kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

বেলা শেষে দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই

এ কে এম শাহনাওয়াজ

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



বেলা শেষে দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই

হরিষে বিষাদ হলো ডাকসুর নির্বাচনী খেলা। নির্বাচনের দিন সকালেই আমার কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের সঙ্গে। বর্তমানে তিনি একটি নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ নেই। নির্বিবাদী গবেষক এই শিক্ষক। তাঁর বর্তমান প্রতিষ্ঠানের করিডরে দাঁড়িয়েই কথা হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, নির্বাচন নিয়ে আপনার ভাবনা কী? তিনি কোনো বিশ্লেষণে গেলেন না। বললেন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় মানুষের দৃষ্টি সুন্দরের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকার এই সুযোগকে গ্রহণ করবে। এতকাল পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনও যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে আমাদের স্খলনের আর কি কিছু বাকি থাকবে? আমরা ভালোটাই প্রত্যাশা করি।

আমার মনে হয়, দেশবাসী এই একই আকাঙ্ক্ষায় ডাকসু নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গণতন্ত্রপ্রত্যাশী মানুষ তো খড়কুটো ধরেই আবার জেগে উঠতে চায়। ভেবেছিলাম, সরকার এবার সজাগ থাকবে। যত প্রশ্নই থাক, আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামাবরণেই পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠন করেছে। এরই মধ্যে পঙ্গুত্ব বরণ করা বিরোধী দলের সাধ্য নেই অন্য কোনো উপায়ে সরকার পরিবর্তন করার। সুতরাং সরকারের নির্ভার থাকার কথা। তাই আদালতের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে ডাকসু নির্বাচন যদি দিতেই হলো, তাহলে দীর্ঘ অচলায়তন ভাঙার কৃতিত্বটুকু এই সরকার নিতেই পারত।

কেউ তাত্ত্বিক কথা বলতে পারেন। ডাকসু নির্বাচনের দায়দায়িত্ব আয়োজন সব কিছুর আধিকারিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এখানে সরকারকে টানাটানি কেন! এখন তো বিবেক আর পাণ্ডিত্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কর্তৃপক্ষ’ গঠিত হয় না। অন্তরালে সরকারের ইচ্ছাই কাজ করে। তাই সরকারের ইচ্ছা পূরণেই ‘কর্তৃপক্ষগণ’ ব্যস্ত থাকে। এ কারণে এই অঞ্চলের ঘটন-অঘটন সব কিছুর দায়ই পড়ে সরকারের ওপর।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতা বা দুর্বলতার কারণে ঐতিহ্যবাহী ডাকসু পুনর্জন্মের শুরুতেই যদি নানা প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে পড়ে, তবে সাধারণের প্রত্যাশার অপমৃত্যুই ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো সরকারই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। জনগণের ওপর আস্থা কম থাকে বলেই মনে করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই তাদের শক্তির জোগানদার হবে। তাই দীর্ঘদিনেও কোনো সরকারই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের সবুজ সংকেত দেয়নি। এর অবশ্য বাস্তব কারণ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন কখনো জনপ্রিয় হয় না। এরা হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের প্রভু। একেকটি দাপট দেখানো দল। চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসীর তকমা থাকে তাদের নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু সাধারণ শিক্ষার্থী মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে, তাই সরকারি ছাত্র সংগঠনের পক্ষে তাদের রায় যাওয়ার কথা নয়। এই বাস্তববোধ থেকেই কোনো সরকার সাহস করেনি ছাত্রসংসদ নির্বাচন দেওয়ার। এ সত্য হারে হারে টের পেয়েছিলাম ২০১৩ সালে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাকসু নির্বাচন করার। আমাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বানানো হয়েছিল। আমরা তফসিল ঘোষণা করে মনোনয়নপত্র বাছাইও শেষ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত সরকারি সবুজ সংকেত না নিয়ে নির্বাচন করার এমন উদ্যোগের খেসারতও দিতে হয়েছিল আমাদের।

এসব সত্য সাধারণ মানুষের অজানা নয়। তাই এবার আশাজাগানিয়া ডাকসু নির্বাচন ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ও আগ্রহ থাকবেই। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রয়োজন ছিল উজ্জ-ল ঐতিহ্য গড়ায় ভূমিকা রাখা। কিন্তু সে সুযোগ কি এই দুই পক্ষ কাজে লাগাতে পেরেছে?

শুরু থেকেই নির্বাচনী আয়োজনে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি অপরিপক্বতা দৃশ্যমান ছিল। যদি কোনো দুর্বুদ্ধি না থাকে, তাহলে শুরু থেকেই প্রশ্নের সুযোগ তৈরি করল কেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ? ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি সব দলের ছাত্রদের দাবি ছিল হল সংসদ নির্বাচনের আয়োজন হলের ত্রিসীমানার বাইরে করতে হবে। এর যুক্তি কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করতে পারবে? সবাই জানেন, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো সরকারি ছাত্র সংগঠনের দখলে। সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আইন চলে না। বেশির ভাগ হলবাসী শিক্ষার্থীর জিম্মিদশা। তাই হলের চৌহদ্দির ভেতরে নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করা যাবে—এ ভরসা কেউ রাখে না। তাহলে বেশির ভাগ ছাত্রসংগঠনের দাবির কারণে নির্বাচন হলের বাইরে কেন্দ্রীয় কোনো অবস্থানে কি করা যেত না? এই যুক্তিতে না এসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলতে লাগল, নির্বাচনের আয়োজনে তো থাকবেন শিক্ষকরা। তাই কোনো অবিচার হবে না। রাজনীতিনিষ্ঠ শিক্ষকদের অমন দৃঢ় ও পবিত্র চরিত্র নিয়ে কি সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা নিঃসন্দেহ? তাহলে নির্বাচনী অনাচারের পর কুয়েত মৈত্রী হলের প্রভোস্টকে অপসারণ করতে হলো কেন? তিনি তো একজন শিক্ষকই ছিলেন। আরো কয়েকটি হল নিয়ে তো একই প্রশ্ন উঠেছিল। অন্য হল নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও মানুষের সন্দেহের বাইরে সেসব হল নিশ্চয়ই যেতে পারেনি। ভোটের ফলাফলের পর এই সন্দেহ আরো বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। এখন তো তাই সংগত প্রশ্ন উঠবে— বেশির ভাগের দাবি না মেনে হলের ভেতরে নির্বাচনী আয়োজন রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন মরিয়া ছিল কেন!

ধরে নিচ্ছি, এতে অন্যায় কিছু হয়নি। তবু নির্বাচন কমিশনের কাছে এত স্বচ্ছ ভোটের বাক্স থাকার পরও দাবি অগ্রাহ্য করে ‘অন্ধকার’ ভোট বাক্স ব্যবহার করতে হলো কেন? স্বচ্ছ ভোট বাক্সের প্রবর্তন তো করা হয়েছিল স্বচ্ছতার প্রশ্নে।

ছাত্রলীগ ছাড়া বেশির ভাগ ছাত্রসংগঠনের দাবি ছিল দুপুর ২টার বদলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট প্রদান সচল রাখতে। কী মহাভারত অশুদ্ধ হতো এই দাবি মানলে? পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, কোনো কোনো বৈধ ভোটার সময়ের কারণে ভোট দিতে পারেনি। এভাবে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কারো দাবি না মানার একরোখা নীতি কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

সবচেয়ে বিস্মিত করেছে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ছাত্রলীগের ছেলে-মেয়েদের আচরণে। ডাকসুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভিপি পদটি হারানোর পর ছাত্রলীগের বিক্ষোভ এই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। ছাত্রলীগ ও কর্তৃপক্ষীয় ভাষায় উৎসবের আমেজে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। সব হলে ও কেন্দ্রে প্রায় পূর্ণ প্যানেলে ছাত্রলীগ জিতেছে। এতে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি; কিন্তু ভিপি পদে কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক বিপুল ভোটে জিতে যাওয়ায় খেপে উঠেছে ছাত্রলীগের ছেলে-মেয়েরা। যেন মনে হলো কাটা ছক পাল্টে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছে ওরা। তাই এখন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এমনই গণতান্ত্রিক বোধ যে ভোটারের প্রতিও সম্মান রাখতে পারল না ওরা। গড়া পেটার নির্বাচন হয়েছে অভিযোগে নির্বাচনের দিন ছাত্রলীগ ছাড়া সব ছাত্রসংগঠন এই নির্বাচন বর্জন করেছে। নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। আর এক দিন না পেরোতেই ভিপির ফলাফল বাতিল করে এই একটি পদে পুনর্নির্বাচন দাবি করেছে ছাত্রলীগ। অর্থাৎ যেভাবেই হোক পূর্ণ প্যানেল তাদেরই থাকতে হবে! নির্বাচিত ভিপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, নুরুল হক প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের অনুচর। জামায়াত-শিবিরের তকমা রয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে এসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এত দিন ছাত্রলীগের পাশাপাশি নুরুলরাও নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। কথিত জামায়াত-শিবিরের অনুসারী বলে তাঁকে বিরত রাখা হলো না কেন? তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবি উত্থাপিত হওয়ার কথা ছিল। কিছুই হয়নি। হয়তো বিশেষ কোনো ভরসায় নির্ভার ছিল ছাত্রলীগ। পাশা উল্টে যাবে বুঝতে পারেনি। তাই এমন উদ্ভ্রান্ত আচরণ ওদের।

যাক, তবু ভালো। শেষ রক্ষা কিছুটা হলো। সম্ভবত নেতৃত্বের ওপর মহলের পরামর্শে ছাত্রলীগ সংযত হয়েছে। ভিপি হিসেবে বরণ করে নিয়েছে নুরুল হককে।

এর পরও প্রশ্ন থাকবে, এভাবে নির্বাচন করে বেলা শেষে কী পেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সরকার? দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর বহু আকাঙ্ক্ষিত ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন সুসম্পন্ন করতে পেরে ইতিহাসে নিজেদের নাম উজ্জ-ল করার যে সুযোগ পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেতারা, তাকে উল্টো রথে চড়িয়ে দিয়ে তাঁরা অন্ধকারকেই বরণ করলেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার হারাল অনেক কিছু। এই সরকার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে দেশকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের অনেকটা আস্থায় চলে আসতে পেরেছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত করার কৃতিত্ব কি দেখাতে পেরেছে দলটি? ২০১৪ সালের নির্বাচন সংবিধানের দাবিতেই করতে হয়েছে। আমি একে নিন্দার চোখে দেখি না, বরং বিএনপি-জামায়াত জোট একটি শূন্যতা তৈরি করে সংকটে ফেলতে চেয়েছিল। ভোটারবিহীন নির্বাচন করার দায় তাই আমি আওয়ামী লীগের চেয়ে সে সময়ের বিরোধী দলের ওপরই চাপাতে চাই। এবার ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ অনায়াসে সরকার গঠন করতে পারত বলে সব মহলেরই দৃঢ় ধারণা ছিল। তার পরও এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে এই নির্বাচন স্বস্তির ছিল না। এসবের কারণে মানুষ যে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, তা উপজেলা নির্বাচনে ভোটারের স্বল্প উপস্থিতি প্রমাণ করছে। কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য এটি স্বস্তির নয়। কাছাকাছি সময়ে বিশাল তাৎপর্যপূর্ণ ডাকসু নির্বাচন সরকারের নির্বাচনী ভাবমূর্তি উজ্জ-ল করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ কি ব্যবহার করা গেল! তবে এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না যে ডাকসু নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ইত্যাদি হয়েছে বলে প্রমাণ দেখানো যাবে না। আমরা তেমনটি বিশ্বাসও করতে চাই না। দু-একটি ঘটনা কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক করেছে মাত্র। পাশাপাশি কামনা থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে ভাবমূর্তি উপস্থাপন করল, এর প্রভাব অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে না পড়লেই রক্ষা। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাবেক ডাকসুর নেতারা আছেন। তাঁদের কাছে কি মনে হয় না ডাকসু নির্বাচনের অতীত ঐতিহ্য ও গৌরব ম্লান হয়ে গেল? এ সত্য তো মানতেই হয়, ঐতিহ্য গড়ে ওঠে তিলে তিলে; কিন্তু ধ্বংস করা যায় এক লহমায়।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা