kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

অবশেষে ডাকসু থেকে কী শিক্ষা পেলাম?

রেজানুর রহমান

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অবশেষে ডাকসু থেকে কী শিক্ষা পেলাম?

কেমন হলো ডাকসু নির্বাচন? এই ডাকসু ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণে আদৌ কতটা কাজ করবে? এসব প্রশ্নে আমি যাচ্ছি না। ভবিষ্যৎই বলে দেবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর। তবে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমার প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ মার্চ দিনভর যা ঘটল, তা কেন যেন মেনে নিতে পারছি না। শুধু একজন ছাত্র হিসেবেই নয়, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই আমার জীবনের অর্ধেকটা সময় কেটেছে। ২৭ বছর আগে ডাকসু নির্বাচনের সময় দৈনিক ইত্তেফাকের একজন প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনের সংবাদও সংগ্রহ করেছি। সেই সময় আর এই সময়টাকে যেন কোনোভাবেই মেলাতে পারছি না। আমি বলছি না ২৭ বছর আগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বর্তমান সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপা সম্ভব। তবে নীতিগত ও ঐতিহ্যগতভাবে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সুনাম থাকা দরকার। বিশেষ করে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ঐতিহ্যগত সুনাম তো আশা করতেই পারি। কিন্তু এ কী দেখলাম ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে? একজন সম্মানিত শিক্ষক রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের দিকে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর পেছনে কয়েক শ ছাত্র-ছাত্রী ভুয়া ভুয়া বলে দুয়োধ্বনি দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জেনেছি সম্মানিত ওই শিক্ষক ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য। মেয়েদের একটি হলে রাতের অন্ধকারে ব্যালট বাক্সে ভুয়া ভোট দিয়ে ব্যালট পেপার ভরানো হয়েছে। আরেকটি হলে জাল ভোট ধরা পড়েছে—এ ধরনের কিছু অভিযোগ তুলে ছাত্র-ছাত্রীরা একজন সম্মানিত শিক্ষককে ভুয়া ভুয়া বলে দুয়োধ্বনি দিচ্ছে। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ওই দৃশ্য দেখে লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না। ভুয়া ভুয়া ধ্বনি শুনেও কেন ওই শিক্ষক মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো হেঁটে যাচ্ছেন? তার মানে তিনি কি কোনো অপরাধ করেছেন? অথবা তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে? যদি তা-ই না হবে, তাহলে তিনি কেন অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে হেঁটে যাবেন? তাঁর তো মাথা উঁচু করে চলার কথা। তাঁর চোখের ভাষা দেখেই তো ছাত্র-ছাত্রীদের চুপ থাকার কথা। সামনে কে যাচ্ছেন? আমার অথবা আমাদের শিক্ষক। যিনি আমাকে বা আমাদের নীতি, নৈতিকতা শিক্ষা দেন। যাঁকে দেখে শ্রদ্ধায় ছাত্র-ছাত্রীদের মাথা নুয়ে আসার কথা, অথচ তিনিই ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো হেঁটে চলেছেন, কেন?

টেলিভিশনেই দেখলাম, এফ রহমান হলের সম্মানিত প্রভোস্ট একজন সংবাদকর্মীকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে হলের বাইরে নিয়ে আসছেন। প্রভোস্ট মহোদয়ের ভাষায় ওই সংবাদকর্মী একটি অপরাধ করেছেন। অপরাধটি হলো ওই সংবাদকর্মী টিভি ক্যামেরা নিয়ে হলের ভেতরে ঢুকে গেছেন! কিন্তু এ জন্য কি হলের প্রভোস্টকেই তেড়ে আসতে হবে?

আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখলাম কুয়েত মৈত্রী হলে এক দল বিক্ষুব্ধ ছাত্রীকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপ-উপাচার্য কবি মুহাম্মদ সামাদ। ছাত্রীরা তাঁর কোনো কথাই শুনতে নারাজ। একজন ছাত্রী তো তাঁর সামনে কিছু কাগজ এমনভাবে ছুড়ে দিল দেখে মনে হচ্ছিল নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে একজন শিক্ষক বড়ই অসহায়। শিক্ষকের সামনে প্রতিবাদেরও তো একটা ভাষা আছে। শ্রদ্ধা জানিয়েও তীব্র প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু ছাত্রীরা উপ-উপাচার্যের সামনে এমন ভঙ্গিমায় প্রতিবাদ করছিল, দেখে মনে হচ্ছিল উপ-উপাচার্য  সত্যিকার অর্থে একজন অপরাধী।

কিন্তু বাস্তবতা কি তাই বলে? ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ মার্চের ঘটনা দেখে কেন যেন শঙ্কা দূর হচ্ছে না। শিক্ষকের সামনে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা কেন এভাবে প্রতিবাদ করবে? আবারও বলি, সম্পর্কের অবস্থানভেদে প্রতিবাদের ভাষাও বদলায়। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা আর শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা তো একই রকম হতে পারে না। তার মানে ১১ মার্চের ঘটনায় কী প্রমাণিত হলো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে কেউ কেউ কি স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন? একজন শিক্ষক তাঁরই ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে মাথা নুয়ে অপরাধীর মতো হেঁটে যাবেন, তাঁকে উদ্দেশ করে তাঁরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা দুয়োধ্বনি দেবে—এটা কেমন শিষ্টাচার?

জানি না, এর জবাব কী হবে? আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ-ল ভূমিকা। ছাত্র-শিক্ষকের সম্মিলিত ত্যাগ ও প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সামগ্রিক ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা এক কাতারেই দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে কি ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সেই সম্পর্ক নেই? থেকে থাকলে একজন শিক্ষককে এভাবে অপরাধী বানিয়ে তাঁরই ছাত্র-ছাত্রীরা কেন তাঁকে দুয়োধ্বনি দেবে। আর যা-ই হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এমনটা আশা করা যায় না। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যা শেখায়, পরে অন্যরাও তা-ই শেখে। এটাই বাস্তবতা। তাই এ প্রশ্ন করতে পারি—১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কী শেখাল আমাদের প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়? ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশির ভাগই নেতিবাচক মন্তব্য।

এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটা কতটা দায়ী? একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে অভিহিত করা হতো। বর্তমানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের তালিকায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। কেন নেই? কেউ কি ভাবি আমরা? ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে যা কিছু ঘটেছে, তা দেখে মনে হয়েছে প্রিয় প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অনেকটাই নাজুক হয়ে পড়েছে। এর দায়ভার কার?

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার

সম্পাদক, আনন্দ আলো

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা