kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্বাধীনতার সূচনায় বঙ্গবন্ধু

ডা. মো. ফজলুল হক

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাধীনতার সূচনায় বঙ্গবন্ধু

মহান স্বাধীনতা অর্জনে প্রস্তুতিমূলক হাজারো ঘটনা রয়েছে, যার মূল নায়কই ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার ঘোষক এবং জাতির পিতা। রাজনৈতিক কারণে প্রায় ১৪ বছর ঝরে গেছে কারার প্রকোষ্ঠে, অর্থাৎ জেলখানায়। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণেই প্রতিধ্বনিত হয়েছিল সব হিসাব-নিকাশের দিকনির্দেশনা। ঐতিহাসিক ভাষণের দিকনির্দেশনা ও ২৬শে মার্চের অগ্নিবাণীর মর্মার্থে উদ্দীপিত হয়েছিল সমগ্র বাঙালি জাতি, জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ।

পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তারা সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিল না। কথায় কথায় গুলি চালাত, বুটের লাথিতে লুটিয়ে পড়ত বাঙালিরা। তারা বাঙালিদের ন্যূনতম সম্মান ও অধিকার দিত না। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও ক্ষমতায় বসতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের মুক্তিসংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতাই আমাদের মাথার মুকুট।

৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক ভাষণের মূল কথাই ছিল বাঙালি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে আমাদের কী করতে হবে? ১৮ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বার্তা ও অবস্থান এতটাই সুস্পষ্ট, সংযত ও সুসংহত ছিল যে এর কোনো তুলনাই আর চলে না। ভাষণের শুরু থেকে শেষ অবধি বঙ্গবন্ধু মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো টেনে ধরে রেখে যখন ছেড়ে দিলেন, তখন শুধু উপস্থিত লাখ লাখ শ্রোতাই নয়, প্রায় গোটা জাতি স্বাধীনতার স্বপ্নে উজ্জীবিত হয়ে গেল। এর ফলে সমগ্র জাতি তথা সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জনগোষ্ঠী বুঝে নিল তাদের করণীয় ও দিকনির্দেশনা। স্লোগান উঠেছিল, এক মুজিব অন্তরালে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। এ স্লোগান সামনে রেখে বাঙালিরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে, জীবন বিসর্জন দিতে এতটুকুও পিছুটান ছিল না। অনেক সন্তান তার মা-বাবাকে এবং স্বামী তার স্ত্রীকে না বলেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অনেকে আজও ফিরে আসেননি।

৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে, দুই লাখ মা-বোন অসম্মানিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা কোনো বিনিময়ে বা ব্যক্তিস্বার্থে যুদ্ধ করেননি। স্বার্থ একটাই, বাংলা মায়ের স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। ওই সময় পাক বাহিনী ঢাকাস্থ রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। ঘড়বাড়ি, স্কুল-কলেজ, মিল-কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। বাড়িঘর ছেড়ে লাখ লাখ মানুষ পালিয়ে গ্রামের ঠিকানায় বা আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান নেয়। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে পালাতে থাকে। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী (জামায়াত মতাদর্শের) গ্রামগঞ্জে ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মানুষ হত্যার মিশন চালায়। অন্যদিকে মুক্তিকামী প্রকৃত বাঙালিরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যাঁর যা কিছু ছিল তা নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দ্রুত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ দিনটি মহান স্বাধীনতা দিবস নামে খ্যাত। যার প্রতিটি শব্দের অর্থই ছিল পাকিস্তানিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব নয়। ওরা আমাদের শত্রু। ওদের থেকে নিজেদের বাঁচাতে হবে। দেশকে বাঁচাতে হবে।

মূল বক্তব্যটি ছিল ইংরেজিতে, যার মূল অর্থ দাঁড়ায় ‘ইহাই হয়তো আমার (বঙ্গবন্ধুর) শেষ বার্তা, আজ হতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি, যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।’

এ স্বাধীনতা ঘোষণার কয়েক মিনিট পরই পাকিস্তান সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুকে ধানমণ্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এবং সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যায়। মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, ফাঁসির আদেশ হয়, জেলখানার পাশে কবর খোঁড়া হয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না, আমার লাশ যেন বাংলার মাটিতে দাফন করা হয়।’ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি বাংলাদেশের ওয়্যারলেস ও টেলিগ্রাফের মাধ্যমে সমগ্র দেশে পৌঁছে দেওয়া হয়। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ রক্ষায়। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গ্রামগঞ্জ, শহর ও শহরতলিতে চলে প্রশিক্ষণের মহড়া। আর্মি, ইপিআর ও পুলিশ সদস্যরাই প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। দলে দলে লোক যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। অস্ত্রের সন্ধানে থানার অস্ত্রাগার ও বন্দুকের দোকান লুট করে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়। অনেক আর্মি, ইপিআর ও পুলিশ সদস্য স্বেচ্ছায় অস্ত্র লুট করে যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। ভারত বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছিল আমাদের। শত্রুর মোকাবেলায় ২১ দিন মেয়াদি স্বল্পমাত্রায় ট্রেনিং দিয়ে থ্রি নট থ্রি, এসএলআর, স্টেনগান, এসএমজি, ডিনামাইট ও গ্রেনেটসহ মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসে বাংলাদেশে, যোগ দেয় গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধাদের পেটে খাবার তেমনটা না থাকলেও দেশপ্রেমই ছিল তাঁদের বড় খোরাক। আল্লাহর রহমতে পাকিস্তানি সৈন্য ও এ দেশের রাজাকারদের শক্ত বাধা সত্ত্বেও জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ চালিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালি জাতি। আজও অনেক আহত মুক্তিযোদ্ধা অনেক কষ্টে ও অভাবে দিনাতিপাত করছেন, হুইলচেয়ারে বসে চলছে তাঁদের জীবনযাত্রা। বঙ্গবন্ধুর অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা, দেশপ্রেম, মানবপ্রেমকে পুঁজি ধরেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ দেশকে রক্ষা করা, সমৃদ্ধিশালী  করা, সম্মানিত করা দলমত-নির্বিশেষে সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। দেশ উন্নয়নের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আরো এগিয়ে যাবে। আরো এগোতে হবে।

লেখক : চেয়ারম্যান, মেডিসিন, সার্জারি অ্যান্ড অবস্টেটিকস বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা