। নাচনকুদন তারা বেশি করে। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির উপাদান ও বৈশিষ্ট্যগুলো তারা নষ্ট করার চেষ্টা করেছে। এ জন্য আমাদের সচেতন থাকতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে এক দিন পহেলা বৈশাখ বা আমাদের শিকড়ের সংস্কৃতি পালন করলাম, পরে ভুলে গেলাম। তা করা যাবে না। প্রতিদিন মনে রাখতে হবে। বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা নষ্ট করা যাবে না।

আমরা যখন কথা বলি, অকারণে অন্য ভাষার শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করি। আমরা যখন টেলিফোন নম্বর বলি তখন নম্বরটি কিন্তু বাংলায় বলি না। ইংরেজিতে বলি। টেলিফোন শব্দটি আমরা অন্য ভাষা থেকে নিয়েছি। এতে কোনো অসুবিধা নেই। আমরা অন্য ভাষা থেকেও শব্দ নেব। আমাদের ছেলে-মেয়েরা অন্য ভাষা থেকেও শব্দ শিখবে। বিভিন্ন দেশের ভাষা শিখবে। কিন্তু বাংলাকে অবহেলা করে নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে কথা বলার সময় চেষ্টা করতে হবে বাংলায় কথা বলা এবং যত দূর সম্ভব শুদ্ধ করে বলা। আর পারতপক্ষে ইংরেজি, উর্দু, হিন্দিতে কথা না বলা। কারণ সেসব আমাদের সংস্কৃতি নয়। এটাকে বর্জন করতে হবে। এটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমার আবেদন। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। জয় বাংলা।

লেখক : চিত্রশিল্পী; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা