kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

মানবতন্ত্রী বঙ্গবন্ধু : বঙ্গবন্ধুর মানবতন্ত্র

গোলাম কবির

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মানবতন্ত্রী বঙ্গবন্ধু : বঙ্গবন্ধুর মানবতন্ত্র

মানুষের মনের মতো এত জটিল বিষয় কী আছে! এ জন্য বলা হয়, মনের মানুষ আর মানুষের মন অতি দুর্লভ, যা দৃশ্যমান নয় এবং স্পর্শ করাও যায় না। শুধু তার পরিবর্তনশীলতা অনুভব করা যায়। যুগে যুগে মানুষের মনের জটিল জগেক আয়ত্তে আনার জন্য অসংখ্য মনীষী কাজ করে গেছেন। মনের গভীরের অতল রহস্য দুর্জ্ঞেয় রয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কত না তন্ত্র চালু হলো জগতে, তার হিসাব রাখা কঠিন।

সভ্যতার ইতিহাস বলছে, বিচিত্র তন্ত্র চালুর পেছনে ব্যক্তির অভিলাষ এবং তা ধরে রাখার জন্য একচ্ছত্র ক্ষমতাধররা জগেক পদানত রাখতে চেয়েছে। তারা ক্ষমতার বেদিতে ঐশী পোশাক পরিয়েছে কখনো। আবার কখনো বৈজ্ঞানিক ছাপ মারতে চেয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, ক্ষমতার লেহ্য-পেয় প্রবলভাবে ভোগের জন্য এমন কিছু নীতি তৈরি করেছে, যাকে বলেছে অলঙ্ঘনীয়। কালক্রমে দেখা গেছে, সেখানে অসংখ্য বিভাজন। এর মূল কারণ ব্যক্তিত্বের সংঘাত। এসব নিয়ে চিন্তাবিদদের অসংখ্য কিতাব আয়ত্তকারীদের আমরা পাণ্ডিত্যের তকমা পরাই; কিন্তু বিভাজন ঠেকানো গেছে কি? আসলে পেশিশক্তি উন্মুক্ত ভাবনাকে স্তব্ধ করে এসেছে যুগে যুগে। এই যে আমরা গণতন্ত্র গণতন্ত্র করে প্রাণপাত করছি, যদিও নিজেদের আচরণের ক্ষেত্রে নয়, তাকে ভেগ আইডিয়া বলে মতামত দিয়েছেন জন স্টুয়ার্ট মিল। মানুষের মন যে একবার পিঠ দেখায় আবার পেট দেখায়, যাকে বলে পেন্ডুলামের দোদুল্যমানতা, তা রোধ করবে কে? রোধ করা কঠিন বলে হেগেল তাকে ডায়ালেকটিক প্রসেস তথা একূল-ওকূল দুকূলের কাণ্ডারি বলেছেন। আমরা সেই সূত্র ধরে বুঝে নিতে চাই, পরিবর্তনশীল মানবমন চুম্বকের কাঁটার মতো সদা একমুখী থাকে না। তাইতো বিচিত্র তন্ত্রের জন্ম। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, ধনতন্ত্র, আমলাতন্ত্র ইত্যাদি তন্ত্র মানবসমাজে পরিচিত নাম। মানুষ একটি ছেড়ে অন্যটির প্রতি প্রলুব্ধ হয় বৈষয়িক সুখের জন্য।

সমাজব্যবস্থার নানা তান্ত্রিক অবস্থার স্তর পার হয়ে এসেও আমরা স্বস্তিতে নেই। এর অন্যতম কারণ মানুষের মূল পরিচালক মন নিজেই স্থির নয়। সভ্যতার পথ ধরে গোষ্ঠীতন্ত্রের পর এসেছে সামন্ততন্ত্র। এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে গণতন্ত্রের। সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে হাতিয়ার করে এসেছে ধনতন্ত্র; যার পরিণতি মুক্তবাজার অর্থনীতি। বিকাশোন্মুখ গণতন্ত্র স্থির হতে না হতেই সমাজতন্ত্র মানুষকে নতুন আলো দেখাল। রবীন্দ্রনাথ এই আলোতে মোহিত হয়েছিলেন। রাশিয়ার চিঠিতে তার বর্ণনা আছে, যদিও ব্যক্তির অভিলাষে এই ব্যবস্থা কোথাও কোথাও মূলমন্ত্র থেকে সরে যাচ্ছে। এত সব তন্ত্রমন্ত্রে মানুষ সুখের ঠিকানা খুঁজে হয়রান। পরিশ্রান্ত মানুষের মন পদকর্তার মতো আর্দ্রকণ্ঠে আনমনে গেয়ে ওঠে, ‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল।’

বঙ্গবন্ধুর জন্ম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। তখনকার পরিস্থিতি আঁচ করার চেতনা জাগ্রত হওয়ার কথা তাঁর নয়। যৌবনের উষালগ্নে মানুষ যখন নিজের অন্ত পায় না তখন পরাধীন দেশের কলকাতা নগরীতে তিনি লেখাপড়ার জন্য ইসলামিয়া কলেজের (মওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্রাবাসে। দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি, মানবতার অপরিমাণ অপমান; যার কিছু স্বাক্ষর অঙ্কিত আছে শিল্পাচার্যের অক্ষয় চিত্রশিল্পে। লেখাপড়ার দায় কাঁধে নিয়েও তিনি তখন মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তার আভাস আছে। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পাকিস্তানি দুঃশাসনে অর্ধেক জীবন কারা অন্তরিন থেকে, লাখো শহীদের রক্ত আর নারীদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের সৃষ্টি করলেন। দেখলেন, চারপাশে নানা তন্ত্রের মতবাদী শকুনের দৃষ্টিতে ওত পেতে আছে মতবাদের গত্বাঁধা বুলি আওড়িয়ে, সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করে নবীন রাষ্ট্রকে খুবলে খাওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু গভীর দৃষ্টিতে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, মানুষের সব চাহিদা পূরণ করা সহজ নয়, তবে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার পূরণ করতে না পারলে সব আয়োজন বৃথা হয়ে যাবে। তাই মানবমুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর চেতনায় মানবতন্ত্র জাগ্রত হয়েছিল। যে ভাবনা শিক্ষার্থীজীবনে, পাকিস্তানি অপশাসনের যুগে, জেলজীবনে অঙ্কুরিত। ইতিহাস বলছে, সে মুক্তি-দর্শনের রূপরেখা কাগজে-কলমে বিধৃত হয়নি এবং বাস্তবায়নের আগেই কায়েমি স্বার্থবাদী দুর্বৃত্তরা তাঁকে সরিয়ে দিয়েছে।

মানুষের সুদীর্ঘকালের বিশ্বাসকে খর্ব না করে, কর্তৃত্ববাদী নয়, যথার্থ গণতান্ত্রিক চেতনাকে সমূলে উপড়ে না ফেলে ব্যক্তিমানুষের মৌলিক চাহিদার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বঙ্গবন্ধু যে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আমরা তাকেই মানবতন্ত্র বলতে চেয়েছি।

মতবাদী দৃষ্টিতে নয়, সমাজে কোন মানুষটি অপেক্ষাকৃত নির্লোভ থেকে তাঁর চারপাশের মানুষের জন্য কল্যাণভাবনায় নিবেদিত, তা অজানা থাকার কথা নয় কারো। বঙ্গবন্ধু এঁদেরই গণতান্ত্রিকভাবে বেছে নিতে চেয়েছিলেন। তবে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ম্যাকবেথের মতো রাজা মেরে রাজা হওয়ার অভিলাষীদের শনাক্ত করার সময় তিনি পাননি।

সভ্যতার ধারাবাহিকতায় ধর্ম মানুষকে সুশৃঙ্খল থাকতে পরামর্শ দিয়েছে এবং পারত্রিক সুখের ভাবনায় ঐকান্তিক থাকতে প্রেরণা জুগিয়েছে। বঙ্গবন্ধু সহসা মানুষের মানবিক স্বাধীনতা স্তব্ধ করতে চাননি। এ নিয়ে পরের মুখে ঝাল খাওয়াদের মুখর আলোচনায় কত বাতচিতই না হয়েছে! বঙ্গবন্ধু ধর্মকে বিদায় করতে চাননি; একটি ধর্মকে শিখণ্ডী রেখে অপর ধর্মের মানুষের প্রতি নিপীড়কদের চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। ধর্মের নামে যেন খুনাখুনি না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন।

সামাজিক সাম্যবাদীদের একটা অংশ গণতন্ত্র কিংবা ধর্মকে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছে। তারা অনুধাবন করেনি, বন্দুকের নলের সাহায্যে কিছু সময়ের জন্য মানুষের কণ্ঠ রোধ করা যায়, দীর্ঘ সময় নয়। কারণ আগেই বলা হয়েছে, মন কম্পাসের কাঁটা নয়। বঙ্গবন্ধু সামাজিক কল্যাণভাবনা থেকে ব্যক্তির ভূমির পরিমাণ নির্ধারণ করতে চেয়েছেন এবং ২৫ বিঘার কম জমির মালিকদের লাখেরাজভাবে ষোলো আনা ভোগের অধিকার দিয়েছেন। ভারী শিল্প জাতীয়করণ হয়েছে। এসবের পুরোপুরি বাস্তবায়নের প্রথম স্তর পার হওয়া যায়নি। যদি বাস্তবায়িত হতো, তবে বোঝা যেত, বঙ্গবন্ধুর মানবতন্ত্র মানুষের জন্য কত কল্যাণ বয়ে আনবে। সে বিষয়টি আমরা নতুন করে ভেবে দেখতে পারিনি। কারণ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী প্রায় সমাগত।

তথাকথিত সমাজতন্ত্রী, ধর্মতন্ত্রী, গণতন্ত্রী একজোট হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে উত্খাতের জন্য একদা মহানৃত্যের আয়োজন করেছেন। তাঁদের অনেকে এখন ক্ষমতার বলয়ে থেকে বঙ্গবন্ধুপ্রেমী সেজেছেন। তাঁরা সচেতন মানুষের অচেনা নয়। বলা হয়ে থাকে, সাহিত্যের মা কাঁদে বেশি। কৃত্রিম ভালোবাসায় আড়ম্বরের অবধি নেই। আমরা আবারও বলছি, বঙ্গবন্ধুর মানবতন্ত্রের ভাবনাটি কার্যকর করার জন্য সত্যিকার মনুষ্যত্বের অধিকারী সেবক খুঁজে বের করা যায় কি? কারণ রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জনগণের সেবা করার সুযোগ পেতে চান। সেবাই যদি রাজনীতির ধর্ম হয়, তবে এত বিভাজন কেন? মানসিক বিভঙ্গি ও রূপের কথা আমরা সূচনায় বলেছি। তবু আবার ভাবতে চাই, মানবসেবার জন্য এক হতে বাধা বা দ্বিধা কেন? উপনিষদের ঋষিগণ বহুকাল আগে মানবমণ্ডলীকে এক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের ঘোষণা, ‘ওয়াতাসিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়াও’—আল্লাহর রজ্জুকে সবাই মিলে ধারণ করো। পৃথক হোয়ো না। আমরা বুঝি, পৃথক হওয়ার আসল উদ্দেশ্য ত্যাগ নয়, ভোগ। আর ভোগের পেয়ালা পূর্ণ করতে হয় বাহুবলে, সেখানে হৃদয়ধর্মের অভাব। রবীন্দ্রনাথ এ জন্যই বলেছিলেন, ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা।’ আমরা উভয়ের মিলিত ধারায় মানবমুক্তির জন্য মানবতন্ত্রী হতে পারি না!

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য