kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন প্রতীক

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন প্রতীক

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এ দেশের সংগ্রামী জনসাধারণের প্রকৃত সাদৃশ্য। জনতা তাঁকে হূদয়ে স্থান দিয়েছিল, কারণ তাঁর মধ্যে তারা জাতি হিসেবে নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব বজায় রাখার যে গভীর ইচ্ছা তার বহিঃপ্রকাশ দেখেছিল।...বঙ্গবন্ধু এবং শুধু বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন সেই প্রতীক, যার চারদিকে নিঃসহায় এক উদ্দেশ্যর সমর্থকরা একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল; কিন্তু এটা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। ওই অন্ধকারের দিনগুলোতে, ওই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে যে কোটি কোটি জনতা, যারা ভবিষ্যতের জাতিকে সৃষ্টি করবে, তাদের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি বা দ্বিধা ছিল না। বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন প্রতীক।

 

‘আমার জন্ম হয় টুঙ্গিপাড়া শেখ বংশে। শেখ বোরহানউদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ এই বংশের গোড়াপত্তন করেছেন বহুদিন পূর্বে। শেখ বংশের যে একদিন সুদিন ছিল তার প্রমাণস্বরূপ মোগল আমলের ছোট ছোট ইটের দ্বারা তৈরি চকমিলান দালানগুলি আজো আমাদের বাড়ির শ্রীবৃদ্ধি করে আছে।...এই সকল দালান চুনকাম করার ক্ষমতা আজ আমাদের অনেকেরই নাই। এই বংশের অনেকেই এখন এ বাড়ির চারপাশে টিনের ঘরে বাস করেন। আমি এই টিনের ঘরের এক ঘরেই জন্মগ্রহণ করি।’

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে ওপরের কথাগুলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভাবেই বর্ণনা করেছেন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত টুঙ্গিপাড়া গ্রামে বঙ্গবন্ধুর জন্ম। আজ ২০১৯ সালের ১৭ মার্চ। আর এক বছর পর ২০২০ সালের ১৭ মার্চ শুধু বাংলাদেশ ভূখণ্ড নয়, সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ২৬ কোটি বাঙালি জাতির পিতার জন্মের শতবর্ষ পালন করবে গভীর ভালোবাসায়, শ্রদ্ধা ও মমতায়। একটি সাধারণ টিনের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন যে মানুষটি, কালক্রমে তিনিই বঙ্গবন্ধু হয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ করে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অর্জন করেন মাত্র ৫১ বছর বয়সে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র শুরুতে ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লেখা কয়েকটি চরণ আমরা স্মরণ করব। তা এ জন্য যে আমরা উপলব্ধি করব কেন আমাদের ভূখণ্ডের আপামর জনসাধারণের অনেকের মধ্যে একমাত্র বঙ্গবন্ধুকে চিনে নিতে পেরেছিল তাদের নেতা হিসেবে, যাঁর ডাকে জীবন দিতেও তারা এগিয়ে যেতে পারে। সে চরণ কয়টির বাংলা তরজমা ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি ও অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’

প্রথমে একজন মানুষ এবং তার পরই একজন বাঙালি হিসেবে মানবজাতি এবং বাঙালির জন্য তাঁর রাজনীতি ও অস্তিত্ব, যার উৎস অক্ষয় ভালোবাসা, তা তিনি উচ্চারণ করেছেন। এক দিনে নয়, গ্রামের স্কুলে, কলকাতায় অধ্যয়নকালে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে মানুষের প্রতি তাঁর নিখাদ ভালোবাসার পরিচয় সাধারণ মানুষ পেয়েছে। ক্রমে সে ভালোবাসার গভীরতা আরো সম্প্রসারিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনে, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এবং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৩৮ সাল। গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলের ছাত্র বঙ্গবন্ধু। শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দী সাহেব আসবেন গোপালগঞ্জে সভা করতে। বঙ্গবন্ধুর ওপর ভার পড়ল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করার। দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে তিনি তা করলেন। পরে জানা গেল কংগ্রেস নিষেধ করায় হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়ছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমার কাছে হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো জিনিস ছিল না। হিন্দু ছেলেদের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব ছিল। একসঙ্গে গান-বাজনা, খেলাধুলা, বেড়ানো—সবই চলত।...আমি মুসলমান ছেলেদের নিয়েই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করলাম, তবে কিছুসংখ্যক নমঃশূদ্র শ্রেণির হিন্দু জোগদান করল।’

তেতাল্লিশের মন্বন্তর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক সৃষ্ট ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ বাঙালি মারা যাচ্ছে। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র বঙ্গবন্ধু। তিনি লিখেছেন, ‘ইংরেজের কথা হলো, বাংলার মানুষ যদি মরে তো মরুক, যুদ্ধের সাহায্য আগে।...যুদ্ধ করে ইংরেজ আর না খেয়ে মরে বাঙালি; যে বাঙালির কোনো কিছুর অভাব ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যখন বাংলাদেশ দখল করে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় তখন বাংলার এত সম্পদ ছিল যে একজন মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী গোটা বিলাত শহর কিনতে পারত।’ দুর্ভিক্ষে সেই বাংলাদেশের মানুষের দুরবস্থার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। লিখেছেন, ‘আমি লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম।’

এ সময় বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য হন। মুসলিম লীগের দুটি ধারা। একদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে প্রগতিবাদী অংশ, যারা ‘মুসলিম লীগকে জনগণের লীগ’ ও ‘জনগণের প্রতিষ্ঠান’ করতে চায়; অন্যদিকে খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ছিল জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান।

পাকিস্তান কায়েম হয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ফজলুল হক মুসলিম হলের অ্যাসেম্বলি হলে আয়োজিত সভায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে। ওই সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার হলেন বঙ্গবন্ধু আরো অনেকের সঙ্গে। ঢাকা কারাগারের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁদের রাখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “দেয়ালের বাইরে মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল ১০টায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর ৪টায় শেষ করত। ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’ নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, ‘হক সাহেব, ওই দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।’ হক সাহেব আমাকে বলেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব।”

১৯৪৯ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভুক কর্মচারীরা ধর্মঘট শুরু করেছে এবং ছাত্ররা তার সমর্থনে ধর্মঘট করছে। বঙ্গবন্ধু দাঁড়ালেন গরিব কর্মচারীদের পাশে। তারই ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারাদেশ ও কারাবরণ। মুচলেকা দিয়ে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার, কারামুক্তি সম্ভব। কোনোটাই করলেন না বঙ্গবন্ধু। এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ইতি।

এর মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধুকে যুগ্ম সম্পাদক করে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। কারাগারে বসে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমি মনে করেছিলাম পাকিস্তান হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনো আসে নাই, তাই যাঁরা বাইরে আছেন তাঁরা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন।’

সময়ের এমন বিবেচনা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আমরা বহুবার দেখেছি। কারাবন্দি কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছাত্রদের বলেছেন, ‘জনসাধারণ চলছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন। জনসাধারণ আপনাদের কথা বুঝতেও পারবে না, আর সঙ্গেও চলবে না।’

আমরা দেখেছি ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নাম রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।

ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে রেখে বিচার, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কারামুক্তি, রেসকোর্সের ময়দানে ছাত্র-জনতার আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে অভূতপূর্ব বিজয়, ২ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক, ৭ই মার্চের ভাষণে কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, সেই দিন থেকে ২৫শে মার্চের কালরাত পর্যন্ত বাংলাদেশ কাঁপানো ১৮ দিনে ৭ই মার্চের দিকনির্দেশনায় বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা এবং এক গভীর প্রজ্ঞায় ও অনমনীয় দৃঢ়তায় জীবনের পরোয়া না করে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে কারাবরণ; তারই ফলে বঙ্গবন্ধুর নামে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে অকাতরে মানুষের জীবনদান, স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে ওঠা এবং ৯৩ হাজার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আবাল্য-লালিত স্বপ্ন স্বাধীন বাংলাদেশ মুক্তিলাভ করল। বঙ্গবন্ধুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায় নিয়ে বহু আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে, আরো হবে। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে ছোটবেলা থেকে প্রথম যৌবনের কিছু কথা, যা আলোচনায় খুব বেশি আসেনি, তা এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বলা বাহুল্য এ চেষ্টাও অপূর্ণাঙ্গ।

জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি। ‘Bangladesh : State of the Nation’ নামক বক্তৃতায় অধ্যাপক রাজ্জাক বলেন, ‘পাকিস্তানি বা ভারতীয় জাতি থেকে পৃথক একটা আলাদা জাতিসত্তা গড়ে তোলার ইচ্ছাতেই, আমার মতে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এ দেশের সংগ্রামী জনসাধারণের প্রকৃত সাদৃশ্য। জনতা তাঁকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছিল, কারণ তাঁর মধ্যে তারা জাতি হিসেবে নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব বজায় রাখার যে গভীর ইচ্ছা তার বহিঃপ্রকাশ দেখেছিল।...বঙ্গবন্ধু এবং শুধু বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন সেই প্রতীক, যার চারদিকে নিঃসহায় এক উদ্দেশ্যের সমর্থকেরা একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল; কিন্তু এটা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। ওই অন্ধকারের দিনগুলোতে, ওই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে যে কোটি কোটি জনতা, যারা ভবিষ্যতের জাতিকে সৃষ্টি করবে, তাদের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি বা দ্বিধা ছিল না। বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন প্রতীক।’

 লেখক : ইউজিসি অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা